প্রফেসর (ড.) রাজকুমার মোদক
প্রফেসর, দর্শন বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

যে কয়েকজন ব্যক্তি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠানস্বরূপ হয়ে নারী স্বাধীনতা, সুরক্ষা, বিকাশ ইত্যাদি কল্পে প্রাণপাত পরিশ্রম করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অবিস্মরণীয়। শুধু অগাধ মেধা, অক্লান্ত পরিশ্রম, স্থির লক্ষ্য, অকপট সরলতা, অপরিসীম সাহস, কোমল হৃদয় ও দূরদর্শিতার ওপর ভর করে রাজা রামমোহন রায়ের মতোই সতীদাহ নিবারণের পরে যে কাজটি তিনি করেছিলেন, সেটি হল, ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহকে আইনসম্মত করার পাশাপাশি সমাজম্মত করা। মহাত্মা গান্ধী তাই বলেছিলেন, ‘The main reason for the special distinction that we find in the Bengal is that many great men were born there during the last century. Beginning with Rammohan Roy one heroic figure after another has raised Bengal to a position higher than that of the other provinces. It can be said that Ishwarchandra Vidyasagar was the greatest among them.’ অগাধ মেধার অধিকারী হয়েও একদিক থেকে তিনি যেমন ছিলেন করুণার সাগর, অন্যদিক থেকে তিনি ছিলেন কঠোর।
বিদ্যাসাগর যে করুণার সাগর, তার পরিচয় আমরা পাই তিনি যখন কেবল গরুর বাছুরের দুধের অধিকার থেকে বঞ্চনার কষ্ট অনুভব করে সুদীর্ঘকাল ধরে নিজেকে গরুর দুধ খাওয়া থেকে বিরত রাখেন। আসলে দরিদ্রের প্রতি দয়া করাটা বিদ্যাসাগর শিখেছিলেন তাঁর নিজের জীবন দিয়ে। তিনি কলকাতায় যখন জগৎদুর্লভ সিংহের ঘরে আশ্রিত ছিলেন, তখন তাঁর কনিষ্ঠ ভগিনী রাইমণির কাছ থেকে পেয়েছিলেন অপার স্নেহ। তিনি নিজেই বিদ্যাসাগর চরিত–এ এই ঘটনার কথা লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘তাঁহার একমাত্র পুত্র গোপালচন্দ্র ঘোষ আমার প্রায় সমবয়স্ক ছিলেন। পুত্রের উপর জননীর যেরূপ স্নেহ ও যত্ন থাকা উচিত ও আবশ্যক, গোপালচন্দ্রের উপর রাইমণির স্নেহ ও যত্ন তদপেক্ষা অধিক ছিল, তাহাতে সংশয় নাই। কিন্তু আমার আন্তরিক দৃঢ় বিশ্বাস, এই স্নেহ ও যত্ন বিষয়ে রাইমণির অণুমাত্র বিচ্ছিন্ন ভাব ছিল না। …প্রসঙ্গক্রমে তাহার কথা উত্থাপিত হইলে, তদীয় অপ্রতিমগুণের কীর্তন করিতে করিতে, অশ্রুপাত না করিয়া থাকিতে পারি না।’
অন্য পোস্ট: স্টিফেন হকিং-এর আবিষ্কার
আবার ঈশ্বরচন্দ্রের কঠোর মনোভাবের দিকটি পাওয়া যায় তাঁর বিভিন্ন কাজকর্মের মাধ্যমে। স্কুল ইন্সপেক্টর থাকাকালীন তাঁর হাত দিয়ে ৩৫টি মহিলা বিদ্যালয় এবং ২০টি মডেল স্কুল অনুমোদিত হয়, একথা আমাদের সকলেরই জানা। ইউরোপীয় নবজাগরণের আলোকে বিদ্যাসাগর যে কিছুটা প্রভাবিত হননি, তা নয়। তবে তিনি দেশীয় ধ্রুপদী সংস্কৃতনির্ভর শিক্ষাকে একদিক থেকে যেমন বাদ দিতে চাননি, তেমনই বিজ্ঞাননির্ভর পাশ্চাত্য শিক্ষাকেও প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তবে এই দু’টি বিষয়েই তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। তিনি সংস্কৃত ভাষা শেখার জন্য এমনভাবে সংস্কৃত ব্যাকরণ বই লেখেন, যেন সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার জন্য টোল নির্ভরতা অনেকটাই কমে। অন্যদিকে তিনি চেয়েছিলেন শুধু ইংরেজ শিক্ষকরা পাশ্চাত্য বিষয়ে শিক্ষা না দিয়ে ভারতীয় শিক্ষকরাও পাশ্চাত্য বিষয়ে শিক্ষা দেন। আর এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাধলে তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ ছেড়ে দিয়ে মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন গড়ে সেখান থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এফএ পড়ার জন্য কয়েকজন ছাত্রকে দেশীয় শিক্ষকের সাহায্য নিয়ে প্রস্তুত করেন।
দেখা যায়, প্রবেশিকা পরীক্ষায় ১০০ শতাংশ পড়ুয়া পাশ তো করেছেনই, ৫০ শতাংশ পেয়েছেন ফেলোশিপ আর যোগীন্দ্রচন্দ্র বসু অধিকার করেছেন দ্বিতীয় স্থান। ইংরেজ আমল, ইংরেজ পরীক্ষক, তার পরেও এই ফলাফলে অত্যাশ্চর্য হয়ে তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধক ও প্রেসিডেন্সির অধ্যাপক জে সাটক্লিফ মন্তব্য করেন, ‘The pundit has done wonders.’ তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ বিষয়টিকে দু’ভাবে দেখেছেন একদিক থেকে তিনি তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘বিদ্যাসাগর স্বভাবতই সম্পূর্ণ স্বাধীন তন্ত্রের লোক ছিলেন। অব্যাহতভাবে আপন ইচ্ছা চালনা করিতে পাইলে তবে তিনি কাজ করিতে পারিতেন। উপরিতন কর্তৃপক্ষের মতের দ্বারা কোনোরূপ প্রতিঘাত প্রাপ্ত হইলে তদনুসারে আপন সংকল্পের প্রবাহ তিলমাত্র পরিবর্তন করিতে পারিতেন না।’ আর অন্যদিকে তিনি তাঁর স্বদেশপ্রেমের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘সংস্কৃত কলেজের কর্ম ছাড়িয়া দিবার পর বিদ্যাসাগরের প্রধান কীর্তি মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন। বাঙালির নিজের চেষ্টায় এবং নিজের অধীনে উচ্চতর শিক্ষার কলেজ স্থাপন এই প্রথম। আমাদের দেশে ইংরাজি শিক্ষাকে স্বাধীনভাবে স্থায়ী করিবার এই প্রথম ভিত্তি বিদ্যাসাগর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হইল। যিনি দরিদ্র ছিলেন, তিনি দেশের প্রধান দাতা হইলেন; যিনি লোকাচার রক্ষক ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তিনি লোকাচারের একটি সুদৃঢ় বন্ধন হইতে সমাজকে মুক্ত করিবার জন্য সুকঠোর সংগ্রাম করিলেন এবং সংস্কৃত বিদ্যায় যাঁহার অধিকারের ইয়ত্তা ছিল না, তিনিই ইংরাজিবিদ্যাকে প্রকৃত প্রস্তাবে স্বদেশের ক্ষেত্রে বদ্ধমূল করিয়া রোপণ করিয়া গেলেন।
