সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইন তো পাশ করা হয়েছিল, কিন্তু এমন বিধবা পেতে হবে, যাঁরা বিয়ে করবেন। তা নিয়েই দেখা দেয় সমস্যা। কেউ তাঁদের বিধবা মেয়ে-বোনদের বিয়ে দিতে রাজি ছিলেন না। যাঁরা বিধবা বিবাহকে সমর্থন করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই আইনটা চেয়েছিলেন আয়ত্তাধীন বিধবা মেয়েদের বিয়ে করার জন্য। তার জন্যই তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু আসলে তেমন হয়নি। আইনের পক্ষে আবেদনকারীদের বেশির ভাগ নতুনত্বের জন্য তাঁদের নাম জড়িয়েছিলেন কিছুটা কৌতূহল থেকে এবং কিছুটা প্রভাবশালী সংস্থার চাপে। যেই অভিনবত্ব চলে গেল, তাঁরা একে একে দলত্যাগ করতে শুরু করেন। কারণ তাঁরা নিজেদের অন্তরের আবেগ থেকে সেটা করেননি। চার মাসের ওপর কেটে গেলেও কোনও সংস্থা উদ্যোগ নেয়নি।
এক লেখক বলেছেন, ‘এই মুহূর্তে হিন্দু বাল্যবিধবা বিবাহ একটি মৃত আইন প্রমাণ হয়েছে। বিধবা তার স্বামীর কাছ থেকে সম্পত্তির অধিকার অর্জনে ব্যর্থ হয়, যে কারণে হিন্দুরা এ ধরনের পুনর্বিবাহকে ঘৃণা করে। তাই আইন প্রণয়নের পর থেকে ৭০টির বেশি বিয়ে হয়নি।’
এই আইনে প্রথম বিয়ে হয়েছিল ১৮৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর, যা হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহের ইতিহাসে স্মরণীয় দিন। বর ছিলেন খাঁতুরার বিখ্যাত পণ্ডিত রামধন তর্কবাগীশের পুত্র তথা পণ্ডিত-ম্যাজিস্ট্রেট শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন। বিদ্যাসাগরের বন্ধু মদনমোহন তর্কালংকার এ বিয়ের আসল উদ্যোক্তা ছিলেন। তিনি দু’পক্ষকে জানতেন। এ বিয়েতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। মদনমোহন তর্কালংকারের জায়গায় মুর্শিদাবাদের পণ্ডিত-ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলেন শ্রীশচন্দ্র, কারণ মদনমোহন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলেন। সে সময় সাহেব বিচারকদের হিন্দু আইন বোঝানোর জন্য ও তাঁদের মতামত গ্রহণ করে হিন্দু পারিবারিক বিষয়ের মীমাংসা করতে এ বিষয়ে পারদর্শী হিন্দু পণ্ডিতদের সাহেব বিচারকদের পাশে বসানো হত এজলাসে। তাঁদেরই বলা হত পণ্ডিত-ম্যাজিস্ট্রেট। বিদ্যাসাগরও কিছুদিন পণ্ডিত-ম্যাজিস্ট্রেটের কাজ করেছিলেন।
একজন নতুন বউ ছিল কালীমতি দেবী। বিধবা লক্ষ্মীমণি দেবীর বিধবা মেয়ে। বিয়ের কিছুদিন আগেই সেই বধূর বাবা মারা গিয়েছিলেন। বিদ্যাসাগরের কঠোর পরিশ্রমে বিয়ে সম্পন্ন হয়। তিনি প্রচুর অর্থব্যয়ও করেছিলেন। সুকিয়া স্ট্রিটে রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে বিয়ে হয়। ঘটনাচক্রে রাতে রাজকুমারবাবুর বাড়ির দিকের রাস্তায় রাস্তায় মানুষের ভিড়। এত বেশি লোক জড়ো হল যে, অতি কষ্টে পালকি ঢুকেছিল। বিদ্যাসাগর নিজে এবং তাঁর বেশ কিছু প্রভাবশালী অনুসরণকারী পালকির দু’দিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। কারণ তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে, দাঙ্গা হয়ে যেতে পারে। তিনি ইতিমধ্যে পুলিশি সাহায্যের জন্য আবেদন করেছিলেন এবং যে সমস্ত রাস্তা দিয়ে বর যাচ্ছিল, সেখানে দাঙ্গা প্রতিরোধে ১ গজ অন্তর কনস্টেবলদের রাখা হয়েছিল। এ বিয়ে উদযাপনের খবর বিভিন্ন স্থানীয় পত্রিকায় বেরোয়। যেমন, সমাচার চন্দ্রিকা, সংবাদ প্রভাকর এবং ভাস্কর দৈনিক। এছাড়া কিছু পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকাতেও খবর বেরিয়েছিল। ভাস্কর ও সংবাদ প্রভাকর, এই দুটো পত্রিকা দুই পক্ষে ছিল। প্রগতিশীল শ্রেণির সেরা পত্রিকা তত্ত্ববোধিনীতে এ বিয়ের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। বিদ্যাসাগর নববধূকে নূপুর, পোশাক ও গয়না এবং অন্যান্য খরচও দিয়েছিলেন।
ধীরে ধীরে বিদ্যাসাগরের জীবিতাবস্থায় এরকম অনেক বিয়ে হয়েছিল, যার প্রত্যেকটিতেই তাঁকে প্রচুর পরিমাণে অর্থব্যয় করতে হয়েছিল। এছাড়া যাঁরা বিধবা বিবাহের কারণে বা ওইরূপ ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দরুন সমাজচ্যুত ও বিভিন্ন উপায়ে নির্যাতিত হয়েছিলেন, তাঁদের ভরণপোষণও তাঁকে করতে হয়েছিল। বই বিক্রি ছাড়া তাঁর আর আয় ছিল না, আর সেটা সীমিত। তাই তখনকার দিনে তাঁকে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ঋণ করতে হয়েছিল। তার পরে কলকাতা, হুগলি ও মেদিনীপুর জেলাতেও বিধবা বিবাহ হয়। তাঁর মতামতের যাথার্থ্য প্রতিপন্ন করে কয়েকটি প্যাম্ফলেট বেরোয়। তাতে তাঁর ক্ষুরধার যুক্তি ও হিন্দুশাস্ত্র সম্পর্কে গভীর জ্ঞান প্রকাশ পেয়েছিল। তাঁর কয়েকজন বন্ধু তাঁকে টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন, কিন্তু তা ছিল যৎসামান্য। যাঁরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই একে একে কেটে পড়েছিলেন। বিদ্যাসাগরকে ফের চাকরিতে যোগদান করতে হয়েছিল।
অন্য পোস্ট: নিজেকে সন্তুষ্ট করতে গীতাপাঠ জরুরি
বিদ্যাসাগর অনেক অত্যাচারের শিকার হন বিরোধীদের হাতে। কেউ কেউ তাঁর জীবননাশের চেষ্টা করে। ঠাকুরদাস একথা শুনে শ্রীমন্ত নামে গদায় পারদর্শী এক দেহরক্ষীকে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর সাহায্যেই বিদ্যাসাগর নিজেকে একদিন রাতে বাঁচিয়েছিলেন। বলা হয় যে, সে সময় যখনই তিনি রাস্তায় বেরোতেন, তখন মানুষ তাঁকে চারপাশে ঘিরে ধরত। অনেকে তাঁকে ভীষণ নোংরা বিদ্রুপ করত, অসভ্য ভাষায় গালি দিত। কেউ কেউ তাঁকে আক্রমণ, খুনেরও হুমকি দিত। একদিন এক ধনী লোক তাঁকে মারতে কয়েকজন লোককে ওঁৎ পেতে থাকতে বলেছিলেন। বিদ্যাসাগর খবর পেয়েই তাঁর বাড়িতে যান। তখন সেখানে উপস্থিত তাঁর পারিষদরা লজ্জায় মাথা হেঁট করেন। কেউ কেউ বলেছেন যে, সংস্কৃত কলেজের প্রাক্তন শিক্ষক প্রেমচাঁদ তর্কবাগীশ, যাঁকে বিদ্যাসাগর নিজের বাবার মতো শ্রদ্ধা করতেন, তিনি এই প্রচেষ্টা থেকে বিরত করার চেষ্টা করেছিলেন, কারণ তা নাকি হিন্দুসমাজের অনুভূতিতে আঘাত দিত। বিদ্যাসাগর তখন বলেছিলেন, এটা তাঁর সারাজীবনের লক্ষ্য। তিনি এর জন্য তাঁর জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। তিনি পাইকপাড়া রাজপরিবারের মহিলা সদস্যের কাছ থেকে ২৫,০০০ টাকা ঋণ নেন। বিধবা বিবাহের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য তিনি এই ঋণ করেছিলেন।
বিদ্যাসাগর লিখেছেন, ‘জাহানাবাদ উপ-বিভাগের চন্দ্রকোনা থানার কুমারগঞ্জের বাসিন্দারা বিধবা বিবাহের সমর্থনে দল গঠন করে। দলটা জানতে পারে যে, গ্রামে তাদের বিরোধীরা শিবপুজো বা চড়কপুজোয় বাধা দেবে। থানার দারোগা প্রয়োজনীয় হুকুম জারি করে। শান্তিভঙ্গের আশঙ্কায় দরখাস্তকারীদের অনুরোধে নির্বাহী আমলাকে সেই দিনেই হুকুম তামিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়, কারণ আর মাত্র ৫ দিন বাকি ছিল। থানায় প্রতিদিন জিজ্ঞাসা করা হত হুকুম পৌঁছেছে কি না, কিন্তু নেতিবাচক উত্তর মিলত। ২৮শে সেপ্টেম্বর, ১৮৫৬ আবেদনকারীরা হুকুম পৌঁছতে দেরী হওয়ায় জাহানাবাদে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটকে না পেয়ে নাজিরকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন যে, হুকুমটা যথাযথভাবে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু থানায় ফিরে জানতে পেরেছিলেন যে, তা পৌঁছয়নি। পুলিশি সাহায্যের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে তাঁরা বিরুদ্ধ পক্ষের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন এবং নিষ্পত্তি হয় যে, তাঁদের নির্বিঘ্নে আলাদাভাবে পূজা করতে দেওয়া হবে। বিরোধীদের কথায় নির্ভর ক’রে ৩০শে সেপ্টেম্বর তাঁরা পূজা করার জন্য মন্দিরের কাছে যাওয়ায় তাঁদের ভয়ানক নৃশংস প্রহার করা হয়। তাঁরা অভিযোগ করার জন্য থানায় এসেছিলেন, কিন্তু তাঁদের প্রতি কেউ মনোযোগ দেননি, কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা ক’রে তাঁদের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেই অনুসারে তাঁরা জাহানাবাদ গিয়ে সেই অফিসারের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। মামলা নিষ্পত্তি হয়নি।’
বিধবা বিয়ের সমর্থক দলের পদক্ষেপে বিরুদ্ধ পক্ষের পান্ডারা তাঁদের ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে গ্রামের জমিদার বাবু শিবনারায়ণ রায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তিনি তাঁর লোকজনকে বলেন সমর্থক দলকে ভয় দেখিয়ে ধরে আনতে। তারপর তাঁদের গ্রামের সকলের সামনে ভয়ানক মারধর করা হয়। পরে তাঁদের জমিদারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় এবং আরও প্রহার করা হয়, জরিমানা করা হয় এবং বিধবা বিবাহের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিলে তাঁদের ছাড়া হয়। এই কয়েকজন পুরুষ তাঁদের ঘরে ফিরে এসেছেন, কেউ কেউ তাঁদের পরিবার নিয়ে অন্যত্র পালিয়েছেন, অন্যরা সমগোত্রীয়দের নিষ্করুণ অবস্থা দেখে পালিয়েছেন।
অবসরের পরপরই বিদ্যাসাগর একবছরের মধ্যে হুগলি জেলার বিভিন্ন অংশে কম করে ১৫ জন বিধবার বিয়ে দিয়েছিলেন। বিয়ের সব খরচ তাঁকে বহন করতে হয়েছিল। এমনকী পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্বও তাঁর ছিল। তাঁর আয় এই চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট ছিল না, তাই তিনি ঋণ করতেন। তিনি বিব্রত হলেও নাছোড়। এমনকী নিজে টাকা ধার করে অন্যের দেনা মেটাতেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁর ঋণ ছিল প্রায় ৫০,০০০ টাকা, কিন্তু মৃত্যুর আগে তা শোধ করেছিলেন। হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহের আইন পাশের পরেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিদ্যাসাগরের বন্ধুরা কয়েকটি উপায় বের করেছিলেন। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি স্যার রমেশচন্দ্র মিত্রের ভাই উমেশচন্দ্র মিত্র ‘বিধবা বিবাহ’ নামে নাটক রচনা করেন। ১৮৫২ সালের শুরুতে কেশবচন্দ্র সেন মঞ্চের ব্যবস্থাপনায় ছিলেন। তাঁর কয়েকজন বন্ধু ও সহ-উপদেষ্টা, যেমন, নরেন্দ্রনাথ সেন, কৃষ্ণবিহারী সেন, প্রতাপচন্দ্র মজুমদার এবং অন্যরা বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। বিদ্যাসাগর বরাবর নাটকে অনাগ্রহী ছিলেন।
কেশবচন্দ্র সেনের জীবনীকার পি সি মজুমদার বলেন, ‘১৮৫২ সালে তরুণী হিন্দু বিধবাদের জোরপূর্বক ব্রহ্মচর্য পালনের নিষ্ঠুর প্রথার সংস্কারের উদ্দেশ্য নিয়ে লেখা বিধবা বিবাহ। ১৮৫৬ সালে কেশবচন্দ্র এর সফলতার জন্য যথাসাধ্য করেছিলেন। …গল্পে ছিল এক হিন্দু বিধবার দুঃখজনক জীবন। সে তার একান্ত নিঃসঙ্গ অবস্থায় একজন তরুণ প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িত হয়। সে তাকে পাপের পথে নিয়ে যায়। তার দুঃখভোগ, আত্মহত্যা, তার স্বীকারোক্তি সকল দেশপ্রেমী মানুষের কাছে হিন্দু বিধবাদের নিষ্ঠুর ব্রহ্মচর্যের ঘটনার আবেদন তুলে ধরে। ১৮৫৯-এ তা চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। হিন্দুসমাজের সর্বোচ্চ শ্রেণির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বিধবা বিবাহ আন্দোলনের অগ্রদূত বিদ্যাসাগর একাধিকবার এসেছিলেন এবং সজল চোখে তা দেখেছিলেন।’
হিন্দু প্যাট্রিয়ট ও অন্য কয়েকটি কাগজে নোটিশ বেরোয় বিধবা বিবাহ তহবিল গঠন করার জন্য ওই খাতে বিদ্যাসাগরের যে অনেক দেনা হয়েছিল, তা শোধ করার উদ্দেশ্যে। শুনে বিদ্যাসাগর খুব বিরক্ত হন। তিনি হিন্দু প্যাট্রিয়ট কলামে এর বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি বলেন, যদিও সেদিন পর্যন্ত ৬০ জন বিধবার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল, তবে প্রকৃতপক্ষে ৮২,০০০ টাকা খরচ হয়েছিল, তবুও তাঁর নিজের দেনা ৪৫,০০০ টাকার বেশি হবে না, আবেদনকারীরা যেমন বলেছেন।
