মতিউর রহমান

চারদিকে চাপ চাপ অন্ধকার। ঘোরতর সামাজিক সংকট। নৈতিক তথা মানবিক অবক্ষয়। ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত আমাদের দৈনন্দিন জীবন। সুস্থ-সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্নটা ক্রমশ ফ্যাকাসে, মলিন। অন্যায়, অনাচারের দাপটে আমরা বিপর্যস্ত। কোণঠাসা। বিপন্নও বটে। সূর্যের রংও ফ্যাকাসে হয়ে আসছে! কোথাও নেই দু’দণ্ড শান্তি। আজ বিপন্ন বনলতাদের অস্তিত্বও। বিপন্ন আমাদের দেশজ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, পরম্পরা। আমরা হতাশ, দিশাহারা, দিকভ্রষ্ট। সর্বত্রই রাহাজানিরাজ। কোথাও নেই প্রতিবাদ, গর্জে ওঠার সংকেত। সবাই বন্দি স্বার্থপরতার কারাগারে। ফলে সর্বত্রই নৈরাজ্য। এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতি। এ পরিস্থিতি থেকে আমরা মুক্তি পাব কবে? কীভাবে? কে দেখাবেন দিশা? কে জ্বালবেন আলো? চেতনার আলো। শুভবোধের আলো। প্রতিবাদের বহ্নিশিখা কবে ছড়িয়ে পড়বে জীবনের গলিপথ থেকে রাজপথে?
সাম্প্রতিক সময়ে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে এক ডাক্তারি ছাত্রীর ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর ব্যতিক্রমী বাংলাকে প্রত্যক্ষ করেছে দেশ। এ ঘটনার সঙ্গে যুক্তদের কঠোর শাস্তির দাবিতে পথে নামে নাগরিক সমাজ। প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে, এমনকী অন্যান্য দেশেও তার প্রভাব লক্ষ করা গিয়েছে। স্মরণকালের মধ্যে এই প্রথম এমন ব্যাপক সংখ্যক মানুষ কোনও অন্যায়ের প্রতিবাদে ন্যায়বিচারের দাবিতে পথে নামে। আন্দোলন এত ব্যপকতা লাভ করে যে, শাসকের রাতের ঘুম ছুটে যায়। এমন প্রতিবাদমুখর জনসমাজকে দেখে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মনে আশা জাগে, এবার বুঝি জেগে উঠল মানুষের প্রতিবাদী সত্তা। দীর্ঘকাল ধরে ঘুমিয়ে থাকা মানুষের বিবেক এবার বুঝি কথা বলবে। যে কোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে চালিয়ে যাবে লাগাতার আন্দোলন। এবার বুঝি তিলোত্তমা পাবে ন্যায়। কিন্তু কিছুকালের মধ্যেই থেমে গেল মানুষের প্রতিবাদ! তবে কি ফের সেই শীতঘুমে! তবে কি আশার সূর্য ডুবে গেল নিরাশার অন্ধকারে! তবে কি তিলোত্তমার ন্যায়ের দাবি অথৈ জলে! মানুষের প্রতিবাদ-চেতনা তবে গকি ঘুমিয়ে পড়েছে? সে কি ক্ষণিকের জন্য জেগে উঠেছিল? এটা কি একটা ব্যতিক্রমী ঘটনা? স্বভাব-চরিত্র বজায় রেখে সে ফের অনন্ত ঘুমে!
বিগত বহু বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, মানুষের জীবন থেকে একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিবাদের ভাষা। সমস্ত অন্যায়-অনাচার মুখ বুজে সহ্য করতে করতে, দেখেও না দেখার ভান করে আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের নিজস্ব পরিচয়, ঐতিহ্য। ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে আমাদের গর্ব, জাতিসত্তার অহংবোধ। দেশজুড়েই মানুষের মধ্যে একটা বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিবাদ না করে নীরবে গা বাঁচিয়ে চলা। চোখের সামনে অন্যায় দেখেও আমরা প্রতিবাদ না করে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে চলি। এ বড় অশুভ সংকেত। ভয়াবহ বিপর্যয়ের আগাম আভাস। এভাবে বেশি দিন চলতে পারে না। একদিন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে। পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে আপনি যতই নির্বিকার থাকার চেষ্টা করুন না কেন, তার লেলিহান শিখা আপনার গৃহটিকেও গ্রাস করবে। তখন নাকে সরষের তেল দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারবেন তো?
তবুও প্রতিবাদ হয়। কারণ সাধারণের মধ্যেই মিশে থাকে কিছু অসাধারণ চরিত্র। ব্যতিক্রমী মানুষ। তাঁরা সাধারণ মানুষের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। কিন্তু বড় দুঃখের কথা, সাধারণ মানুষ তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না। তবুও ব্যতিক্রমীরা ব্যতিক্রমীই। চিরকালই। সমস্ত বিপদ হেলায় তুচ্ছ করে তাঁরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসেন। তাঁরা চিরকালই নমস্য। প্রণম্য। তাই এখনও দশজনের সামনে ইভটিজিং হলে ন’জন চোখ বন্ধ করে নিলেও একজন এগিয়ে এসে প্রতিবাদ করেন। কিন্তু তাঁরা বরাবরই সংখ্যালঘু। তাই প্রতিবাদ করার শাস্তিস্বরূপ অনেক সময় তাঁদের চড়া মূল্য দিতে হয়। শুধু অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে, এমন উদাহরণ ভূরি ভূরি। বর্তমান সময়ে এরকম দুর্ভাগ্যজনক বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটে গিয়েছে। তাঁদের জন্য একটু হা-হুতাশ আর নীরবে দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলার সময় বা সদিচ্ছা কি আমাদের আছে? আছে কি আমাদের সে মন? তবুও প্রতিবাদ বেঁচে থাকে। নিজস্বতায়। স্বকীয় ধর্মে। যুগে যুগে। কালে কালে।
এক্ষেত্রে পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা আমাদের হতাশ করেছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায় যাঁদের হাতে, তাঁরা যদি সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তাহলে আমাদের আর কী-ই বা করার থাকে! যে ব্যক্তি নিজের জীবন বিপন্ন করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসেন, তাঁর ব্যক্তিগত পারিবারিক নিরাপত্তা দেওয়ার কাজ কিন্তু পুলিশ-প্রশাসন-সরকারের। তারা সেক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা পালনে যে ব্যর্থ, বর্তমান সময়ে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি ঘটনা তা প্রমাণ করেছে। এমন চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা দিন দিন কমে আসবে। মানুষের বুকের মধ্যে জ্বলতে থাকা প্রতিবাদ চেতনার দীপ একদিন নিভে যাবে। সম্পূর্ণ অচেনা-অজানা একজন পুরুষ বা নারীর জন্য ভিড়ের মধ্য থেকে একা এগিয়ে আসার যে প্রবণতা, তার জন্য কোনও উচ্চশিক্ষা বা ডিগ্রির প্রয়োজন হয় না। দরকার জ্বলে ওঠার জন্য একটা স্ফুলিঙ্গ। যাঁর বুকের মধ্যে এ স্ফুলিঙ্গ থাকে, তিনি অগ্র-পশ্চাৎ ভাবেন না। কিন্তু সে অসমসাহসীর কৃতকর্মের ফল যদি নেতিবাচক হয়, তাহলে তিনি আর এগিয়ে আসবেন কেন?
অন্য পোস্ট: আর জি কর কাণ্ড নিয়ে এত লুকোছাপা কেন
মনে করুন, আপনার বাড়ির পাশে কেউ শব্দ দূষণের নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লাগাতার লাউড স্পিকার বাজিয়ে যাচ্ছেন। আপনি সে ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করতে পারবেন না। আপনি আক্রান্ত হতে পারেন। আপনি যদি পুলিশের সাহায্য নেন, তাহলে পাড়ায় আপনার বসবাস করা দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে। তাই আপনাকে নীরবে হজম করতে হবে শব্দদানবের দুরাচার। ধরুন, ন্যায্য ভাড়া দিয়ে আপনি বাসে চেপেছেন সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছবেন বলে। কিন্তু বাসচালকের মর্জি নেই, তাই তিনি গতি বাড়াবেন না। আপনি প্রতিবাদ করতে পারবেন না, কারণ আপনাকে নির্বিকারভাবে বাস থেকে নেমে যেতে বলা হবে, সঙ্গে অশ্রাব্য গালিও জুটতে পারে। আবার ধরুন, আপনি আপনার মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেবেন বলে সাইকেলে চাপিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। মোড়ের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি ছেলে দূর থেকে অশ্রাব্য কটূক্তি ছু্ড়ে দিচ্ছে। আপনি প্রতিবাদ করতে পারবেন না। সে ক্ষেত্রে আপনাকে আরও অপমানজনক কথাবার্তা শুনতে হতে পারে, প্রহারও জুটতে পারে। আপনি অসহায়। এভাবে প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়তে থাকে অসহায়তা। মনে পড়ে, একদিন বাসে একটি ছেলে কন্ডাক্টরের অন্যায়ের প্রতিবাদ করছিলেন আর আপনি পাশের সিটে বসে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছিলেন, দেখেও না দেখার ভান করেছিলেন? আজ পেলেন তো তার ফল? আপনার সামনে আপনার মেয়ের অসম্মান, আপনার অসম্মান নীরবে হজম করতে হল তো? কেমন লাগছে? এর পরেও আপনি নীরব থাকবেন? অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন না? আর কতদিন মূক-বধির হয়ে থাকবেন? এরপর একদিন দেখবেন, আপনার সামনেই আপনার বউয়ের হাত ধরে টানাটানি করবে ওই দিকভ্রষ্টের দল। সহ্য করতে পারবেন তো?
তাই আর ঘুম নয়। আপনারা জাগুন। এগিয়ে আসুন। আমরা সমবেত হই। যেখানেই অন্যায় দেখব, প্রতিবাদ করব। আমরা প্রতিবাদীর পাশে এসে দাঁড়াই। পারবেন না? ভয় করছে? কীসের ভয়? জানবেন, সংঘবদ্ধ জনতার প্রতিরোধ প্লাবনের চেয়েও শক্তিশালী। প্রথম প্রথম একটু সমস্যা হলেও একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা সংঘবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদে মুখর হতে পারলে অন্যায়কারীরা ভয়ে পালিয়ে যাবে। তারা আর অন্যায় করার সাহস পাবে না। আপনার বুকের ভিতর প্রতিবাদ চেতনার যে আগুন ঘুমন্ত অবস্থায় আছে, তাকে কোমায় পাঠিয়ে দেবেন না। জাগিয়ে তুলুন। তাকে বাঁচান। তাহলে আপনিও বাঁচবেন। প্রতিবেশীকেও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার রসদ জোগাবেন।
জ্বালুন আগুন। চেতনার আগুন। প্রতিবাদের আগুন। শুভবোধের আলোকমালায় আমরা সকলেই আলোকিত হই। সবাই ভালো থাকি। সুস্থ থাকি। সুন্দর থাকি। সুখ-শান্তি, প্রগতির প্লাবন নামুক জীবনের মরু সাহারায়। ধূসর পৃথিবীর বুকে নেমে আসুক রঙের বসন্ত। রাত শেষে আর একটি আলোকোজ্জ্বল সকাল আসবে বলে আমরা সবাই যেন মুখিয়ে থাকি।
