কাজল মুখোপাধ্যায়

যে দিনটিতে মানুষের কৌতূহল প্রথমবার খুব কাছ থেকে দেখেছিল, আলো শুধু পথ চলা কোনও বাহক নয়, পদার্থের সঙ্গে তার এক গভীর, সূক্ষ্ম যোগাযোগ আছে, সেটি ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি। সেই যোগাযোগের ভাষা প্রথম স্পষ্ট করে পড়তে পেরেছিলেন বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী সি ভি রমণ। এই দিনটি জাতীয় বিজ্ঞান দিবস হিসাবে পালন করা হয়।
জাতীয় বিজ্ঞান দিবস কোনও আনুষ্ঠানিক উৎসব নয়, এটি বিজ্ঞানের বিভিন্ন সাফল্য এবং নতুন পথের সন্ধানে বিজ্ঞানীদের নিরন্তর গবেষণার উল্লেখের এক আলংকারিক তারিখ মাত্র, বিজ্ঞান দিবসের মাধ্যমে মানুষের চিন্তার দিগন্তকে নতুন করে উন্মোচনের স্মরণ করা।
আমরা ‘জাতীয় বিজ্ঞান দিবস’ বলি, তার মূল উৎস একটি পরীক্ষাগার, কিছু যন্ত্রপাতি, আর এক বিজ্ঞানীর অবিচল কৌতূহল। আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে রমণ-প্রভাবের আবিষ্কার নিছক একটি তত্ত্ব নয়, এটি প্রকৃতির ভাষা পড়ে ফেলার এক অনন্য মুহূর্ত।
এ কাজটি সম্পন্ন হয়েছিল কলকাতারই এক ঐতিহাসিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্সে। এখন সে সময়ের গবেষণার পরিকাঠামো আমাদের কাছে প্রায় অনাড়ম্বর বলেই মনে হবে। তবু সে সীমিত সুযোগের মধ্যেই রমণ দেখিয়েছিলেন, বিজ্ঞান বড় যন্ত্রের চেয়েও বেশি নির্ভর করে মানুষের মনোযোগ, ধৈর্য আর প্রশ্ন করার ওপর।
রমণের আবিষ্কার বিজ্ঞানের ভাষায় অত্যন্ত স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছিল, আলো যখন কোনও পদার্থের ভিতর দিয়ে যায় বা তার সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়া করে, তখন একইরকম থাকে না। আলোর তরঙ্গের চরিত্রের সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনের মধ্যে লুকিয়ে থাকে পদার্থের নিজস্ব গঠন ও আণবিক স্বভাবের খবর।
ফলে একলহমায় রসায়ন ও পদার্থবিদ্যার মাঝখানের দেওয়াল যেন খানিকটা স্বচ্ছ হয়ে যায়। পদার্থের অণু-পরমাণুর ভিতরের নীরব কম্পন ধরা পড়ে আলোর রঙের বদলে যাওয়া ভাষায়। বিজ্ঞানের জগতে এ ধারণা ভবিষ্যতে বিশ্লেষণমূলক গবেষণার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল, যার ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক উপাদান বিজ্ঞান, ওষুধ গবেষণা, এমনকী জৈবপ্রযুক্তির বহু শাখা গড়ে উঠেছে।
আমরা প্রায়ই বলি, বিজ্ঞান মানে জটিল সূত্র, দুর্বোধ্য যন্ত্র আর পরীক্ষাগারের কঠিন পরিবেশ। কিন্তু রমণের কাজ আমাদের শেখায়, বিজ্ঞান আসলে প্রশ্ন করা। কেন আকাশ নীল? কেন সমুদ্রের জল অন্যরকম দেখায়? কেন আলো সব জায়গায় একইভাবে আচরণ করে না? এই ‘কেন’-র মধ্যে বিজ্ঞানের জন্ম।
জাতীয় বিজ্ঞান দিবস তাই কেবল রমণকে স্মরণ করার দিন নয়, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান কোনও দূরবর্তী টাওয়ারে বসে থাকা বিজ্ঞানীদের একচেটিয়া অধিকার নয়। বিজ্ঞান জন্মায় বাড়ির জানালা দিয়ে প্রবেশ করা আলোর মধ্য দিয়েও। জন্মায় স্কুলের ল্যাবরেটরির টেবিলের উপর পরীক্ষায়, মফস্সলের কলেজে পড়া কোনও ছাত্রের মনে, যে এখনও জানে না, তার আপাত ছোট প্রশ্নটিই হয়তো একদিন বড় আবিষ্কারের পথে যাবে।
রমণের আবিষ্কার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছিল, আর তার মাধ্যমেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম ভারতীয় বিজ্ঞানী। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে আর একটি গভীর সত্য, ঔপনিবেশিক ভারতের সীমাবদ্ধ পরিবেশে দাঁড়িয়েও মৌলিক গবেষণা যে সম্ভব, রমণ সেটাই প্রমাণ করেছিলেন।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা যখন ‘স্টার্টআপ’, ‘ইনোভেশন হাব’ কিংবা ‘ডিপ টেক’ শব্দ উচ্চারণ করি, তখন প্রায় ভুলেই যাই, সৃজনশীল চিন্তার বীজ আসলে বাজারের প্রস্তাবনায় নয়, মানুষের কৌতূহলে জন্ম নেয়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে জাতীয় বিজ্ঞান দিবসের গুরুত্ব তাই আরও আলাদা। এখানে বিজ্ঞান মানে শুধু উচ্চশিক্ষার সিলেবাস নয়, সামাজিক দায়িত্বও। জল, বায়ু, খাদ্য, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, প্রতিটি প্রশ্নের কেন্দ্রে আজ বিজ্ঞান দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু সে বিজ্ঞানের সঙ্গে সমাজের দূরত্ব যদি বেড়েই চলে, তবে বিজ্ঞান কেবল গবেষণাপত্রের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
রমণের জীবন আমাদের একটি নীরব শিক্ষা দেয়, গবেষণার সঙ্গে দেশের বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন হওয়া উচিত নয়। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দৌড়ে নামার আগে নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করার অভ্যাস তৈরি করাই সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানচর্চা। জাতীয় বিজ্ঞান দিবসে তাই আমাদের শ্রদ্ধা শুধু একজন মহান বিজ্ঞানীর প্রতি নয়, সেই কৌতূহলের প্রতিও, যা আলোককে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি কি সত্যিই সব সময় একরকম? বিজ্ঞানের ইতিহাসে সে প্রশ্নের উত্তর আজও প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে সময়ের সঙ বিবর্তিত হয়ে।

