Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

নিজেকে সন্তুষ্ট করতে গীতাপাঠ জরুরি

Share Links:

শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

গীতা কেউ কি পড়েন আজকাল? প্রশ্নটা মনে বারবার ঘুরপাক খায়। ভারতের অগণিত সাধু-সন্ন্যাসী, পণ্ডিত, লেখক-সাহিত্যিক, সাধক, ঋষিরা অবশ্যই হিন্দু ধর্মগ্রন্থ গীতা পাঠ করেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছাড়াও অন্য বহু ধর্মের পণ্ডিত, বিদগ্ধজন গীতা পাঠ করেন। জ্ঞান অর্জনের জন্য গীতা বা শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পাঠের প্রয়োজন রয়েছে।

গীতা পাঠে মন শান্ত হয়। গীতা পাঠে মন থেকে পাপ দূর হয়। অনেকের ধারণা, উপবাসী থেকে স্নান করে ধোয়া কাপড়চোপড় পরে গীতা পাঠ করতে হয়। এ কারণে অনেকেই গীতা গ্রন্থকে ঠাকুরঘরে লাল শালুকাপড়ে মুড়ে রেখেদেন। কিন্তু ধারণাটা ভুল। গীতার প্রথম পরিচয় এটি একটি গ্রন্থ। তার পরে ধর্মগ্রন্থ। অন্যান্য গ্রন্থ পড়তে হলে যা করা হয়, গীতা পড়ার জন্যও তাই করা উচিত।

পণ্ডিতরা বলেছেন, শ্রীমদ্ভাগবদগীতা বিছানায় শুয়ে বা বসেও পড়া চলে। তবে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রীতি মেনে উপবাসে থেকে ধোয়া কাপড়চোপড় পরে গীতা পাঠ করাই উচিত। পুজোর সময় গীতা পড়তে হলে পূর্ব বা উত্তরে মুখ করে বিষ্ণুস্মরণ, স্বস্তিবচন, সংকল্প, আসনশুদ্ধি, করন্যাস করতে হয়। গীতা পুস্তকে সমস্ত নিয়মাবলি বলা থাকে। পড়ুয়ারা গীতার নাম হয়তো শুনেছে। কিন্তু গীতার ভিতরে কী রয়েছে জানে না। অনেক গুরুকুলে পড়ুয়াদের গীতাপাঠ বাধ্যতামূলক। বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সেবা প্রতিষ্ঠানে গীতার কথা খোদাই করা আছে। ভারতের আদালতগুলিতে হিন্দু বিচারাধীনদের আজও গীতা গ্রন্থ স্পর্শ করিয়ে শপথ করানো হয়।
চণ্ডীও প্রথমে গ্রন্থ, তার পরে ধর্মগ্রন্থ। চণ্ডী পড়তে হলেও যেভাবে বই পড়ে সবাই, সেভাবে পড়া উচিত। পুজোপার্বণে রীতি মেনে শুদ্ধাবস্থায় চণ্ডীপাঠ করা উচিত। গীতা পুস্তক দান করলে বহু পাপ বিনষ্ট হয়। গীতা পুস্তক বিতরণের অর্থ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অমৃতময় বাণী বিতরণ। জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী থেকে অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের পথ ছিল শ্রীমদ্ভাগবদগীতা। মহাত্মা গান্ধী লিখেছিলেন, ‘গীতা মানবের পারমার্থিক জননী। আমার গর্ভধারিণীর স্বর্গ গমনের পর গীতাই আমার হৃদয়ে তাঁর স্থান করে নিয়েছে।’

শুধু ভারতীয় মনীষীরাই গীতাকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছেন, তা নয়, বহু বিদেশিও গীতাকে তাঁদের হৃদয়ে স্থান দিয়েছেন। এক ফরাসি পণ্ডিত বলেছিলেন, ‘গীতাকে ধর্মজীবনের চিরসঙ্গী করতে পারলে অন্য কোনও ধর্মগ্রন্থ পাঠের আবশ্যকতা থাকে না।’ বর্তমানে কিছু ব্যক্তির হঠকারী হামবড়াই কথাবর্তা, সমাজের প্রতি অমর্যাদাকর আচরণ হ্রাস পেতে পারে, যদি তাঁদের সঠিক উপায়ে গীতা পাঠ করানো যায়।

বর্তমানে গীতা গ্রন্থটির বাণী ও সারকথা জনমানসে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নানা ধর্মীয় সংস্থা উদ্যোগী হয়েছে। গ্রহণে ইচ্ছুক পাঠকের ঘরে ঘরে বিনা শুল্কে গীতা বিষয়ক লক্ষ লক্ষ গ্রন্থ পাঠাচ্ছে। তাতে খুব বেশি লাভ না হলেও কিছু লাভ তো হচ্ছেই। নতুন প্রজন্ম একবারের জন্যও শ্রীমদ্ভাগবদগীতার পাতা উলটে তার জ্ঞানামৃত আস্বাদন করছে। ঘরের বইয়ের আলমারি এখন গ্রন্থ সংরক্ষক। বইকে সাজিয়ে রাখার বস্তু করছে মানুষ। অনেকেই চণ্ডী, মহাভারত, রামায়ণ, উপনিষদ, শ্রীমদ্ভাগবদগীতা, বেদের পাতা না উলটে নতুনই রেখে দিচ্ছেন বইয়ের তাকে।

শ্রীমদ্ভাগবদগীতা একটি অখণ্ড তত্ত্বগ্রন্থ। গীতা মহাভারতের অংশ। গীতাকে ‘পঞ্চম বেদ’ বলা হয়। ভক্তি সহকারে যিনি বা যাঁরা গীতাপাঠ করেন, তাঁরা বেদ, পুরাণ-সহ সমস্ত বিষয়ের সারমর্ম বুঝতে পারেন। গীতার মধ্যে রয়েছে সমস্ত শাস্ত্রকথা। তাই গীতাপাঠ করলে অন্য শাস্ত্র অধ্যয়নের প্রয়োজন হয় না। গীতার প্রশস্তিতে বলা হয়েছে, ‘গীতা সুগীতা কর্তব্যা কিমন্যৈঃ শাস্ত্রবিস্তরৈঃ। যা স্বয়ং পদ্মনাভস্য মুখপদ্মবিনিঃসৃতা।।’ যে কোনও উপন্যাস বা গল্পগ্রন্থে যেমন কাহিনি থাকে, গীতাতেও তেমনই আছে। সেই কাহিনির ছত্রে ছত্রে রয়েছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাণী। গীতা পড়তে একঘেয়ে লাগে না। আজকাল বাংলা হরফেই সংস্কৃত ভাষায় গীতা ছাপা হয়। প্রতিটি বাক্যের সারমর্ম পণ্ডিতরা করে থাকেন। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, গ-কার সংযুক্ত চারটি বস্তু যাঁরা হৃদয়ে রাখেন, তাঁদের আর পুনর্জন্ম হয় না। এই চারটি হল, গীতা, গঙ্গা, গায়ত্রী এবং গোবিন্দ।

গীতা গ্রন্থে মোট ১৮টি অধ্যায় আছে। ৭০০ শ্লোক রয়েছে। গীতা তাই সপ্তশতী। এক-একটি অধ্যায় বিভিন্ন যোগের নামকরণে লিখিত। যেমন, প্রথম অধ্যায়কে বলা হয় অর্জুন বিষাদযোগ, দ্বিতীয় অধ্যায়কে বলা হয় সাংখ্যযোগ, তৃতীয় অধ্যায় কর্মযোগ ইত্যাদি। স্বর্গ, মর্ত ও পাতাল, এই তিন লোকের হিতসাধনের জন্য ভগবান বিষ্ণুর অবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের রথের সারথি হয়ে তাঁকে যে অমৃতরূপ উপদেশ দিয়েছিলেন, তাই গীতা। যে মানুষ গীতা পড়েননি কিংবা অন্য মানুষকে গীতাপাঠ করে শোনাননি, শাস্ত্র বলেছে, সেই মানুষ বৃথা কর্মকারী। তাঁর সকল কর্মই বিফলে যায়। যে ব্যক্তি গীতা কী বা কেমন শাস্ত্র, তা জানেন না, জানার কোনও উৎসাহ দেখাননি, সেই ব্যক্তির মতো অধম মহীমণ্ডলে আর কেউ নেই। পাপ-পুণ্যের জন্য নয়, গীতা পাঠ করা প্রয়োজন। দেবকীর পুত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বেদপাঠ, যজ্ঞানুষ্ঠান, দান, তীর্থভ্রমণে সন্তোষলাভ করেন না। গীতাপাঠ হলে তিনি খুবই সন্তুষ্ট হন। ভগবানকে সন্তুষ্ট, নিজের মনকে শান্ত এবং নিজের আত্মাকে তৃপ্ত করতে হলে গীতা পাঠ জরুরি।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

জন্মজয়ন্তীতে সাগর তর্পণ

বইয়ের গন্ধ, ধুলোবালি ও বিপন্ন ভালোবাসার কথা

শিশুসাহিত্য পাঠে ছোটদের অনীহা

কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬ এবং ভারতের পিছিয়ে পড়া

প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই সুস্থ জীবন সম্ভব

মা কোথায়

শৈশবের ইঁদুরদৌড়

জো জিতা, ওহি সিকান্দার

আসলে ‘আমি’বলতে কী বোঝায়

বঙ্গাব্দের সূচনায় শশাঙ্কর অবদান