সুদীপ ঘোষাল

১৯৫১ সালের অক্টোবরে অনেক চিন্তন ও মন্থন শেষে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দ্বিতীয় সরসংঘচালক গুরুজি গোলওয়ালকরের সঙ্গে পরামর্শক্রমে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভারতীয় জনসংঘ নামে নতুন রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর ১৯৫২ সালের মে মাসে শ্যামাপ্রসাদ দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হন। ভারতীয় জনসংঘ প্রথম সাধারণ নির্বাচনে তিনটি আসন লাভ করে। ড. মুখোপাধ্যায় লোকসভায় ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি নামে বিরোধীদলের প্রতিষ্ঠা ও নেতৃত্বদান করেন। লোকসভায় বিরোধীদলের নেতা হয়ে তিনি নিজেকে উদাহরণ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
জনসংঘ ওই সময় বিধানসভা ভোটে বাংলা প্রদেশে ৮টি ও রাজস্থানে ৮টি আসন লাভ করে। রাজস্থানে জমিদারি প্রথা বিলোপ আইনের প্রশ্নে বিধায়করা দ্বিধাবিভক্ত ছিলেন। ড. মুখোপাধ্যায় রাজস্থান পরিষদীয় দলের জরুরি বৈঠক ডেকে নির্বাচনী ইস্তেহারের প্রতিশ্রুতি পালনের দায়বদ্ধতার কথা বলেন। ওই সভায় আটজন বিধায়কের মধ্যে মাত্র দু’জন, ভৈরো সিং শেখাওয়াত ও জগৎ সিং জালান উপস্থিত ছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ তৎক্ষণাৎ বাকি ছ’জন বিধায়ককে বহিষ্কার করেন। রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার স্বীকার করে তিনি নিজের দলকে মাত্র ২ সদস্যের দলে পরিণত করেন। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা চালু রাখলে অদূর ভবিষ্যতে সমস্যা বাড়তে পারে, তা তিনি বারবার লোকসভার ভিতরে ও বাইরে বলেছিলেন।
সংবিধানের ৩৭০ ধারায় লেখা হয়, ‘Temporary, Transitional and Special Provision of Article 370’. সংবিধান প্রণেতাদের সাময়িক, পরিবর্তনমুখী ও বিশেষ শব্দের মধ্য দিয়ে দূরদৃষ্টি প্রতিভাত হয়। ভারতের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে সংবিধানের বিশেষ ৩৭০ নং ধারা বিলোপ ও পারমিটরাজ বাতিলের দাবিতে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কাশ্মীর অভিযান করেন। ১৯৫৩ সালের ১১ মে পঞ্জাবের উধমপুরে শেষ সভা করে কাশ্মীরে প্রবেশের পথে তিনি গ্রেফতার হন।
এবার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের সালতামামি একটু দেখে নেওয়া যাক। রাজনীতিতে আশুতোষ-পুত্রের হাতেখড়ি কংগ্রেসের কর্মী হিসাবেই। ১৯২০ সালের কিছু আগে-পরে মহাত্মা গান্ধীর বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আকৃষ্ট হয়ে কংগ্রেসে যোগ দেন। প্রথম দশ বছর গান্ধীঅন্তপ্রাণ শ্যামাপ্রসাদ হোঁচট খেলেন ১৯৩০ সালে মোহনদাসের আইনসভা বয়কটের সিদ্ধান্তে। আসলে রাজনীতি করতে করতে ততদিনে শ্যামাপ্রসাদ এটা বুঝে গিয়েছিলেন যে, ক্ষমতার মধুভাণ্ডটি প্রকৃতপক্ষে সংসদীয় রাজনীতিতেই রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সুভাষচন্দ্র বসু যখন সশস্ত্র বিপ্লবের পথে ‘কদম কদম বাড়ায়ে যা’-র ডাক দিয়েছেন এবং ব্রিটিশ বাহিনীর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছেন, তখনও ওসব কঠিন কৃচ্ছ্রসাধনের পথ থেকে শ্যামাপ্রসাদের অবস্থান বহু দূরে। জম্মু-কাশ্মীরের ৩৭০ নং ধারা নিয়ে নেহরু মন্ত্রিসভার সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দিলে তিনি সেখান থেকে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তিনি দক্ষিণপন্থী প্রজা পরিষদ গঠন করে ‘এক প্রজাতন্ত্রের মধ্যে আর একটি প্রজাতন্ত্র থাকতে পারে না’, এ দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন।
অন্য পোস্ট: শ্যামাপ্রসাদ ও কিছু অজানা কথা
১৯৫৩ সালের ১১ মে শ্যামাপ্রসাদকে গ্রেফতার করে জেলবন্দি করা হলে তিনি সেই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ১১ মে, ১৯৫৩, বিকেল ৪টেয় ড. মুখোপাধ্যায়ের জিপ কাশ্মীর-পঞ্জাব সীমানার দিকে রওনা হয়। সঙ্গে ছিলেন তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারি টেকচাঁদ ঠাকুর, জনসংঘ নেতা গুরু দত্ত বৈদ এবং শ্যামাপ্রসাদের বিশেষ প্রতিনিধি অতি বিশ্বস্ত যুবক অটলবিহারী বাজপেয়ী। ঠিক বিকেল পৌনে ৫টায় মাধোপুর চেকপোস্ট দিয়ে জম্মু সীমানার ভিতরে রাভী নদীর সেতু অর্ধেক পার হওয়ার পরেই কাঠুয়া থানার পুলিশ অফিসার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কনভয় থামিয়ে দেন। শ্যামাপ্রসাদের হাতে একটি নির্দেশনামা ধরিয়ে দেন, যাতে লেখা ছিল, ড. মুখার্জির জম্মু-কাশ্মীরে প্রবেশের কোনও অনুমতি নেই।
বাংলার গর্ব ড. মুখোপাধ্যায় তাঁর একান্ত বিশ্বস্ত অনুগামী যুবক অটলবিহারী বাজপেয়ীকে জিপ থেকে -নামিয়ে দেন এবং বলেন, ‘বাজেপেয়ী, তুমি ফিরে যাও। গিয়ে দেশবাসীকে বলো, আমি বিনা পারমিটেই জম্মু-কাশ্মীরে প্রবেশ করেছি।’ এর পরে সে রাতে তাঁদের শ্রীনগর সেন্ট্রাল জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে শ্রীনগর শহর থেকে ৭ মাইল দূরে জঙ্গলে ঘেরা সাপ-প্যাঁচায় পরিপূর্ণ অত্যন্ত স্যাঁতসেঁতে মনুষ্য বসবাসের অনুপযুক্ত কুঠুরিতে তাঁদের রাখা হয়। চারপাশে পাহাড় আর জঙ্গল, যেন এক ভিন্ন গ্রহ। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে চলে যাওয়ায় ড. মুখোপাধ্যায় অসুস্থবোধ করতে লাগলেন। ওই কটেজের মেঝেতে শুধু একটি তাকিয়া পাতা ছিল। ওই রাতে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান তথা বাংলার বাঘ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বীর পুত্র শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কাশ্মীরের ঠান্ডা সইতে না পেরে বারবার একটি গরম পোশাক ভিক্ষে চান শেখ আবদুল্লার কর্চারীদের কাছে। অসহায় বাগানের মালি ফ্যাল ফ্যাল করে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কারণ তাঁর কিছু করার ছিল না। উপরতলা থেকে সেরকমই নাকি নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে রাত গভীর হলে কাশ্মীর সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মচারী বক্সি গুলাম মহম্মদ একটি ওভারকোট আর ব্ল্যাঙ্কেট পাঠান ড. মুখোপাধ্যায়ের জন্য। টিম টিম করা আলোয় শ্যামাপ্রসাদ আর তাঁর সহযোগীরা ওই জঙ্গলে হিমাঙ্কের নীচে চলে যাওয়া তাপমাত্রায় মেঝেতে পড়ে ছিলেন। তারপর কী হয়েছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
