ড. শর্মিষ্ঠা ঘোষ
অধ্যাপিকা, ফকিরচাঁদ কলেজ

ভারতীয় সংস্কৃতিতে সুপ্রাচীনকাল থেকে মাতৃশক্তিকে আরাধনা করতে দেখা যায়। সমাজ, সাহিত্যেও মাতৃত্বের ভাবনা অতি সম্মানীয় স্থান অধিকার করে আছে। ‘মা’ শব্দটি প্রকৃতপক্ষে কোনও লিঙ্গকে সূচিত করে না। আবার ‘মা’ শব্দটি শুধু একজন গর্ভধারিণী নারীকে বোঝানো হয়, তা নয়। এ প্রসঙ্গে স্বামী রঙ্গনাথানন্দ বলেছেন, ‘মাতৃহৃদয় কেবল নারীকুলেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি নারীর যেমন, পুরুষেরও তেমনই সহজাত অধিকার ও সম্পদ। দেহগত মাতৃত্বেই কেবল নারীর একচেটিয়া অধিকার, আধ্যাত্মিক মাতৃত্ব সমগ্র মানবতার গর্বের ধন।’
একজন মায়ের মতো বাবারও মাতৃহৃদয় আছে। তবে নারীর মধ্যে এই মাতৃহৃদয়ের বিশেষ প্রকাশ ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, সংকীর্ণ অর্থে ‘মা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ‘মা’ শব্দটির সংকীর্ণ অর্থ হল, নারী সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে। এই সংকীর্ণতা থেকেই মাতৃত্বকে অবমাননাকর, নারীর ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধপক্ষ রূপে মনে করা হয়।
‘মা’ শব্দটি স্নেহ, করুণা, ভালোবাসা, ত্যাগ ও অনাশক্তির আদর্শ প্রতিমূর্তি। ‘মাতৃত্ব’ মানেই এক প্রসবকারী যন্ত্র, সমাজের এ ধারণা থেকে বেরিয়ে ঊনবিংশ শতকে মাতৃত্বকে এক নতুন সম্মাজনক স্থান দেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সারদাদেবী। তিনি একজন গর্ভধারিণী মা না হয়েও লক্ষ লক্ষ নরনারীর সত্যিকারের মা হয়েছেন। ‘মাতৃত্ব’ এক শক্তি (তাই তো পরাধীন দেশকে মাতৃত্বের রূপে বরণ করা হয়), যা ভারতে প্রাচীনকাল থেকে বন্দিত হয়ে আসছে।
ভারতীয় সংস্কৃতির একটি বৈশিষ্ট্য মাতৃশক্তির আরাধনা, তবে এই আলোচনা আধ্যাত্মিক স্তরে সীমাবদ্ধ থেকে গিয়েছে। মাতৃত্বের ভাবনার সঙ্গে নারীর সম-অধিকারের কোনও বিরোধিতা নেই, বরং মাতৃত্বের ভাবনা সমাজে এক শুদ্ধ, পবিত্র ভাবনার বাতায়ন নিয়ে আসতে পারে। তাই বর্তমান সময় নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও মাতৃশক্তি আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকে মাতৃত্বের রূপকে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শোষণের হাতিয়ার রূপে মনে করেন। তবে এ চিন্তা সম্পূর্ণ যথাযথ নয়। মাতৃত্বের মধ্যে কোনওরূপ অবমাননাকর কিছু নেই। সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে সন্তানের জন্ম দেওয়া প্রয়োজন, যার একমাত্র অধিকারিণী নারী। শুধু তাই নয়, একজন ‘মা’ই ভবিষ্যৎ সমাজের সুস্থ নাগরিক গঠনের কান্ডারি।
অন্য পোস্ট: গণতান্ত্রিক ভারতে নির্বাচন ও বাহুবল
ভারতীয় সৃষ্টিতত্ত্বে দেখা যায় যে, ব্রহ্মই দু’টি অংশে বিভক্ত হয়ে নারী ও পুরুষ রূপে ব্যক্ত হয়েছেন। বৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা হয়েছে, ‘স ইমমেবাত্মানং দ্বেধাপাতয়ত্ততঃ পতিশ্চ পত্নী চাভবতাং।’ এর অর্থ তিনি নিজের দেহকে দু’ভাগে ভাগ করলেন। সংসার সুষ্ঠুভাবে চালনার জন্য যেন এক একজনকে এক এক ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছে। এই চিন্তা থেকেই নারীকে প্রজনন ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছে। যেমন, সমাজের সুষ্ঠু পরিচালনার স্বার্থে বর্ণব্যবস্থার উৎপত্তি হয়েছিল।
প্রথমে গুণ অনুযায়ী কর্মের সুষম বিভাগের উদ্দেশ্যে বর্ণব্যবস্থার উৎপত্তি হয়েছিল। কারণ সব কাজ সকলের জন্য নয়। যদিও পরবর্তীকালে সমাজের কিছু ব্যক্তির স্বার্থজনিত উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে এই বর্ণব্যবস্থা জন্মগত হয়ে কুৎসিত রূপ ধারণ করে। একইভাবে নারী ও পুরুষ সৃষ্টির ক্ষেত্রেও সমাজের ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য সিদ্ধ করাই মূল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সমাজকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য, এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের মধ্যে জৈবিক গঠনগত পার্থক্য বর্তমান। কিন্তু এক্ষেত্রেও ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার্থে সমাজের কিছু মানুষ নারীর ক্ষমতাগুলিকেই তাঁদের বন্ধনে পরিণত করে (বিশেষ করে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে) সম-অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন।
আর একটি বিষয় হল, বেদ, উপনিষদ, স্মৃতিশাস্ত্র তো কোনও একসময় একজনের রচনা নয়, বহু মানুষ দ্বারা লিখিত। এছাড়া ভারতীয় প্রাচীন শাস্ত্রসমূহ দীর্ঘ সময় ধরে লিখিত হয়েছে। ফলে এসব কারণেই প্রাচীন শাস্ত্রে নারীর অবস্থা নিয়ে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। তা অনেক ক্ষেত্রেই স্ববিরোধী বলে মনে হয়ে থাকে। সুতরাং ভারতীয় সংস্কৃতির দিকে দৃষ্টি দিলে বোঝা যায় যে, আদিতে সৃষ্টিতত্ত্ব থেকেই নারী ও পুরুষের সমতার কথা বলা হয়েছে। তাই এ পরিস্থিতিতে মাতৃত্বের তত্ত্ব কোনও অবমাননা সূচক নয়। বরং ভারতের ইতিহাস ঘাঁটলে প্রত্যেক যুগে প্রত্যেক খ্যাতনামা যোদ্ধা, জ্ঞানী মানুষের সাফল্যের পিছনে এরূপ প্রজ্ঞাবতী, অন্তর্দর্শী, সুযোগ্যা জননীর সন্ধান পাওয়া যাবে। \
এছাড়া সমাজের বিভিন্ন সংকটময় সময় এই মাতৃরূপকে সামনে রেখে মানুষকে বিভিন্ন কঠোর সংগ্রামে ব্রতী হতে দেখা যায়। এই চিন্তা থেকেই ঊনবিংশ শতকে পরাধীন দেশের চরম দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় ভারতকে ‘ভারতমাতা’ রূপে কল্পনা করা হয় এবং মায়ের শৃঙ্খল মোচনের জন্য সন্তানরা সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে অবনীন্দ্রনাথের ভারতমাতা ছবিটির কথা উল্লেখযোগ্য।
সুতরাং বর্তমানে মূল্যবোধহীন যে সংকটময় পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে ভারতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য মাতৃত্বের ভাবনাকে বিকশিত করা প্রয়োজন।
