সুদীপ ঘোষাল

বাংলায় উর্বর মস্তিষ্কের অভাব নেই। বহু জ্ঞানী-গুণী মানুষের জন্মস্থান এ বঙ্গভূমি। লেখক, শিল্পী, সংগীতজ্ঞ, আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, বিপ্লবীরা জন্ম নিয়ে আমাদের জন্মভূমিকে ঋদ্ধ করেছেন। তাঁদের অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বাংলা বরাবরই চিন্তা, বুদ্ধিমত্তায় কয়েক কদম এগিয়ে থাকে। আর তার জন্য যাঁদের ভূমিকা অনস্বীকার্য, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ভারতকেশরী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কর্মবীর, সৎ, ন্যায়পরায়ণ, দেশভক্ত এই বঙ্গসন্তানের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলেই আজ আমরা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাস করছি। মৃত্যুর প্রায় সাত দশক পরে আজ ভারতের কোনায় কোনায় পৌঁছে গিয়েছে তাঁর কর্মের মহিমা, জ্ঞানের আলো।
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন ভারতীয় পণ্ডিত ও রাজনৈতিক নেতা। তিনি জওহরলাল নেহরুর ক্যাবিনেটের মন্ত্রী ছিলেন। শ্যামাপ্রসাদের পরিবারের আদি নিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার জিরাট-বলাগড় গ্রামে৷ তাঁর ঠাকুরদার বাবা পারিবারিক কারণে হুগলি জেলারই এক ব্রাহ্মণ অধ্যুষিত গ্রাম দিগসুই থেকে জিরাট-বলাগড় গ্রামে এসে বসতি গড়েন৷ তাঁর ঠাকুরদা গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৮৩৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর জিরাট-বলাগড় গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেন৷ তিনি ছিলেন মেধাবী৷ তিনি জিরাটের বিত্তশালীদের সাহায্যে কলকাতায় ডাক্তারি পড়তে আসেন এবং পরে জিরাট-বলাগড় গ্রাম ছেড়ে কলকাতার ভবানীপুরে বসতি স্থাপন করেন।
শ্যামাপ্রসাদ ১৯০১ সালের ৬ জুলাই কলকাতায় এক উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও মা যোগমায়া দেবীর কাছ থেকে তিনি কিংবদন্তিতুল্য পাণ্ডিত্য ও ঐকান্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনা উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেন। তাঁরা তাঁকে পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনে অনুপ্রাণিতও করেন। ১৯২১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে সাম্মানিক পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান দখল করার পর শ্যামাপ্রসাদ ভারতীয় ভাষায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর তিনি ১৯২৪ সালে বিএল পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ স্থান লাভ করেন। ছাত্র থাকাকালীন তিনি তাঁর উপাচার্য বাবাকে শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করেন। বাবার মতো তিনিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (১৯৩৪-১৯৩৮) হন।
১৯৩৭ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনুরোধ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত রচনা করে দেওয়ার। রবীন্দ্রনাথ একটির বদলে দু’টি গান রচনা করে দেন। গানগুলি হল, ‘চলো যাই, চলো যাই’ ও ‘শুভ কর্মপথে ধর নির্ভয় গান’। ‘চলো যাই, চলো যাই’ গানটি গৃহীত হয় এবং ১৯৩৭ সালের ২৪ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে কুচকাওয়াজে ছাত্রদের দ্বারা প্রথম গাওয়া হয়। ২০০৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত হিসাবে ‘শুভ কর্মপথে ধর নির্ভয় গান’ গানটি গৃহীত হয়।
ড. মুখোপাধ্যায় ভারত বিভাজনের তীব্র বিরোধী ছিলেন। ১৯৪১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি বলেন, মুসলিমরা যদি ভারতের বিভাজন চায়, তবে এদেশের সকল ইসলাম ধর্মাবলম্বীর উচিত তাদের তল্পিতল্পা গুটিয়ে পাকিস্তান চলে যাওয়া। ড. মুখোপাধ্যায় ফজলুল হক মন্ত্রিসভায় অবিভক্ত বাংলার অর্থমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১১ ডিসেম্বর, ১৯৪১ থেকে ২০ নভেম্বর, ১৯৪২ পর্যন্ত কাজ করেন। সে সময় কাজী নজরুল ইসলাম আর্থিক অনটনের সুরাহার জন্য ফজলুল হক সাহেবের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে শ্যামাপ্রসাদের শরণাপন্ন হন এবং সহযোগিতা পান। ড. মুখোপাধ্যায় নিজের পৈতৃক বাড়ি মধুপুরে কবির সস্ত্রীক থাকার ব্যবস্থা করেছেন স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট নেহরুর মন্ত্রিসভায় শ্যামাপ্রাসাদ শিল্পমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হিন্দু মহাসভাকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজে আত্মনিয়োগের পরামর্শ দেন তিনি। ভারতের শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন শিল্প উন্নয়ন নিগম, প্রথম শিল্পনীতি প্রণয়ন, চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ স্থাপন, সিন্ধ্রি সার কারখানা-সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। খড়গপুরে ভারতের প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স স্থাপন, কলকাতার প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্থাপনের ভাবনা তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত।
