সুদীপনারায়ণ ঘোষ

প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ কর্মজীবনে স্টিফেন উইলিয়াম হকিং মহাজাগতিক সৃষ্টিতত্ত্ব ও জ্যোতির্পদার্থবিদ্যায় বিপুল অবদান রেখে গিয়েছেন। কিন্তু যে কাজগুলির জন্য তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়, সেগুলি হল, একত্ব তত্ত্ব (সিঙ্গুলারিটি থিওরি), ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরের কোয়ান্টাম বিকিরণ এবং তথাকথিত নো বাউন্ডারি প্রস্তাব।
একত্ব তত্ত্ব (সিঙ্গুলারিটি থিওরি)
সৃষ্টিতত্ত্বের মূল গাণিতিক সূত্র হল আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ। এই তত্ত্ব অনুসারে মাধ্যাকর্ষণ হচ্ছে চার মাত্রাবিশিষ্ট স্পেস-টাইম (স্থান-কাল) বক্রতা থেকে উদ্ভূত একটি বিষয়। স্পেস-টাইম: স্থানের তিনদিক (যা স্থান নির্দেশ করে) এবং সময় বা কালের সমন্বয়ে গঠিত চার মাত্রা। স্পেসকে যা মনে হয়, তা নয়। সেটি কুঞ্চিত বা বক্র বা বলা যায় যে, তা বক্রের মতো আচরণ করে। এর মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় বস্তু বাধাপ্রাপ্ত হয়, দুমড়ে যায়। তখন সে চেষ্টা করে সবচেয়ে কম বাধার পথ অনুসরণ করতে, যেমন গ্রহদের অনুসৃত উপবৃত্তীয় পথ।
হকিং-এর সময় একথা বোঝা গিয়েছিল যে, এই মুচড়ে যাওয়া সংক্রান্ত সমীকরণগুলির কিছু নির্দিষ্ট আপাত নির্বোধ সমাধান আছে, যার দ্বারা স্পেস-টাইম অসীমভাবে বেঁকে (অসীম বক্রতা) একটি বিন্দুতে এসে থামে। সিঙ্গুলারিটি: এগুলিকে কেবল গাণিতিক কৌতূহল বলে বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু রজার পেনরোজের সহযোগিতায় ১৯৬৬ সালে হকিং তাঁর পিএইচডি গবেষণাপত্রে, যা তিনি নিজেই উদ্ভাবন করেছিলেন, দেখালেন যে, যদি সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সমীকরণগুলিকে সামগ্রিকভাবে আমাদের ব্রহ্মাণ্ডের জন্য প্রয়োগ করা যায়, তাহলে তার ইতিবৃত্তকে পিছন দিকে টেনে নিয়ে গেলে এমন একটি অসীম বক্রতার অবস্থায় পৌঁছনো যায় যে, সেটাই সিঙ্গুলারিটি, যা থেকে বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ হয়েছিল, সব ভর একবিন্দুতে এসে জমেছিল এবং অভ্যন্তরীণ চাপে বিপুল বেগে স্পেসে ছড়িয়ে পড়েছিল। উপরন্তু পেনরোজ এবং হকিং এও দেখালেন যে, উলটোদিক থেকে একই কৌশল প্রয়োগ করা যায় এবং প্রমাণ করলেন যে, কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্তে একটি ভেঙে পড়া তারাও এক একত্বে বা সিঙ্গুলারিটিতে পৌঁছবে, যা থেকে জন্ম নেয় ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর। এত বিপুল ভর যে, আলো বিকিরণও হতে পারে না। কারণ আলো একটি শক্তি এবং শক্তিরও ভর আছে। ভরের যেহেতু শক্তি আছে বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুসারে, সুতরাং বিপুল ভরসম্পন্ন ব্ল্যাক হোল আলোকেও তার মাধ্যাকর্ষণ বলে ধরে রাখে।
ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরের কোয়ান্টাম বিকিরণ
এর পর হকিং তাঁর নজর ফেরালেন ব্ল্যাক হোলের দিকে। তিনি বিশেষ করে অনুসন্ধান করলেন, কীভাবে ব্ল্যাক হোলগুলি পরস্পরের সঙ্গে আচরণ করে এবং বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করলেন যে, ব্ল্যাক হোল ও উষ্ণ বস্তুর মতো আচরণ করে। জ্যাকব বার্কেনস্টাইন নামে এক তরুণ স্নাতক ছাত্র আরও একটি আমূল নতুন প্রস্তাব দিলেন যে, এটা শুধু একটি সাদৃশ্য নয়, বরং ব্ল্যাক হোলকে উষ্ণ বস্তু হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। হকিং প্রথমে অসম্মত হলেন, কারণ উষ্ণ বস্তু তাপ বিকিরণ করে এবং ব্ল্যাক হোলের কোনও কিছুই বিকিরণ করার কথা নয়। কিন্তু তারপর ১৯৭৩ সালে তিনি উপলব্ধি করলেন যে, আমরা যদি কোয়ান্টাম এফেক্টগুলি হিসাবে ধরি, তাহলে ব্ল্যাক হোলও বিকিরণ করে এবং এবং ক্রমশ উবে যাবে, ধ্বংস হবে। কারণ কোয়ান্টাম তত্ত্বানুসারে, স্পেস সর্বদা কতকগুলি কণার ভর দ্বারা ফুটছে। এই কণাগুলি একবার সৃষ্টি হচ্ছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।
হকিং এবং বার্কেনস্টাইন আরও লক্ষ করেন যে, ব্ল্যাক হোল খুব দক্ষ হার্ড ড্রাইভের মতো তথ্য ধরে রাখতে পারে, কিন্তু সেটা করে তার উপরিতলে। কীভাবে তা করে, সেটা স্ট্রিং তত্ত্বের একটি বড় প্রশ্ন।
অন্য পোস্ট: রবীন্দ্রনাথও বিদ্যাসাগরকে চেনাতে পারেননি
তথাকথিত নো বাউন্ডারি প্রস্তাব
এটি উন্মোচনের পরে হকিং ব্রহ্মাণ্ড কীভাবে সৃষ্টি হল, তা নিয়ে মাথা ঘামাতে লাগলেন। ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হল কী কারণে? ১৯৮৩ সালে জেমস হার্টলের সঙ্গে “নো বাউন্ডারি প্রস্তাব” দেন। সেই অনুসারে ব্রহ্মাণ্ডের আরম্ভ কোনও বিশেষ ঘটনা নয়, ব্রহ্মাণ্ডের অন্য কোনও বিন্দু থেকে তা আলাদা কিছু নয়। দক্ষিণ মেরু পৃথিবীর অন্য কোনও বিন্দু থেকে আলাদা কিছু নয়। ঠিক যেমন একথা জিজ্ঞাসা করার কোনও মানে হয় না যে, দক্ষিণ মেরুর দক্ষিণে কী আছে, তেমন এটা জিজ্ঞাসা করারও কোনও মানে হয় না যে, বিগ ব্যাং-এর আগে কী ছিল। তবে এটার দার্শনিক মূল্য যাই হোক, তা সর্বত্র সমাদৃত হয়নি, কারণ আদি ব্রহ্মাণ্ডের কিছু তথ্যের সঙ্গে তা খাপ খায় না।
হকিং ৬৫তম জন্মদিনের অল্প পরে ২০০৭ সালের এপ্রিল মাসে একটি বিশেষভাবে সজ্জিত বোয়িং ৭২৭ বিমানে শূন্য মাধ্যাকর্ষণ শক্তি উড়ানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। একটি প্যাড দিয়ে মোড়া বিমানপোত খুব বেশি বাঁকসম্পন্ন পথে দ্রুত চালিয়ে একটি স্বল্প সময়ের ওজনহীনতা বা প্রায় শূন্য মাধ্যাকর্ষণ বলের দশা সৃষ্টি হয়। যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, কেন তিনি এমন ঝুঁকি নিলেন, তখন হকিং বলেছিলেন, ‘আমি দেখাতে চাই যে, মানুষ যতক্ষণ না তাদের উদ্যম হারিয়ে ফেলে, ততক্ষণ তারা যেন শারীরিক অক্ষমতার জন্য থেমে না থাকে।’
হকিং জীবনে অনেক পুরস্কার পেয়েছিলেন নোবেল ছাড়া। তবে নোবেল পেতে গেলে গবেষণাগারে বা অন্য কোনওভাবে তাঁর তত্ত্বকে প্রমাণিত করতে হয়। হকিং এমন একটি তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন, যা প্রমাণ করা দুঃসাধ্য, কারণ একের পর ৬৭টি শূন্য বসালে যত বছর সময় লাগে, একটি ব্ল্যাক হোল ধ্বংস হতে তত সময় লাগে। একটি অস্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এতে তাঁর সম্মানহানি হয়নি, বরং নোবেলের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। আমার বন্ধু, সহপাঠী এবং বিখ্যাত পদার্থবিদ অশোক সেন বলেছে, ‘বিগত ৫০ বছরে হকিং ছিলেন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। ব্ল্যাক হোল কিছু অল্প পরিমাণে বিকিরণ করে, তাঁর এই আবিষ্কার আমার এবং অন্যদের অধিকাংশ কাজকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে।’
