শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়
মাছ শিকারে ভীষণ নেশা হর দাদুর। বয়স ৬০ বছর পেরিয়ে গেলেও তোয়াক্কা নেই কোনও কিছুর। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর মাছ শিকারের নেশাটা আরও বেড়ে গিয়েছে। হর দাদুর গৃহিণী, মানে ঠাকুমার সঙ্গে এ নিয়ে দিনরাত খিটিরমিটির লেগেই আছে। ঠাকুমা প্রায়ই চেঁচিয়ে বলেন, ‘যত বুড়ো হচ্ছে, তত ভীমরতি ধরছে। সারাদিন এখানে ওখানে পুকুর-নদীর পাড়ে বসে ছিপ ফেলে মাছ ধরার কু-অভ্যাসটা আর গেল না। সর্দি ধরলে দেখাব মজাটা।’
হর দাদু ঠাকুমার এসব হুমকিকে আমল দেন না। ঠাকুমা বাইরে কথাগুলি বললেও হর দাদু যখন মাছ ধরতে গিয়ে বড় মাছ ধরে নিয়ে আসেন, তখন ঠাকুমা মনে মনে বেশ খুশিই হন। রাতে মাছ কাটা, মাছ ভাজার বড় কাজ পড়ে। পরিবারে মাছটাও বেশ ভালো খাওয়া হয়ে যায়। ঠাকুমাও পানের কৌটোটা যত্ন করে হর দাদুর পকেটে ভরে দেন।
হর দাদু শৌখিন মাছ শিকারি। লম্বা চেহারা। মাথায় টাক পড়েছে যৌবন পেরোতেই। বন বিভাগে চাকরি করতেন। মাছ ধরার তোড়জোড় করতে গিয়ে বহু নগদ টাকা ট্যাঁক থেকে খসে। টাকার লাভ-লোকসান দেখলে মাছ শিকারি হওয়া যায় না। হর দাদুর ঘরের টিনের তলায় রয়েছে দশখানার বেশি ছিপ। তাতে নানা প্রকারের ডোর এবং বড়শি। ছিপগুলির বেশ কয়েকটিতে হুইল লাগানো রয়েছে। টিনের ঘরের দেওয়ালে রয়েছে বাঁশের তৈরি তিন-চারটে খালুই। পুকুর থেকে মাছ ডাঙায় তুলে ওই খালুইয়ে মাছগুলি রাখেন। মাছ ধরার আগের দিন থেকেই হর দাদুর মস্ত ব্যস্ততা বাড়ে। বাজার থেকে খোল, একাঙ্গী, কস্তুরী, মেওতা, পাউরুটি, ময়দা এনে চার ও টোপ তৈরি করেন। উই ঢিপি থেকে সাদা উইপোকা নিয়ে এসে চারে মিশিয়ে মাছ ধরার ঘাটটি চারিয়ে নেন। চারে মাছ এলে বুঝতে পারেন হর দাদু। চারে বুদবুদ ওঠে। মাছ টোপ গিললেই ফাতনা জলে ডুবে যায়। ঝাঁকিয়ে ছিপের বড়শিতে টান দিলেই মাছ উঠে আসে। হর দাদুর খুব আনন্দ হয়।
শখের মাছ শিকারি হর দাদু মাছ ধরতে গিয়ে বহুবার মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে এসেছেন। ঠাকুমা বা ঘরের কাউকে সে কথা তিনি কোনওদিন বলেননি। বাড়ির বেশকিছুটা দূরে দ্বারকেশ্বর নদ বয়ে চলছে। প্রতিবছর বর্ষায় ভয়ংকর বান এসে সূর্পানগর রেলব্রিজের নীচে গভীর খাদ করে দিয়ে চলে যায়। স্থানীয়রা এই গভীর খাদকে দ বলেন। প্রচুর মাছ এসে এই দয়ে থেকে যায়। এলাকাটা নির্জন। নদীর পশ্চিম পাড়ে রেলের সংরক্ষিত ভূমিতে ঘন জঙ্গল। তাকিয়ে দেখলে উত্তরবঙ্গের লাটাগুড়ি রেঞ্জের কোনও জঙ্গল বলে ভ্রম হতে পারে।
অন্য পোস্ট: প্রেমিক বিভুতিভূষণ তাঁর প্রকৃতিপ্রেমের মতোই আন্তরিক
স্থানীয়রা জানেন, এই জঙ্গলে প্রচুর বন্যপ্রাণী আছে। একবার সূর্পানগর রেলব্রিজের তলার দয়ে হর দাদু ছিপ আর খালুই নিয়ে মাছ ধরতে বসে গিয়েছিলেন। ঘাটে চার ফেলতেই মাছের কালো পিঠগুলি নীল জলে ভেসে উঠছিল। ফাতনা জলে ডুবতেই হ্যাঁচকা টানে বেশ কয়েকটি বড় মাছ ডাঙায় তুলে খালুইয়ে রেখেছিলেন হর দাদু। ফের ফাতনা জলে ডুবতেই হর দাদু ছিপের বড়শিকে ঝাঁকাতে যাবেন, অমনি পিছনে মস্ত হুসহাস ও হড়হড় শব্দের দিকে তাকিয়ে হাড় হিম হয়ে গিয়েছিল হর দাদুর। কোথায় ছিল, কে জানে! একটি বিরাট নেকড়ে বাঘ হর দাদুর মাছের খালুইয়ের মাছগুলি খাচ্ছে। সেই ভয়ংকর দৃশ্য দেখে মুহূর্তে ছিপ ফেলে দৌড় মেরেছিলেন হর দাদু। সেবার খালি হাতেই ঘর ফিরতে হয়েছিল।
আর একবার ইন্দাসের এক চাল মিলের ভিতরে মালিকের আমন্ত্রণে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রাঘাতে মারা যাচ্ছিলেন হর দাদু। চারদিকে ঘন কালো মেঘ। উত্তুরে কালো মেঘটা সাদা হয়ে মাটিতে নামছিল। হঠাৎ তীব্র আলোর ঝলকানি। তেমন ভয়ংকর শব্দ। মাত্র ১০ ফুট দূরে একটি নারকেল গাছে বাজটি পড়ে যায়। দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে নারকেল গাছের মাথায়। ভাগ্যিস নারকেল গাছটি বজ্রটি টেনে নিয়েছিল, তাই সে যাত্রায় হর দাদু বেঁচে যান। তবে হর দাদু সেবার কেজি সাতেক মাছ ধরেছিলেন।
হর দাদুর নাতি কেলো একদিন তাঁকে বলেছিল, ‘আচ্ছা দাদু, তুমি তো রিটায়ার করেছ। এখন তো অল্পস্বল্প বিশ্রাম নিতে পারো? কী দরকার মাছের নেশায় এ পুকুর ও পুকুরে ছিপ নিয়ে বসে থাকার?’ হর দাদু এক ধমক দিয়েছিলেন কেলোকে। ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘ঠাকুমার শেখানো কথায় জ্ঞান দিতে আসছিস? আমি মাছ ধরে আনলে মুখে দিস কেন? আমার ক্ষমতা যতদিন আছে, আমি মাছ ধরব। যত্ত সব!’
ভাদ্র মাসের এক সকালে হর দাদু সাইকেলে গোটা ছয়েক ছিপ বেঁধে থলেতে মাছের চার, ক্যারিয়ারে মাছ রাখার খালুই নিয়ে রওনা দিলেন মাছ ধরতে। বাঁশিগ্রামের বাগদিপাড়ার এক মস্ত পুকুরে। ১০০ টাকা দিয়ে ঘাট বুকিং করেছিলেন। পুকুরের পাড়েই একটু উঁচু দেখে বেশ বাগিয়ে বসলেন। পুকুরে গভীর জল। বড় বড় মাছও আছে। বড়শিতে টোপ লাগিয়ে জলে ফেলেই নজর দিলেন ফাতনার দিকে। পুকুরের চারপাশে আরও বহু মাছ শিকারি মাছ ধরতে বসেছিলেন। সবাই চুপচাপ। এমন নীরবতা বোধ হয় শ্মশানেও থাকে না।
ফাতনার দিকে নজর দিতে দিতেই পকেটে রাখা ঠাকুমার দেওয়া পানের কৌটো থেকে একটি পান মুখে ভরলেন হর দাদু। নইলে মেজাজ ঠিক আসে না। পান চিবোতে চিবোতে দু’-একটি মাছও ঘাঁই মেরে খালুইয়ে ভরে দিলেন মাছ শিকারি হর দাদু। হর দাদু বিলক্ষণ বুঝলেন, আজ দিন ভালোই যাবে। বাগদিপুকুরটায় মাছ আছে। এমন সময় হঠাৎ হর দাদুর খালুইয়ের দিক থেকে খসখস শব্দ উঠল। হর দাদু অতটা ভ্রূক্ষেপ করলেন না। চোখ ফাতনার দিকে সেঁটে রাখলেন। ফাতনায় টান পড়লেই ঝাঁকুনি দেবেন। আবার সেই খসখস শব্দ। হর দাদু ভাবলেন, নাতি কেলোটা এসে হয়তো মজা করছে। কেলো মাঝেমধ্যেই এমন করে। কিন্তু এবার শুধু খসখস নয়, ফোঁস ফোঁস শব্দও। হর দাদু খালুইয়ের দিকে তাকাতেই তাঁর বুকটা ধড়াস করে উঠল। ভয়ে কাঁপতে শুরু করলেন। ফোঁস ফোঁস গর্জন করতে করতে খালুইয়ে ঢুকছে এক মস্ত বড় পুরোনো কেউটে সাপ। কাছাকাছি কোথাও বিষধরটার থাকা হয় হয়তো। পিছনে জঙ্গল, পালানোর পথ নেই। মুহূর্তমাত্র না ভেবে ‘কেউটে সাপ, কেউটে সাপ’ বলে চিৎকার করতে করতে হর দাদু নিজের প্রাণ বাঁচাতে সামনের জলে ঝাঁপ দিলেন। যাঁরা আশপাশে ছিলেন, সাপ সাপ চিৎকার শুনে দুদ্দাড় করে দৌড়ে এলেন। বাগদিপাড়ার ছোকরারাও কিছু বিপত্তি হয়েছে ভেবে ছুটে এলেন। সবাই এসে দেখলেন, হর দাদু বাগদিপুকুরের জলে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছেন। আর একটা মস্ত বড় কালো কেউটে সাপ তাঁর খালুইয়ে ঢুকে মাছগুলি ধরে হিসহিস শব্দ করছে। বাগদিপাড়ার ছোকরারা হর দাদুকে জল থেকে তুলে ঘরে পৌঁছে দিয়ে এলেন। ছিপগুলি পড়ে রইল বাগদিপুকুরেই। ঘরে পৌঁছেই হর দাদু নাতি কেলোর দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন।


অসাধারন হয়েছে