ড. শর্মিষ্ঠা ঘোষ
অধ্যাপিকা, দর্শন বিভাগ, ফকিরচাঁদ কলেজ

বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আজ দূরকে কাছের বা হাতের মুঠোর মধ্যে করে দিয়েছে। আপনজন বহুদূরে থাকলেও ইচ্ছা থাকলে তাকে দেখতে পাই। প্রয়োজনে তার সঙ্গে কথা বলতে পারি। আজ বিশ্ব-মহাকাশ সম্বন্ধে কত জ্ঞান লাভ হচ্ছে। আবার চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে দেহের অভ্যন্তরের খুঁটিনাটি বিষয়ও জানতে পারছি। এত জ্ঞান, এত সাফল্য, এত উন্নতি কি মানুষকে শান্তি দিতে পেরেছে?
পরিসংখ্যান বলছে, মানুষের হতাশা, একাকিত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানসিক রোগ, স্মৃতিভ্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে। মনোজগতের শান্তি টা টা করে ওই মহাকাশে পাড়ি দিয়েছে। বাহ্যজগতে সব সময় নিজেকে জাহির করা বা প্রকাশ করার নেশায় আজ যেন সকলে ভেসে চলেছে। সামাজিক মাধ্যমে বহু বন্ধুর মধ্যে থেকেও অন্তরজগতে জমছে একরাশ হতাশা, একাকিত্ব। অর্থাৎ সমস্ত যুদ্ধ, অশান্তি এখন মানসিক জগতে বিরাজ করছে। এর থেকে বের হওয়ার জন্য দরকার মাতৃসুলভ স্নেহ, শুদ্ধ ভালোবাসা, মমতা ও আন্তরিকতার বিকাশ।
ঊনবিংশ শতকে সারদাদেবী দেখিয়েছেন, গর্ভে ধারণ না করেও একজন অতি সাধারণ নারী কীভাবে তাঁর মাতৃত্বসুলভ গুণের পূর্ণ বিকাশের মাধ্যমে সর্বকালের, সর্বমানুষের মা হয়ে উঠতে পারেন। তাঁর ১৭২তম জন্মতিথির প্রাক্কালে সেই মাতৃত্বের স্মরণ ও মননের মধ্যে তাঁকে অনুধ্যানের প্রচেষ্টা করছি। এটা কোনও ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা বা কোনও দেবী মাহাত্ম্যের কথা নয়, জগৎ-সংসারের বিভিন্ন ছোট-বড় সমস্যার সমাধানে মায়ের উপদেশগুলি অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে খুবই প্রাণবন্ত ও প্রাসঙ্গিক।
মায়ের সমগ্র জীবন যেন একটি খোলা বই। তা শিশুদের পাঠ্যবইয়ের মতো সহজ ও সরল এবং তার প্রতিটি পাতায় রয়েছে জাগতিক বিভিন্ন সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ। সংসারের সব দায়িত্ব পালন করে কীভাবে মানুষ এক শান্তিময় জীবনের অধিকারী হবে, কীভাবে সংসারে থেকেও আধ্যাত্মিক বিকাশলাভ করবে, তার পথনির্দেশ।
সারদাদেবী একজন জননী, তাই স্নেহ, মমতা, কোমলতা দিয়ে, আবার সময় বিশেষে কঠোর হয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের ভক্তদের লালন-পালন করেছিলেন। ব্রহ্মচারী জ্ঞানের একবার খুব পাঁচড়া হয়। তিনি তখন নিজের হাতে খেতে পারতেন না। তাই সারদাদেবী ভাত মেখে তাঁকে খাইয়ে দিতেন এবং তাঁর উচ্ছিষ্ট পাতা পর্যন্ত নিজের হাতে ফেলে দিতেন। আর একবার কোনও কাজে এক সন্ন্যাসী সন্তান জয়রামবাটির পাশের গ্রামে গিয়েছিলেন। কাজ সারতে তাঁর অনেক দেরি হয়ে যাওয়ায় সূর্যাস্তের একটু আগে তিনি ফিরেছিলেন। সন্তানের খাওয়া হয়নি বলে সারদাদেবী অসুস্থ শরীরে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপবাসী ছিলেন। সন্তানকে খাইয়ে তিনি নিজে খেতে বসেছিলেন। কুলি-মজুর, ফেরিওয়ালা, মেছুনি, পালকিওয়ালা, যে কেউ সারদাদেবীর কাছে আসুন, তাঁর কাছে জলখাবার মুড়ি, গুড়, মিষ্টি পাবেনই।
এই স্নেহ, ভালোবাসা শুধু মঠের সন্তানদের জন্যই নয়, পরাধীন দেশে স্বাধীনতা সংগ্রামী থেকে ইংরেজ অধিকারী, আমজাদ থেকে শরৎ, সবার প্রতি মায়ের সমান ভালোবাসা বর্ষিত হতে দেখা যায়। যেমন, সুরেন করের আত্মহত্যার খবরে গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মা বলেন, “হে ঠাকুর, আর কতদিন তুমি এই সরকারের অনাচার সইবে?”
অন্য পোস্ট: নাটোরের বনলতা সেন ও অর্ধবঙ্গেশ্বরী রানি ভবানী
শ্রীমায়ের কাছে সকলেই নিজ সন্তান। একবার কয়েকজন বিপ্লবী সন্তান মায়ের কাছে কাতরভাবে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন, ‘‘মা, তুমি একবারটি মুখ দিয়ে বলো, ইংরেজ উচ্ছন্নে যাক।’’ মা তাঁদের কষ্ট অনুভব করে বলেছিলেন, “আমি মা হয়ে মানুষকে উচ্ছন্নে যেতে কী করে বলব? ইংরেজ কি আমার সন্তান নয়? আমি বলি, সকলের কল্যাণ হোক।” অর্থাৎ সকলেই মায়ের সন্তান, আর সকল সন্তানের কল্যাণ কামনাই মায়ের জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল।
এবার মায়ের দেওয়া কয়েকটি উপদেশের আলোচনা করব, যা বর্তমান মনের অস্থিরতা, হতাশা, গ্লানি, হিংসারূপ অসুর বধ করার জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যেমন, মা বলেছেন, “পৃথিবীর মতো সহ্যগুণ চাই। পৃথিবীর উপর কতরকমের অত্যাচার হচ্ছে, অবাধে সব সইছে।” ধৈর্য বা সহনশীলতা বড় গুণ। সহনশীলতার সঙ্গে নিরলস প্রচেষ্টা দ্বারা মানুষ যে কোনও কাজ সম্পন্ন করতে পারে। তাছাড়া সংসারে একজনের একটু সহনশীলতা যে কোনও সম্পর্ককে সুগঠিত ও মজবুত করে থাকে।
দ্বিতীয়ত, মা বলেছেন, “যখন যেমন, তখন তেমন।” মায়ের এই উপদেশ রান্নাঘর থেকে বাইরের কর্মব্যস্তময় জীবন, সকল ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করার অব্যর্থ ওষুধ। ওই যে কারও জন্য মাছের ঝাল, কারও জন্য মাছ ভাজা, আবার কারও জন্য পাতলা মাছের ঝোল— বাস্তব জীবনে যখন যেমন, তখন তেমন, যেখানে যেমন, সেখানে তেমনভাবেই চলতে হয়, সব জায়গায় তো একই ওষুধ কাজ করবে না।
তৃতীয়ত, মা বলেছেন, “যাকে রাখো, সেই রাখে। আবার তো ওটি দরকার হবে। যার যা সম্মান, তাকে সেটুকু দিতে হয়। ঝাঁটাটিকেও মান্য করে রাখতে হয়।” মায়ের এই কথাটি একটু উপলব্ধি করতে পারলে সংসারের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে। সামাজিক মাধ্যমের ফেক বন্ধুত্বের জায়গায় প্রকৃতই সকলে সকলের বন্ধু হয়ে উঠতে পারবে।
অন্য পোস্ট: শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতের মাহাত্ম্য
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষ বন্ধুত্ব করে বা সম্মান প্রদর্শন করে পদ দেখে। আর উচ্চপদাধিকারী হলে তো কথাই নেই। যাঁরা কোনও পদাধিকারী নয় বা সমাজ কথিত ছোট ছোট কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের কি যথাযোগ্য সম্মান দেওয়া হয়? একজন প্রবীণ রিকশাচালককে ক’জন ‘আপনি’ সম্বোধন করে কথা বলে? আজকাল তো প্রত্যেক বাড়িতে কাজের দিদিরা কাজ করে থাকেন, কতজন নিজের পরিবারের মতো করে তাঁদের বন্ধু ভাবতে পারে? সমাজে সবাই সম্মানের অধিকারী।
সবাইকে সবাই যদি যথাযথ সম্মান দেয়, তবেই বাস্তব জগৎ শান্তিময়, সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। তখন আর হয়তো ভালো থাকার জন্য সামাজিক স্বপ্নময় মাধ্যমগুলির প্রয়োজন পড়বে না। আর একটা কথা মনে রাখা খুব প্রয়োজন যে, অপরকে যথাযথ সম্মান দিলেই নিজে সম্মান পাওয়া যায়।
চতুর্থত, সারদাদেবী বলেছেন, “যদি শান্তি চাও, মা, কারও দোষ দেখো না।” অন্যের দোষ দেখতে দেখতে নিজের মধ্যেই অনেক সময় সেই দোষ দেখা দেয়। কারণ ‘যাদৃশী ভাবনা যস্য সিদ্ধির্ভবতি তাদৃশী”, অর্থাৎ যার যেমন ভাবনা, তার সেরূপ সিদ্ধি। ফলে অন্যের দোষ দেখতে গিয়ে নিজেরই সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়। এখানে জানিয়ে রাখা ভালো যে, পরনিন্দা ও পরচর্চার মধ্যে পার্থক্য আছে। পরনিন্দা অর্থাৎ দোষ দেখা সর্বৈবভাবেই ক্ষতিকারক। তবে পরচর্চা কিন্তু ব্যক্তিকে সমৃদ্ধ করে, যেমন, কোনও লেখকের লেখার সমালোচনাই ওই লেখাকে সমৃদ্ধ করে। তাই মা এখানে দোষ বলতে পরনিন্দার কথাই বলেছেন।
এ তো গেল ঊনবিংশ শতকের একজন সাধারণ গ্রামের নারীর কথা, যাঁর মধ্যে মাতৃত্বের পূর্ণ বিকশিত রূপ দেখতে পাওয়া যায়। তাহলে দেবী মাহাত্ম্য কী? ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, “যেখানে তাঁর বিশেষ শক্তির প্রকাশ, সেখানেই অবতার।” সমগ্র জগৎ এক ব্রহ্মের শক্তি ও তাঁর প্রকাশ। যেমন অবতার, তেমনই দেবী মাহাত্ম্য। এক নারীর মধ্যে ব্রহ্মশক্তির বিশেষ প্রকাশই তাঁকে দেবীর আসনে উত্তীর্ণ করে। শ্রীশ্রীমা সারদাদেবীর মধ্যে সেই বিশেষ শক্তির জাগরণই দেখতে পাওয়া যায়। তবে তাঁকে জননী রূপে দেখি, নারী রূপে দেখি বা দেবী রূপে, যে কোনও রূপেই সবার আগে তিনি একজন স্নেহময়ী ‘মা’, যিনি সর্বদা তাঁর অপার স্নেহ, ভালোবাসা, মমতায় পরিপূর্ণ হয়ে সমাজকে শান্তির পথ দেখিয়েছেন। তাই তিনি শান্তিরূপিণী, করুণাময়ী সকলের সত্যিকারের মা হয়ে উঠেছেন। তাঁর ১৭২তম জন্মতিথির প্রাক্কালে চরণকমলে জানাই প্রণাম। অশান্ত এই সমাজকে তাঁর বাণী শান্তির পথ দেখাক।
