প্রফেসর (ড.) রাজকুমার মোদক
প্রফেসর, দর্শন বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

বিদ্যাসাগরের করুণাঘন চরিত্রের দিকটি স্পস্টভাবে ফুটে উঠেছে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদের (হতদরিদ্রই হোন বা কুলীন বংশীয়) সাহায্য করার মধ্য দিয়ে। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিদেশে থাকাকালীন প্রচণ্ড অর্থকষ্টের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য বিদ্যাসাগরকে চিঠি লেখার পর অকপট চিত্তে তিনি তাঁর সম্বন্ধে স্ত্রীর কাছে মন্তব্য করেছিলেন, বিদ্যাসাগর এমন একজন মানুষ ‘যার মনীষা প্রাচীন ঋষিদের মতো, কর্মদক্ষতা ইংরেজদের মতো এবং হৃদয়বত্তা বাঙালি জননীর মতো। বিদ্যাসাগর সেই চিঠি পাওয়ামাত্র নিজে ধার করে তাঁকে ৬,০০০ টাকা পাঠান। তাছাড়া দেশে ফিরলে তাঁকে ওকালতি ব্যবসায় পসার জমানোর জন্য আরও ২,০০০ টাকা ধার দেন। কিন্তু স্বল্পায়ু মাইকেল তাঁর জীবদ্দশায় টাকা শোধ দিতে না পারলেও বিদ্যাসাগর তাঁর ছাপাখানার মেশিন বিক্রি করে সুদসমেত ৮,০০০ টাকা মেটান। শম্ভুচন্দ্র তাঁর অন্যতম সহোদর এবং জীবনীকার লিখছেন, ‘পরের হিতকামনায় অগ্রজ ব্যতীত কেহ কি এরূপ ঋণ করিয়া নিজের জীবিকানির্বাহের সম্পত্তি বিক্রয় করিতে পারেন?
করুণা করার ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের কোনও বাছবিচার ছিল না। তাই তিনি যখন নিজের গ্রামে ফিরতেন, তখন তাঁর নিকটস্থ প্রতিবেশীদের সাহায্যের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে পোশাক, ওষুধ এবং টাকা নিয়ে যেতেন। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর থেকে সাহায্য নিতে কেউ যেন কোনও কুণ্ঠাবোধ না করেন, সেটা খেয়াল রেখে তিনি যিনি যেমন সম্মানের অধিকারী, সেটা মাথায় রেখে সবার অলক্ষে রাতের বেলায় সাহায্য করতেন। তিনি পরতে পরতে বিশ্বাস করতেন, জীবের মধ্যেই শিব রহিয়াছেন, জীবের সেবাই শিবের সেবা।’
মানবের প্রতি বিদ্যাসাগরের করুণার প্রকাশ শুধু তাঁর করা সাহায্যের মাধ্যমেই প্রকাশ পায়নি। তার প্রকাশ দেখা দিয়েছিল আর্তকে তাঁর নিজের জীবন বাজি রেখে সরাসরি সেবা করার মাধ্যমে। তৎকালীন সময় কলেরা ছিল এক ভয়ংকর ছোঁয়াচে রোগ। গাট্টাগোট্টা তাগড়াই চেহারার লোকও রাতে নিশ্চিন্তে শুয়ে সকালে কলেরার কবলে পড়ে মারা যেতেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর এসবের তোয়াক্কা না করেই সে সময় বউবাজারে থাকাকালীন সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক গঙ্গাধর তর্কবাগীশ, সংস্কৃত কলেজের আর এক অধ্যাপক নারায়ণ তর্ক পঞ্চাননের ভাইপো, এছাড়া তাঁরই প্রতিবেশীর এক চাকরের প্রাণ বাঁচিয়ে ছিলেন। তিনি অপরের দুঃখে কেবল সমব্যথীই ছিলেন না, কীভাবে তা নিরসন করা যায়, সে চেষ্টাও করতেন। একদিন তাঁর বাড়ি থেকে কলকাতায় ফেরার পথে যখন দেখলেন, একজন বৃদ্ধের মাথায় তাঁরই ছেলে এক বড় বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন, তিনি তৎক্ষণাৎ ওই বোঝা নিজের মাথায় নিয়ে বৃদ্ধের বাড়িতে পৌঁছে দেন। কলকাতার পথে কোনও একজন বিধবা মহিলাকে শিশুসন্তান নিয়ে কাঁদতে দেখে তাঁর দুরবস্থার কথা জেনে তিনি সাহায্য করেন এই বলে যে, ওই মহিলার স্বামী তাঁর পূর্বপরিচিত এবং তিনি তাঁর কাছে ঋণী। আর একটি ঘটনায় তিনি জানতে পারেন যে, কোনও এক মহিলা তাঁর সন্তানসন্ততি নিয়ে পথে বসবেন, যদি না কলকাতা হাইকোর্টে ২,৪০০ টাকা জমা দেওয়া হয়। তখন তিনি নিজে কলকাতা হাইকোর্টে ২,৪০০ টাকা জমা দিলেও কে টাকাটা জমা দিয়েছেন, তা মহিলার কাছে গোপনই থেকে যায়।
অন্য পোস্ট: হর দাদুর মাছ ধরা
উপরোক্ত ঘটনাগুলি বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিগত উদ্যোগে কয়েকজন ব্যক্তিকে সাহায্য করার পরিচয় দিলেও তিনি ১৮৬৬ সাল থেকে জনগণের জন্য চিন্তাভাবনা শুরু করেন, যার প্রথম প্রকাশ দেখা যায় ভয়ংকর ‘ওড়িশা দুর্ভিক্ষ’ মোকাবিলা করার মাধ্যমে। সে সময় ক্ষীরপাই, চন্দ্রকোনা, রামজীবনপুর, শ্যামবাজার, খানাকুল প্রভৃতি জায়গায় দুর্ভিক্ষের প্রকোপ অত্যন্ত বেশি ছিল (এই স্থানগুলি সে সময় জাহানাবাদ পরগনার অন্তর্গত ছিল, যা বর্তমানে আরামবাগ মহকুমার অন্তর্গত)। তিনি তাঁর সহোদর শম্ভুচন্দ্রকে বলে তৎকালীন জাহানাবাদ পরগনার ম্যাজিস্ট্রেট ঈশ্বরচন্দ্র মিশ্রর কাছ থেকে রিপোর্ট আনিয়ে, সেই রিপোর্ট গভর্নর সিসিল বিডনের গোচরে এনে বেশ কয়েকটি অন্নসত্রের ব্যবস্থা করে দেন। তিনি নিজেই তাঁর বীরসিংহ গ্রামে একটি অন্নসত্র চালাতেন। তার তদারকি করতেন তাঁর মা ভগবতী দেবী ও ভাই শম্ভুচন্দ্র। যখন বিদ্যাসাগর জানতে পারেন, অন্নসত্রে লোকসংখ্যা অগণিত, তখন তিনি তাঁর ভাইকে চিঠিতে লেখেন, ‘অভুক্ত লোক যত আসিবে, সকলকেই সমাদরপূর্বক ভোজন করাইবে। কেহ যেন অভুক্ত ফিরিয়া না যায়। ত্বরায় টাকা পাঠাইতেছি এবং আমি সত্বর বাটী যাইতেছি।’
উল্লেখ্য, যেসব ব্যক্তি ওই অন্নসত্রে আসতে দ্বিধাবোধ করতেন, বিদ্যাসাগর তাঁদের রসদ পাঠিয়ে দিতেন। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘যেসব ভদ্রলোক অন্নছত্রে ভোজন করিতে কুণ্ঠিত হইবেন, তাহারা লোকসংখ্যা হিসাবে সিদা পাইবেন। শুধু তাই নয়, ওই অন্নসত্র থেকেই মাখার তেল এবং ঔষধপথ্যাদিও বিলি করা হইত। ওড়িশা দুর্ভিক্ষ এতটাই মারাত্মক আকার ধারণ করে যে, মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র, এই তিন মাস অনেকেই ঘটিবাটি, অলঙ্কার বিক্রয় করিয়া কথঞ্চিৎ প্রাণধারণ করিয়া পরে চাউল ক্রয়ে অপারগ হইয়া কেহ কেহ বুনো ওল ও কচু খাইয়া দিনপাত করিয়া এবং নানারকম কষ্টভোগ করিয়া অনাহারে অকালে কালগ্রাসে নিপতিত হয়।’
এর ফলে অন্নসত্র চালাতে একটি রেকারিং খরচের প্রয়োজন হয়। সে টাকার জোগানের জন্য বিদ্যাসাগর তাঁর পারিবারিক জগদ্ধাত্রী পুজো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর সে সিদ্ধান্ত সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সহোদর ও মায়ের দ্বারা অনুমোদিত হয়। তাঁর মা বলেন, ‘গ্রামের দরিদ্র নিরুপায় লোক প্রত্যহ খাইতে পাইলে পূজা করিবার আবশ্যক নাই।’ এ কথা জেনে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিস্মিত হয়ে মন্তব্য করেন, ‘এই কথাটি সহজ কথা নহে। তাঁহার নির্মলবুদ্ধি এবং উজ্জ্বল দয়া প্রাচীন সংস্কারের মোহাবরণ যে এমন অনায়াসে বর্জন করিতে পারে, ইহা আমার নিকট বড় বিস্ময়কর বোধ হয়।’
