Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

প্যারিস অলিম্পিক্স ও ভারত

যে খেলাগুলিতে দেশের ক্রীড়াবিদরা নির্দিষ্ট মানে পৌঁছতে পারেননি, ভারতীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলির উচিত সেগুলিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া। তাহলেই ভারতের পদক সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। না হলে প্রতিটি অলিম্পিক্সের পরেই দেশজুড়ে হা-হুতাশ চলতে থাকবে।

ভারতীয় কুস্তিগীর ভিনেশ ফোগত।

Share Links:

অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

বিশ্ব ক্রীড়ার নিরিখে আমরা বামনই থেকে গেলাম। সদ্যসমাপ্ত প্যারিস অলিম্পিক্স ২০২৪-এর ফল তা-ই বলে। অলিম্পিক গেমস বা গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ হল বিশ্ব ক্রীড়ার সর্বোচ্চ আসর। সেখানে  বরাবরের মতো এবারও পদক তালিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম স্থানে রয়েছে। তাদের প্রাপ্ত পদক তালিকায় রয়েছে সোনা ৪০টি, রুপো ৪৪টি, ব্রোঞ্জ ৪২টি। মোট পদক ১২৬টি। দ্বিতীয় স্থানে আছে চিন। তাদের প্রাপ্ত পদক তালিকায় রয়েছে সোনা ৪০টি, রুপো ২৭টি এবং ব্রোঞ্জ ২৪টি। মোট পদক ৯১টি। তৃতীয় স্থানে রয়েছে জাপান। তাদের সংগ্রহে রয়েছে ২০টি সোনা, ১২টি রুপো এবং ১৩টি ব্রোঞ্জ। মোট পদক ৪৫টি। চতুর্থ স্থানে রয়েছে অষ্ট্রেলিয়া। তাদের প্রাপ্ত পদক তালিকায় রয়েছে সোনা ১৮টি, রুপো ১৯টি, ব্রোঞ্জ ১৬টি। মোট পদক ৫৩টি। পঞ্চম স্থানে রয়েছে আয়োজক দেশ ফ্রান্স। তারা পেয়েছে সোনা ১৬টি, রুপো ২৬টি, ব্রোঞ্জ ২২টি। মোট পদক ৬৪টি।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, এশিয়ার দু’টি দেশ চিন এবং জাপান পদক তালিকায় দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে। আর ভারত জনসংখ্যায় বিশ্বের বৃহত্তম দেশ হওয়া সত্ত্বেও  এবারের অলিম্পিক গেমসে একটি রুপো এবং পাঁচটি ব্রোঞ্জ পেয়ে ৭১তম স্থানে রয়েছে।

অলিম্পিক্স আসে যায়। কিন্তু পদক তালিকায় ভারতের তেমন কোনও পরিবর্তন হয় না। একটা সময় আমরা হকিতে একটি সোনা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতাম। ১৯২৭ সালে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক্স কমিটির সদস্যপদ লাভ করার পর ভারত আমস্টারডম অলিম্পিক্স ১৯২৮-এ প্রথম অংশগ্রহণ করে। সে বছর থেকে ভারত পরপর ছ’টি অলিম্পিক্সে হকিতে স্বর্ণপদক লাভ করেছিল (১৯২৮ থেকে ১৯৫৬,  ১৯৪০ এবং ১৯৪৪ অলিম্পিক্স বিশ্বযুদ্ধের কারণে অনুষ্ঠিত হয়নি)। তারপর জাপানে অনুষ্ঠিত টোকিও  অলিম্পিক্স ১৯৬৪ এবং ১৯৮০ সালে মস্কো অলিম্পিক্সে ভারত সোনা জিতেছিল। এছাড়া একটি রুপো এবং চারটি ব্রোঞ্জও পেয়েছিল। ব্যক্তিগত ইভেন্টে (কুস্তি) ভারতের হয়ে প্রথম ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন কে ডি সিং  যাদব ১৯৫২ সালে হেলসিঙ্কি অলিম্পিক্সে। মহিলাদের মধ্যে ব্যক্তিগত ইভেন্টে (ভারোত্তলন) প্রথম ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন কর্ণম মালেশ্বরী সিডনি ২০০০ অলিম্পিক্সে।  বেইজিং অলিম্পিক্স ২০০৮-এ ব্যক্তিগত ইভেন্ট ১০ মিটার এয়ার রাইফেল শ্যুটিংয়ে প্রথম স্বর্ণপদক লাভ করেন ভারতের অভিনব বিন্দ্রা। এ বছর প্যারিস অলিম্পিক্সে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক্স কমিটি তাঁকে অলিম্পিক্সের সর্বোচ্চ সম্মান ‘অলিম্পিক অর্ডার’ সম্মানে ভূষিত করেছে।

অন্য পোস্ট: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বামী বিবেকানন্দ

গত টোকিও অলিম্পিক্সে ভারত প্রথম কোনও অ্যাথলেটিক্স ইভেন্টে স্বর্ণপদক লাভ করেছিল। নীরজ চোপড়া বর্শা নিক্ষেপে ওই পদক লাভ করেন। সাফল্যের নিরিখে ভারত টোকিও অলিম্পিক্সে সবচেয়ে বেশি পদক সংগ্রহ করেছিল। ভারতের সংগ্রহে ছিল একটি সোনা, দু’টি রুপো, চারটি ব্রোঞ্জ, মোট সাতটি পদক। ক্রমতালিকায় ভারতের স্থান ছিল ৪৮তম।

এ বছর প্যারিস অলিম্পিক্সে ভারত ১১৭ জনের একটি দল পাঠিয়েছিল। পদক এসেছে মাত্র ছ’টি। তবে সাতটি পদক অল্পের জন্য হাতছাড়া হয়েছে। দুর্ভাগ্য তাড়া করেছে কুস্তিগীর ভিনেশ ফোগতকে। না হলে আরও অন্তত একটি রুপো নিশ্চিত ছিল। এমনকী স্বর্ণপদকও হতে পারত। তিনি ৫০ কেজি বিভাগের কুস্তিতে লড়াই করে একে একে বিশ্বের প্রথম সারির কুস্তিগীরদের পরাজিত করে ফাইনালে ওঠেন। এখানেই তাঁর জন্য অপেক্ষা করেছিল চরম বিস্ময়।  তাঁর ওজন ৫০ কেজি থেকে ১০০ গ্রাম বেশি হওয়ায় অলিম্পিক্স কমিটি তাঁকে বাতিল ঘোষণা করে। একটি নিশ্চিত পদক হারাল ভারত। যদিও ভিনেশ আন্তর্জাতিক অলিম্পিক্স কমিটির কাছে রুপোর জন্য আবেদন করেছেন। কারণ সেমিফাইনালে তাঁর ওজন ঠিকই ছিল।

মনু ভকত, যিনি এবারের প্যারিস অলিম্পিক্সে জোড়া ব্রোঞ্জ পদক জিতেছেন, তাঁর সুযোগ ছিল আরও একটি ব্রোঞ্জ পদক জয় করে ইতিহাস গড়ার। কিন্তু তিনি ২৫ মিটার শ্যুটিংয়ে একটুর জন্য চতুর্থ স্থান লাভ করেন। আর্চারির মিক্সড টিম ইভেন্টে ভারতের অঙ্কিতা ভগত-ধীরাজ বোম্মাদেভারা তিরন্দাজ জুটি একটুর জন্য ব্রোঞ্জ পদক থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ভারতীয় শ্যুটার মাহেশ্বরী চৌহান এবং অনন্তজিত সিং স্কিট মিক্সড টিম ইভেন্টের ব্রোঞ্জ পদকের ম্যাচে পরাজিত হয়েছেন।  ভারতীয় শ্যুটার অর্জুন বাবুতা পুরুষদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে চতুর্থ স্থান লাভ করেন। অলিম্পিক গেমসে আবির্ভাবেই  ভারতীয় ব্যাডমিন্টন তারকা প্রবাসী বাঙালি লক্ষ্য সেন পুরুষদের সিঙ্গলসে ব্রোঞ্জ পদকের লড়াইয়ে হেরে যান।

এবারের প্যারিস অলিম্পিক্সে উল্লেখযোগ্য ভারতীয় হকি দল। তারা নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়ার মতো দলকে হারিয়ে সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৩-২ গোলে হেরে যায়। ভারতীয় দলের অধিনায়ক গোলকিপার শ্রীজেস বিপক্ষ দলের কাছে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁরা স্পেনকে হারিয়ে পরপর দু’টি অলিম্পিক্সে ব্রোঞ্জ পদক জয়ের রেকর্ড গড়েন। গত টোকিও অলিম্পিক্সেও ভারত হকিতে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিল। অলিম্পিক্সের দ্বিতীয় দিনেই মনু ভাকর চমক দেন মহিলাদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেল শ্যুটিংয়ে ব্রোঞ্জ পদক জিতে। তার দু’দিন পর মিক্সড ডাবলসে মনু ভাকর এবং সরবজিৎ সিং শ্যুটিংয়ে ব্রোঞ্জ পদক জিতে ভারতের দ্বিতীয় পদকটি এনেছেন। পুরুষদের ৫০ মিটার থ্রি পজিশন রাইফেল শ্যুটিংয়ে স্বপ্নিল কুশানে ভারতকে অন্য ব্রোঞ্জ পদক এনে দিয়েছেন। অলিম্পিক্সে অংশগ্রহণকারী সবচেয়ে কমবয়সি ভারতীয় কুস্তিগীর আমন সারাওয়াত ৫৭ কেজি ফ্রি স্টাইল কুস্তিতে আর একটি ব্রোঞ্জ পদক জয় করেন।

অ্যাথলেটিক্সে গত টোকিও অলিম্পিক্সে নীরজ চোপড়া বর্শা নিক্ষেপে প্রথম স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই এবারও তাঁর ওপর দেশবাসীর আশা ছিল আরও একটি স্বর্ণপদকের। হিটে তিনি তাঁর প্রথম থ্রো-তেই ফাইনালে ওঠার ছাড়পত্র পেয়ে যান। কিন্তু ফাইনালে তিনি তাঁর অভিন্ন হৃদয় বন্ধু পাকিস্তানের নাদিমের কাছে হেরে রুপো জেতেন। নাদিম টোকিও অলিম্পিক্সে চতুর্থ স্থান পেয়েছিলেন। এবার তিনি অলিম্পিক্স রেকর্ড গড়ে ব্যক্তিগত ইভেন্টে স্বর্ণপদক লাভ করেছেন।

অন্য পোস্ট: স্বাধীনতা বহু দেশবাসীকেই স্বদেশে পরবাসী করেছে

এবারের অলিম্পিক্সে যাঁরা আমাদের হতাশ করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম অতীতে দু’টি পদক জয়ী মহিলা ব্যাডমিন্টন তারকা পি ভি সিন্ধু। এছাড়া রয়েছেন টোকিও অলিম্পিক্সে মহিলাদের ৪৯ কেজি ভারোত্তোলন বিভাগে রুপো জয়ী মীরাবাই চানু। তিনি ১ কেজি কম ওজন তোলার জন্য ব্রোঞ্জ পদক থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তিরন্দাজ দীপিকা কুমারীও হতাশ করেছেন।

অলিম্পিক্সে এখনও পর্যন্ত ভারত মোট ৪১টি পদক জিতেছে। তার মধ্যে হকিতে সবচেয়ে বেশি সফল। হকিতে ভারতের দখলে আছে ৮টি সোনা,  ১টি ব্রোঞ্জ এবং ৪টি ব্রোঞ্জ, মোট ১৩টি পদক। এর পর ভারতীয় কুস্তিগীররা ২টি রুপো এবং ৬টি ব্রোঞ্জ পদক দেশকে এনে দিয়েছেন। তৃতীয় স্থানে আছে শ্যুটিং। এখনও পর্যন্ত ভারতীয় শ্যুটাররা একটি সোনা,  দু’টি রুপো এবং ৩টি ব্রোঞ্জ জয় করেছেন।

গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক্সে ৩২টি স্পোর্টসের ৪৮টি ডিসিপ্লিনের ৩২৯ ইভেন্টে পদক জয়ের জন্য ২০৬টি দেশ প্যারিস অলিম্পিক্সে মিলিত হয়েছিল। প্রথম পাঁচটি দেশের পদক সংখ্যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। ভারত এবারের প্যারিস অলিম্পিক্সে ১১৭ জনকে ১৬টি স্পোর্টসে অংশগ্রহণ করার জন্য পাঠিয়েছিল। অন্য যে খেলাগুলি অলিম্পিক্সের তালিকায় রয়েছে, অথচ ভারত তাতে অংশগ্রহণ করতে পারেনি, সরকারের সেদিকে নজর দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি করা দরকার। যে খেলাগুলিতে দেশের ক্রীড়াবিদরা নির্দিষ্ট মানে পৌঁছতে পারেননি, ভারতীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলির উচিত সেগুলিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া। ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে এমন অনেক ইভেন্ট রয়েছে। এছাড়া সাঁতার অলিম্পিক্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা। সেখানেও আমাদের উন্নতির সুযোগ রয়েছে। এছাড়া হ্যান্ডবল, ভলিবল, জিমনাস্টিক্স ইত্যাদি খেলায় যাতে ভারতীয় খেলোয়াড়রা যোগ্যতামানে পৌঁছতে পারেন, তার জন্য সর্বভারতীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলির চেষ্টা করা উচিত। তাহলেই ভারতের পদক সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। না হলে প্রতিটি অলিম্পিক্সের পরেই দেশজুড়ে হা-হুতাশ চলতে থাকবে।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Sabuj Baran Debnath
Sabuj Baran Debnath
1 year ago

খুব ভালো লাগলো এবং Samridhyo holam

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए