
দেবর্ষি রায়চৌধুরী
সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার জায়গিরদারি পেয়েছিল মোগল সম্রাট জাহাঙ্গিরের কাছ থেকে। প্রায় ১৫০ বছর (১৬০৮ থেকে ১৭৫৭ সাল) কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল— উত্তরে হালিশহর থেকে দক্ষিণে ডায়মন্ড হারবার পর্যন্ত তাদের জায়গিরের বিস্তার ছিল। ইতিহাস থেকে সাধারণ মানুষ এটুকু জানে যে, এই পরিবার সেই জায়গিরকে ধীরে ধীরে একটি শহরকেন্দ্রিক রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে আরও গভীরে অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার এমন এক ঐতিহ্যের ধারক, যার বহুমুখী কর্মকাণ্ড বাঙালি তথা ভারতীয় সমাজকে নানা দিক থেকে সমৃদ্ধ করেছে। আধ্যাত্মিকতা, রাজনীতি, সংস্কৃতি, সংগীত, সমাজ-সংস্কার, শিক্ষাবিস্তার, মন্দির নির্মাণ থেকে শুরু করে খেলাধুলা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। অনেক কিছু আমরা জানি, আবার অনেক অবদান এখনও অজ্ঞাত রয়ে গিয়েছে।
এখানে আমি শিক্ষািবস্তাের সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবােরর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করব। সাধারণভাবে জমিদার বা জায়গিরদার পরিবারগুলি অনেক সময়ই রক্ষণশীল হয়ে থাকে। কিন্তু আমােদর সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার এ ধারণার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এই পরিবারের জমিদার ও গৃহকর্ত্রীরা অর্থাৎ পরিবারের প্রবীণ নারীরাও ছিলেন অত্যন্ত প্রগতিশীল মনোভাবাপন্ন। তাঁরা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক চিন্তাধারাকে গ্রহণ করেছেন এবং তা নিজেদের জীবনযাত্রা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত করেছেন।
শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রে এই পরিবারের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আজকের সুপরিচিত বড়িশা হাই স্কুলের সূচনা হয়েছিল ১৮৩০ সাল নাগাদ। তখন এর পাঠদান চলত সাবর্ণ পরিবারের নিজস্ব বাড়িতেই— কখনও বড়বাড়ি, কখনও আটচালা, কখনও বেনাকি বাড়ি, কখনও কালীকিঙ্কর বাড়িতে। পরবর্তীকালে সূর্যকুমার রায়চৌধুরী বেহালা চৌরাস্তায় বিদ্যালয়ের জন্য বিশাল জমি দান করেন। ১৮৫৬ সালে (যে বছর বিধবাবিবাহ আইন পাস হয়) বর্তমান বড়িশা হাইস্কুলের স্থায়ী ভবন নির্মিত হয়। এই বিদ্যালয়ের উদ্বোধন করেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু তথা সমাজ সংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
এ থেকে স্পষ্ট যে, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিক থেকেই সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার সমাজে শিক্ষাবিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। এই প্রবণতার পিছনে রয়েছে তাদের বিদ্যাচর্চার ঐতিহ্য বেদগর্ভ উপাধ্যায়, কবীন্দ্র পরমেশ্বর বা কামদেব ব্রহ্মচারীর মতো পণ্ডিত ব্যক্তিদের উত্তরাধিকার। সে ধারাই পরবর্তী প্রজন্মের রক্তে মিশে যায় এবং সমাজের তৃণমূল স্তরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়।
শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই নয়, স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেও এই পরিবারের শিক্ষাবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাতীয়তাবাদের উত্থানের সময় তারা উপলব্ধি করেছিল, শিক্ষিত না হলে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এ চিন্তা থেকেই ১৯০৪ সালে মাত্র ৫৬টি বই নিয়ে বড়িশার বেনাকি বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয় বড়িশা স্টার লাইব্রেরি। পরবর্তীকালে এই গ্রন্থাগারই বড়িশা টাউন লাইব্রেরিতে পরিণত হয়, যা আজও এলাকা তথা কলকাতার গর্ব।
নারীশিক্ষার ক্ষেত্রেও সাবর্ণ পরিবারের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯১৭ সালে বড়িশায় মেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা আজকের বড়িশা গার্লস হাইস্কুল। সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার ও এলাকার বিশিষ্ট মানুষজন এই স্কুল গড়ে তোলেন। এছাড়াও বড়িশা চৌরাস্তায় অবস্থিত বিবেকানন্দ মহিলা কলেজের জন্য জমি দান করেছে আমােদর পরিবার। শুধু বড়িশা নয়, হালিশহর, উত্তরপাড়া, বিরাটি-সহ বিভিন্ন অঞ্চলেও শিক্ষাকেন্দ্রিক নানা উদ্যোগে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্ম সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই পরিবার কেবল ইতিহাসের অংশ নয়, শিক্ষা ও সমাজ গঠনে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

