শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

স্বাধীনতার আগে বাংলার গ্রামে বৈচিত্র, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি যেমন ছিল, স্বাধীনতার পর যত দিন এগিয়েছে, ততই সেসব ফিকে হয়েছে। ছয়-সাতের দশক অবধি গ্রামের কোনও পরিবারে উৎসব, বিবাহ, উপনয়ন, অন্নপ্রাশন হলে সে সংবাদ পৌঁছানো হত পাড়া বা গ্রামের ঘরে ঘরে। গৃহকর্তা নিজে বা লোক পাঠিয়ে ঘরে ঘরে সংবাদ দিয়ে আসতেন, অমুকের ঘরে অমুকের বিয়ে/পৈতা/ভুজনা। আসা-যাওয়া কুটুম্বাদি, মেয়েছেলের দুপুরে ভোজের নিমন্ত্রণ রইল।
অন্নপ্রাশনকে গ্রামের লোকজন ‘ভুজনা’ বলতেন। তখন এভাবেই নিমন্ত্রণ হত। আবার শুভ সংবাদটিও পৌঁছে দিয়ে আসা হত। শুধু নিমন্ত্রণ নয়, দুপুরে ডাক পাঠাতে হত। আজকের প্রজন্মের কাছে এসব সংস্কৃতি কল্পনার বাইরে। গ্রামে এখন তো আর্থিকভাবে পুষ্টরা বেশির ভাগই থাকেন না। গ্রামের সিংহদরজাওয়ালা ঘর ছেড়ে শহরে চাকচিক্যের বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছেন। গ্রামের বহু ঘর ফাঁকা হয়ে পড়ে রয়েছে। ঝোপঝাড় গ্রাস করেছে একসময়ের ঐতিহ্যবাহী ঘরগুলোকে।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা গ্রামের খড়ের ঘরগুলির। গ্রাম থেকে খড়ের ছাউনির মাটির ঘর বিদায় নিতে বসেছে। আগেকার দিনে খড়ের ছাউনির মাটির দোতলা ঘর গ্রামের গর্ব ছিল। সেগুলিকে ‘কোঠাঘর’ বলা হত। ‘কোঠা’ শব্দটিই এখন বিলুপ্তপ্রায়। কোঠাঘরে ওঠার সিঁড়ি মাটির ছিল। একচালা, দোচালা, চারচালা ঘর হত। সুরক্ষিত রাখতে দেওয়ালে খড়ের আচ্ছাদন দেওয়া হত। খুব ছোট ছোট জানালা থাকত। ঘরের ভিতরে গোপন চৌকুঠুরি থাকত।
বর্তমানে ধানজমি শেষ হতে বসেছে। ধানজমি থাকলেও আধুনিক পদ্ধতির চাষে ধান উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও খড় খুবই দুর্বল। মাসখানেকেই পচন ধরে। কেন্নোর বাসা হয়। কলমকাঠির চাষ নেই। খড় লম্বা হয় না। বর্তমানে ঘর ছাওয়ার জন্য খড় অপ্রতুল। যদিও-বা কোথাও কোথাও মেলে, তার চড়া দাম। খড়ের ঘরের ছাউনিতে বাবুই দড়ি ও বাঁশের বাতা অপরিহার্য। দু’টিই এখন দুষ্প্রাপ্য। বিশেষত বাবুই দড়ি এখন আর সর্বত্র কিনতে পাওয়া যায় না। সুতরাং গ্রামের মানুষজনের পক্ষে খড়ের ছাউনির ঘর টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খড়ের ছাউনির ঘরের রক্ষণাবেক্ষণে প্রচুর ল্যাঠা। বছর দু’-তিনের পরেই গোটা ঘরের ছাদ ঝেড়ে ছাউনি দিতে হয়। বছরে একবার ‘তলগঞ্জা’ ছাউনি লাগে। তলগঞ্জা বা তলগোঁজা ছাউনি হল খড়ের ঘরে যে জায়গায় ফুটো হয়, সেখানে খড়ের নতুন আঁটি গুঁজে দেওয়া। তলগঞ্জা বা তলগোঁজা শব্দটি এখন অনেক অর্থেই ব্যবহৃত হয়। শব্দটি এসেছে খড়ের ঘরের ছাউনি থেকে। একসময় প্রত্যেক গ্রামে বাড়ুইদের বসবাস ছিল। তাঁদের পেশা ছিল খড়ের ঘরে ছাউনি দেওয়া। খড়ের ঘরের টুইয়ে চড়ে যাঁরা ঘর ছাউনির কাজ করতেন, তাঁদের বাড়ুই বলা হত। নীচে দাঁড়িয়ে খড়ের আঁটি জলে ভিজিয়ে দু’-হাতে ধরে যাঁরা উপরের বাড়ুইকে রকেটের মতো ঝিঁকে পাঠাতেন, তাঁদের ‘তল বাড়ুই’ বলা হত। কীর্তন দলের সমবেত গায়ক-গায়িকাদেরও ‘তল বাড়ুই’ বলার চল ছিল। বর্ষাকালে অঝোর ধারায় বৃষ্টির সময় খড়ের ছাউনির চাল বেয়ে লাল জল নামত। অনেকটা র চায়ের মতো। শৈশবে সেই রক্তরঙিন বহমান জল ছাঁচাকোলকে সুন্দর করে তুলত। ওই রঙিন জলেই কাগজের নৌকো ভাসানো ছিল এক মজাদার খেলা।
উৎসব, পুজো, অনুষ্ঠানে খড়ের ছাউনি দেওয়া বিশাল উঁচু ঘরের দেওয়াল খড়িমাটি ও নীলবড়ি মিশিয়ে হাঁড়িতে-কুড়িতে গুলনি করে ছেঁড়া কাপড়ের ন্যাতা দিয়ে রং করা হত। এই রং করাকে বলা হত ‘ছঁচ’ দেওয়া। ন্যাতাকে গ্রামের ভাষায় ‘লাতা’ বলা হত। লম্বা সিঁড়িকাঠ বা মইয়ে চড়ে পাড়ার মহিলারা, যাঁদের কামিন বলা হত, তাঁরাই ছঁচ দেওয়ার কাজটি করতেন।
খড়ের ছাউনির ঘর বসবাসের পক্ষে আরামদায়ক হলেও আগুন লাগার ভয় ছিল মারাত্মক। একটি খড়ের ঘরে আগুন লাগলে পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে যেত। সে কারণেও গ্রাম থেকে খড়ের ছাউনির ঘর হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে খড়ের ছাউনির চারচালা উঁচু কোঠাঘর দেখা যায় রেস্তোরাঁ, হোটেল, লজ রূপে। পর্যটকদের কাছে খড়ের ছাউনির মাটির ঘর জনপ্রিয় হচ্ছে। (চলবে)
