অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মায়ের স্বপ্ন থাকে নিজের সন্তানকে ডাক্তার তৈরি করার। এই ইচ্ছার মধ্যে নিহিত থাকে তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার বিষয়। তার সঙ্গে বাবা-মায়ের অন্য একটি মনের বাসনাও থাকে, তাঁর সন্তান যেন গরিব মানুষের সেবা করতে পারেন। এই চিন্তাভাবনা বহুদিনের।
যে সময় ভারতীয় মেয়েদের পড়াশোনা করা শাস্ত্রবিরোধী বলে অপপ্রচার করতেন সমাজপতিরা, তখন কাদম্বিনী বসু সমাজের বেড়াজাল ভেঙে শুধু পড়াশোনা করাই নয়, চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করে ডাক্তার হয়েছিলেন। অনেক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তাঁকে তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছতে হয়েছিল। সেই প্রথম ভারত তথা এশিয়া মহাদেশে একজন মহিলা প্রথম ডাক্তার হয়েছিলেন।
কাদম্বিনী যে সময় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তখন বাংলার সমাজ জীবনে ধর্মীয়, সামাজিক এবং শিক্ষা প্রসারের বিপ্লব শুরু হয়েছিল, যাকে বাংলার নবজাগরণ বলা হয়। সেটা উনবিংশ শতাব্দীর শেষে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে।
এখন আর মেয়েদের পড়াশোনা করার জন্য আন্দোলন করতে হয় না। তাঁরা সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে চলেছেন। আজকের দিনের মহিলারা যেমন ভারতীয় মহাকাশযান অভিযানে অংশগ্রহণ করেন, তেমন যুদ্ধক্ষেত্রেও তাঁরা যথেষ্ট সক্রিয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, সরকারি উচ্চপদ, কোন জায়গায় নেই মহিলারা? তাঁরা রয়েছেন সমাজের সব স্তরে। পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাঁরা দেশের উন্নয়নের শরিক, যা নারীর সমানাধিকার এবং ক্ষমতায়ন, বহু আন্দোলনের ফল।
অন্য পোস্ট: নারীজাতি আজও প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি
নারী মানে মা, নারী মানে কন্যা, নারী মানে স্ত্রী, নারী মানে ভগিনী, আরও কত কী! নারীকে আমরা জগজ্জননী রূপে আবাহন করি, পুজো করি। কিন্তু আমরা কি প্রকৃতপক্ষে নারীকে প্রাপ্য সম্মান এবং মর্যাদা দিই! ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘Charity begins at home’. নারীকে সম্মান এবং মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি নিজের বাড়ি থেকেই শুরু করতে হয়। ছোটবেলা থেকে প্রত্যেকের সন্তানকে (ছেলে হোক বা মেয়ে) মেয়েদের সম্মান করার পাঠ দিতে হবে। দিতে হবে নৈতিক শিক্ষা। ছোটবেলা থেকে যদি কেউ মেয়েদের সম্মান করতে শেখে, তবে সেই শিক্ষা তাকে সারাজীবন চালিত করবে। বাড়ির পর আসে বিদ্যালয়। সেখানেও শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার পাঠ আবশ্যিক করতে হবে। শিশুরা ছোটবেলায় যা শেখে, তা তারা সারাজীবন ধরে রাখে। ছেলেমেয়েদের সুশিক্ষা দিলে সমাজ আজকের দিনের মতো কলুষিত হত না। বর্তমানের রাজনীতিও সমাজ জীবনকে কলুষিত করার অন্যতম হাতিয়ার। ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে সমাজের ভালো করা যে রাজনীতির প্রধান এবং মুখ্য উদ্দেশ্য, তা থেকে আজকের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কেউ কেউ বিচ্যুত হয়েছেন।
নারীর সমানাধিকার আজ আইনের চোখে স্বীকৃত। তাঁদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য অনেক নতুন আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে। তার পরেও আমাদের দেশে অভয়া কাণ্ড, কামদুনি, হাঁসখালির মতো বহু ঘটনা ঘটেই চলেছে। গত ৯ আগস্ট কলকাতার নামকরা মেডিক্যাল কলেজ আর জি করে ঘটা চিকিৎসক পড়ুয়ার ওপর হিংস্র আক্রমণ ও তাঁকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার অভিযোগ সমাজ জীবনকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার রেশ কলকাতা ছাড়িয়ে ভারতের সব শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে বিদেশের মাটিতেও। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের পড়ুয়াকে নৃশংস অত্যাচার করে খুনের প্রতিবাদে গত ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে কলকাতার রাজপথ দখলের ডাক দিয়েছিলেন মহিলারা। হাজার হাজার মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে সেই ডাকে সাড়া দিয়ে সারারাত প্রতিবাদ জানান। কিন্তু এরই মাঝে কিছু দুর্বৃত্ত হাসপাতালের দ্বিতল এবং তৃতীয়তল ভেঙে চুরমার করে দেয়। জানি না এরা কারা।

একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েকে বাবা-মা চিকিৎসক তৈরির জন্য সথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। মেধাবি মেয়েটি প্রথমে কল্যাণী জওহরলাল নেহরু মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস পড়ার সুযোগ পান। সেখানকার পড়া শেষ করে পোস্ট গ্রাজুয়েশনের জন্য কলকাতার আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে যান। এ বছর ছিল তাঁর দ্বিতীয় বর্ষ। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে রোগী দেখা এবং পড়াশোনা চলতে থাকে। কিন্তু এরই মধ্যে আসে সেই অভিশপ্ত রাত, যেদিন টানা ৩৬ ঘন্টা ডিউটি করার পর বিশ্রামের জন্য যান। তারপর তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় বাংলার মানুষ আজ বিক্ষোভে শামিল হয়েছে। কোনও রাজনীতি নয়, দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের স্বতস্ফূর্ত প্রতিবাদ বহুদিন বাদে দেখা গেল। মহিলারা যেমন মৃত পড়ুয়ার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সাধারণ মানুষেরও তেমন সমর্থন পেয়েছে সন্তানহারা দম্পতি।
আরও একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল কলকাতা। গত ১৮ আগস্ট যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ছিল ১৩৩তম ডুরান্ড কাপ ফুটবলে ইস্টবেঙ্গল এবং মোহনবাগানের খেলা। ইস্টবেঙ্গল এবং মোহনবাগানের খেলা মানে বাংলার মানুষের আবেগ। ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই দুই দলের ফুটবল ম্যাচ বাঙালি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে। আজও তার বিরাম নেই। সাধারণভাবে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা ছিন্নমূল মানুষ ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সমর্থক। আর যাঁরা এ দেশেই ছিলেন, তাঁরা মোহনবাগান ক্লাবের সমর্থক। এই সমর্থক তৈরি হয়ে যায় এক্কেবারে ছোটবেলা থেকে। চারদিকের পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ে যখন হয়তো তারা ওয়াকিবহাল নয়, তখন ইস্টবেঙ্গল এবং মোহনবাগানের খেলা থাকলে বাড়ির কর্তা বা অন্য আত্মীয়ের দেখাদেখি একই দলের সমর্থক হয়ে যায়। সাধারণত যে পরিবার ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সমর্থক, দেখা যায়, তাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরাও ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সমর্থক হয়ে যায়। মোহনবাগান ক্লাবের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। ব্যতিক্রম আছে, তবে তা খুব কম। আর রাজনৈতিক মনোভাব তৈরি হয় ছেলেমেয়েরা একটু বড় হলে, যখন তারা সমাজকে বুঝতে শেখে।

ইস্টবেঙ্গল বা মোহনবাগান ক্লাবের খেলোয়াড়রা দলবদল করেন। কিন্তু সমর্থকদের কখনও দলবদল করতে দেখবেন না, ক্লাবের প্রতি এতটাই তাঁদের গভীর ভালোবাসা। সেই দুই ক্লাব যখন আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রীর নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে এক হয়, তখন তো একটা অন্যরকম ভালোবাসা তৈরি হবেই। দুই দলের সদস্যরা ঠিক করেছিলেন, তাঁরা যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ডার্বি ম্যাচ চলার সময় সবাই আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদ করবেন। তাঁরা স্লোগান তৈরি করে ফেলেন— ‘ডার্বির এক স্বর, জাস্টিস ফর আর জি কর’, ‘ঘটি-বাঙাল এক স্বর, জাস্টিস ফর আর জি কর’। কিন্তু প্রশাসন ওইদিন পুলিশ দিতে পারবে না জানিয়ে দিলে ডুরান্ড কাপ কমিটি খেলা বাতিল ঘোষণা করে। উভয় দলকে এক পয়েন্ট করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তাতে দুই দলের প্রতিবাদ বন্ধ করা যায়নি। বরং আন্দোলনের তীব্রতা বেড়েছে বহুগুণ। দুই দলের সমর্থকরা যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের বাইরে জমায়েত হন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেয় কলকাতা মাঠের তৃতীয় প্রধান মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাব। তিন দলের সমর্থকরা হাতে লাল-হলুদ, সবুজ-মেরুন এবং সাদা-কালো বা জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিল করেন। যে দু’টি দল খেলার মাঠে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, তারাই সমাজের ঘৃণ্য, নৃশংস একটি হত্যাকাণ্ডে একসঙ্গে গলা মিলিয়ে বলছে, ‘ঘটি-বাঙাল এক স্বর, জাস্টিস ফর আর জি কর’। এ এক অভূতপূর্ব প্রতিবাদ! এ ধরনের প্রতিবাদ কলকাতা প্রথম দেখল। সাধারণ মানুষ আপ্লুত।
আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রীমৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার দাবি শহর কলকাতা ছাড়িয়ে গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই যে একটি স্বপ্নকে কয়েকজন দুষ্কৃতী শেষ করে দিল, সারা বাংলা তার বিচার চায়। সাধারণ মানুষের এই যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দিকে দিকে প্রতিবাদ, তাতে যোগ দিয়েছেন সংগীত জগতের মানুষ, হাইকোর্টের উকিল, টলিউডের শিল্পী-সহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ।
যাই হোক, রাজ্যের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের এই নিন্দনীয় ঘটনার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং ভবিষ্যতে যাতে আর এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখবে, এটাই প্রত্যাশা।

Justice
খুব সুন্দর লেখা
নারীদের সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি আমাদের মধ্যে কিছু পুরুষদের নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি তথা চিন্তাভাবনা পরিবর্তন আনতে হবে
খুব সুন্দর লেখা
Khub sundor Sir
অসাধারণ লেখা | সমস্ত বক্তব্যের সাথে একমত
পরিস্থিতি সবার জন্যই চিন্তার। কিন্তু শুধু মাত্র চিন্তা বা সরকারি পদক্ষেপ এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির আশু উপায় হতে পারে না। প্রত্যেকটা মানুষের মূল্যবোধের শিক্ষা দরকার, রামকৃষ্ণ মিশনের শিক্ষা পদ্ধতি সর্বত্র চালু হলে ভালো হয়। —– এটা আমার সম্পূর্ণ নিজস্ব মত 🙏
You have shown the protest through your excellent writing aptly. I completely agree with you.