ড. রাজকুমার মোদক
অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ
সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

‘কুম্ভিলকবৃত্তি’ শব্দটি অতি প্রাচীন হলেও শুনতে অর্বাচীনই লাগে। কেননা ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভলিউশনের হাত ধরে আসা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এত নকলের ছড়াছড়ি যে, এ শব্দটাই যেন মানুষের মনের মধ্যে আসল রূপে জেঁকে বসেছে।
‘কুম্ভিলকবৃত্তি’ বর্তমানে প্লেজিয়ারিজম নামে পরিচিত। একে একপ্রকারের চুরিও বলা চলে। তবে এটিকে চুরি সরাসরি বলা যাবে তখনই, যদি কোনও ব্যক্তি অন্যের লেখাকে নিজের লেখা বলে দাবি করেন। অর্থাৎ অন্যের মৌলিক কাজকে নিজের বলে চালিয়ে দেওয়া।
এখন প্রশ্ন হল, মানুষ কেন অন্যের মৌলিক কাজ অর্থাৎ যা তাঁর আদৌ নয়, তাকে নিজের বলে দাবি বা দাবি করার চেষ্টা করেন? এ প্রশ্নের উত্তরে নানা খুঁটিনাটি দিক আলোচনা করার আগে বর্তমানে ভারতের নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপে অনুষ্ঠিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনে (১৬-২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) উত্তরপ্রদেশের গ্রেটার নয়ডার একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি দ্য গ্যালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটির ওরিয়ন নামক একটি চিনা রোবটকে তারা নিজেরাই ডেভেলপ করেছে বলে দাবি করা, পাশাপাশি ধরা পড়ার পর তাদের ওই জায়গা থেকে পত্রপাঠ গলাধাক্কা, সংশ্লিষ্ট অধ্যাপিকার ক্যামেরার সামনে বিনা সংকোচে অদ্ভুত সাফাই দেওয়ার চেষ্টা এবং এর প্রেক্ষিতে কারও কারও মত অনুযায়ী, বিদেশের কাছে ভারতের মান ডুবে যাওয়া— এ সকল ঘটনাই ‘কুম্ভিলকবৃত্তি’ নিয়ে আলোচনা করার প্রেক্ষাপট।
মানুষ কেন কুম্ভিলকবৃত্তি অবলম্বন করেন, এ প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা যাক। এর কয়েকটি কারণ থাকলেও যেটি এক্কেবারে প্রধান, সেটি হল আধিপত্যের লোভ, আর দ্বিতীয়টি টিকে থাকার চেষ্টা। যেমন, স্বয়ং স্যার আইজ্যাক নিউটন ইংল্যান্ডের রয়্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হয়েও মৌলিক চিন্তনকারী গণিতবিদ লাইবনিজের কতকগুলি আক্সমকে নিজের বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন। তবে সেই সময় লাইবনিজকে দমিয়ে দিলেও ইতিহাস স্যার আইজ্যাক নিউটনকে ক্ষমা করেনি। অবশ্য ওই সকল আক্সমের মধ্যে মিল থাকলেও নিউটনের পদমর্যাদার কথা মাথায় রেখে উভয়ের নামই পরবর্তীকালে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে স্বীকৃতি পেয়েছে।
ভারতে রাধাকৃষ্ণন ও তাঁর সুযোগ্য ছাত্র যদুনাথ সিনহার মধ্যে কুম্ভিলকবৃত্তি নিয়ে যে সমস্যা, তা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। শোনা যায়, রাধাকৃষ্ণন বিচারকের কাছে দাবি করে বসেন, ‘মাই মেমোরিস বিট্রেড মি।’ এ প্রশ্নটির উত্তর আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আগে আরও জানা দরকার, চিন্তাভাবনা যে সত্যিই মৌলিক, সেটা নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন প্লেজিয়ারিজম টুল রয়েছে। কিন্তু এই টুল যখন ছিল না, তখন এর কাজটি করতেন শ্রুতিধররা। কথিত আছে, স্বয়ং শংকরাচার্য ব্রহ্মসূত্র ভাষ্য লেখার সময় একজন শ্রুতিধর ছাত্রকে রেখেই ছিলেন কুম্ভিলকবৃত্তি এড়ানোর জন্য। তবে এমনও শোনা যায়, একজন কবিতা পিয়াসী রাজার কবিতার পিয়াস মেটানো যাবে, অথচ রাজকোষে হাত পড়বে না, এরকম ফন্দি খাটিয়ে তাকে ফলপ্রসূ করার জন্য মন্ত্রী একজন শ্রুতিধরকে কাজে লাগান। ফলে কবিতা যত মৌলিকই হোক না কেন, ‘আগে শুনেছি’ বলে শ্রুতিধর গড়গড় করে একই কবিতা আউড়ে যান। তবে একজন বিশেষ কবি এমন কবিতা লেখেন, যেখানে বলা হয় যে, রাজার পিতা কবির পিতার থেকে কয়েক হাজার স্বর্ণমুদ্রা ধার নিয়েছেন, তখন শ্রুতিধর তাঁর মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর এই বিশেষ কবি ছিলেন স্বয়ং কালিদাস।
এবার মূল প্রশ্নের উত্তরে আসা যাক। আধিপত্যের লোভের বিষয়টি তো আলোচিত হয়েছে। কিন্তু টিকে থাকার জন্য এই কুম্ভিলকবৃত্তি অবলম্বন কেন? এর উত্তরে বলা যায়, পরিশ্রম না করে টিকে থাকার চেষ্টা করা। এ বিষয়টি বোঝা যাবে, যদি আমরা নদিয়ায় ন্যায়চর্চার ধারা দেখি। সে সময় ডিগ্রি দেওয়ার অধিকারী ছিলেন মিথিলার পণ্ডিতরা। কেননা তাঁরা পুস্তক রচনা করতেন। নদিয়ার নবদ্বীপ থেকে অনেক পণ্ডিত মিথিলায় ন্যায়শাস্ত্র অধ্যপনা করে বিভিন্ন টীকা গ্রন্থ রচনা করলেও ডিগ্রি দেওয়ার অধিকারী ছিলেন না। বাসুদেব সার্বভৌমের সুযোগ্য ছাত্র রঘুনাথ শিরোমণি মিথিলায় গিয়ে পক্ষধর মিশ্রকে তর্কযুদ্ধে পরাজিত করার পরেই নদিয়ার নবদ্বীপ থেকে ন্যায়শাস্ত্রে ডিগ্রি দেওয়া শুরু হয় এবং দেশ-বিদেশ থেকে সে সময় ন্যায়শাস্ত্র পড়ার জন্য শিক্ষার্থীরা আসতে থাকেন। সুতরাং অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের সততা, পরিশ্রম ও পাণ্ডিত্যই ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাদানের মূল অঙ্গ।
দ্য গ্যালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটির ঘটনাটি জনসমক্ষে এলেও এই তীব্র প্রতিযোগিতার যুগে, যেখানে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি বা কলেজগুলি পুরোপুরিভাবে ছাত্রদের বেতনের টাকাতেই পুষ্ট, তারা কতকটা বাধ্য হয়েই এ কাজে ব্রতী। শিক্ষার সঙ্গে যে শব্দগুলি যায়, সেগুলি হল, শিক্ষাদান, শিক্ষা অর্জন ইত্যাদি। প্রাচীন ভারতীয় চিন্তাভাবনায় গুরুর পাদপদ্মে থেকে শিক্ষার্থীরা যে শিক্ষা লাভ করতেন, তার জন্য শিক্ষার্থীদের বেতন দিতে হত না। যদিও বা শিক্ষার্থীরা কিছু দান করতেন, তখন সেটা পূজার অর্ঘ্যের মতোই বিবেচিত হত। তবে ভারতে মেকলে সাহেবের হাত ধরে শিক্ষাব্যবস্থার যে আমূল পরিবর্তন, সেই ধারা বইছে, শিক্ষাদান আর মিশন নয়, বেতনের বিনিময়ে সার্ভিস দেওয়া। সরকারি ক্ষেত্রে বেতনের ব্যবস্থা সরকার করলেও সেখানে শিক্ষাদান আর মিশন নয়, বেতনের বিনিময়ে সার্ভিস দেওয়াই। আর শিক্ষার্থীরা শিক্ষা অর্জনের জায়গায় শিক্ষা অনুকরণেই ব্যস্ত। বেসরকারি ক্ষেত্রে তো কথাই নেই। সেখানে শিক্ষকদের কোনও কোনও সময় ছাত্র ভর্তি করিয়ে তাদের বেতন থেকেই নিজেদের পারিশ্রমিক করিয়ে নিতে হয়। থাকে ছাত্রভর্তি করার টার্গেট।
এই পরিস্থিতি যে শুধু ভারতেই, তা নয়, বিশ্বব্যাপী। শিক্ষাই এখন মূল বিপণনের ক্ষেত্র। তাই চাই চমক, বিজ্ঞাপন, সহজে মনোযোগের আকর্ষণ। এই ভোগবাদী সমাজে প্রায় কেউই চাইবেন না, প্রকৃত অধ্যাপক হয়ে শিক্ষাদান করতে কিংবা কোনও শিক্ষার্থীই চাইবে না প্রাণপাত পরিশ্রম করে শিক্ষা অর্জন করতে। অনুকরণেই সন্তুষ্ট। এই যখন অবস্থা, তখন নৈতিকতার শেখানো বুলি দূর থেকে ধ্রুবতারার আলোর মতোই টিম টিম করে জ্বলে। আর এর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রমরমা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে থিসিস লেখা এবং তা এআই ফ্রি করার সফটওয়্যার রয়েছে। এ যেন গোলকধাঁধা।
ডারউইনের সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট স্মরণ করেই বলা যায়, সারভাইভ করার মাপকাঠিগুলিই এত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে যে, মানুষের মধ্যেকার ভ্যালু সিস্টেমকেই নড়িয়ে দিচ্ছে। মনে করিয়ে দিচ্ছে মার্কসের সেই তত্ত্ব— উৎপাদনের হাতিয়ার কখনও থেমে থাকে না, তাই উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটতে বাধ্য। ফলস্বরূপ উৎপাদন ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব থেকে পরিত্রাণের হাত কারও নেই, অধ্যাপক হোন বা কৃষক।
এটা ঠিক, টেকনোলজির উদ্ভাবন অবশ্যম্ভাবী। এর প্রয়োগেই গোলমাল। প্রয়োজন বলে কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এমন সফটওয়্যার তৈরি করতে হবে, যেটা নিজেই মানুষের শেখানোর ভ্যালু সিস্টেমের ১০০ শতাংশ প্রয়োগ করবে!
