সুদীপনারায়ণ ঘোষ

নাটোরের বনলতা সেনকে অনেকেই জানেন কবি জীবনানন্দের দৌলতে। বাস্তবে এমন কেউ ছিলেন কি না, আমরা জানি না। কিন্তু বাস্তবে ‘নাটোরের রানী’ নামে একজন ছিলেন, অথচ তাঁকে এখনকার অনেকেই জানে না। এই ‘নাটোরের রানী’ রানি ভবানী নামেও পরিচিত। তাঁকে অর্ধবঙ্গেশ্বরী নামেও লোকে চিনতেন তাঁর সময়।
রানি ভবানীর সময়কাল আনুমানিক ১৭১৬-১৮০৩ সাল। ঔরঙজেব মারা গিয়েছিলেন ১৭০৭ সালে, আর রানি ভবানী জন্মেছিলেন ১৭১৬ সালে। ১৭১৬ সালে পূর্ববাংলার বগুড়া জেলার ছাতিনগ্রামে ব্রাহ্মণ পরিবারে রানি ভবানী জন্মেছিলেন। তাঁর বাবা আত্মারাম চৌধুরী ছিলেন ছাতিনগ্রামের জমিদার।
রাজশাহির তৎকালীন জমিদার রাজা রামকান্ত মৈত্র রায়ের সঙ্গে ভবানীর বিয়ে হয়েছিল। ১৭৪৮ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর ৩২ বছর বয়সে ভবানী জমিদার হন এবং তাঁকে রানি নামে ডাকা শুরু হয়। রাজশাহি জেলার নাটোরে ছিল তাঁর রাজপ্রাসাদ।
রাজশাহি বা নাটোর এস্টেট ছিল দেশের বৃহত্তম জমিদারি। বাংলার এক বিশাল অঞ্চলজুড়ে ছিল এই জমিদারি। আয়তন ছিল প্রায় ৩২,৯৭০ বর্গ কিলোমিটার। উত্তরবাংলার বেশিরভাগ অঞ্চল মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, যশোর, বীরভূম ও বর্ধমান জেলার বড় অংশ এর মধ্যে পড়ত। স্বামীর মৃত্যুর পর রানি ভবানী জমিদারি ও রাজপ্রাসাদ দুই-ই বাড়িয়েছিলেন।
তখনকার দিনে মহিলা জমিদার খুব বিরল ছিল। রানি ভবানী চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এত দক্ষভাবে বিশাল জমিদারি পরিচালনা করেছিলেন যে, জমি থেকে বার্ষিক আয় ১.৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যার মধ্যে ৭০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল সরকারকে। বাকি অংশ জনকল্যাণমূলক নির্মাণকাজে এবং দুস্থদের সহায়তার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল।
রানি ভবানী নবাব সিরাজউদ্দৌলার কাছে তাঁর রাজ্য রক্ষার জন্য এক শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। সেনাবাহিনীর অবাধ্যতার জন্য তার সংস্কার ও পুনর্গঠন শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাঁর ভয় সত্যি হল। সেই সুযোগে শীঘ্রই নবাব লালসা চরিতার্থ করার জন্য একজন দূত পাঠান। রানি ভবানী প্রত্যাখ্যান করলে ক্ষুব্ধ নবাব তারাকে অপহরণ করতে, রানিকে পদচ্যুত করতে এবং রাজকোষ লুট করতে সেনাবাহিনী পাঠান। রানি নিজেই সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে নবাবের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে তাঁর অঞ্চল থেকে তাড়িয়ে দেন। যুদ্ধে নাটোরের জনগণও রানির বাহিনীতে যোগ দেয়। রানি ভবানী তারাসুন্দরীকে বারাণসীতে পাঠিয়ে দেন। নাটোরে রানি ভবানীর বাড়ি এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের এক প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। পলাশির যুদ্ধের ৪৬ বছর পর ১৮০৩ সালে ৭৯ বছর বয়সে রানি ভবানী মারা যান।
রানি ভবানী পরোপকার এবং উদারতার জন্য ঘরে ঘরে পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন। তিনি কঠোর নিয়মানুবর্তী জীবন কাটাতেন। সারা বাংলায় তিনি শত শত মন্দির, বিশ্রামাগার ও রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন। তিনি তাঁর প্রজাদের তীব্র জলকষ্ট দূর করতে অসংখ্য পুকুর বানিয়েছিলেন। তিনি হাওড়া থেকে বারাণসী পর্যন্ত একটা রাস্তা তৈরি করেছিলেন, যা আজও ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি শিক্ষার প্রসারেও আগ্রহী ছিলেন এবং অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উদারভাবে দান করেছিলেন। তিনি সমাজে বিধবা পুনর্বিবাহ প্রবর্তন করে সামাজিক সংস্কার আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ব্যর্থ হন। সারা বাংলায় দুর্ভিক্ষের সময় তিনি নিজের খরচে লোকদের সাহায্য করার জন্য আটজন বৈদ্য নিয়োগ করেছিলেন।
মুর্শিদাবাদের বরানগরে ১৭৫৩ থেকে ১৭৬০ সময়পর্বে রানি ভবানী স্থানটিকে দ্বিতীয় বারাণসীতে পরিণত করার লক্ষ্যে ১০৮টি পোড়ামাটির শিবমন্দির নির্মাণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে অনেক মন্দির হারিয়ে গিয়েছে। টিকে থাকা মন্দিরের মধ্যে রয়েছে চর বাংলা মন্দির। তারাপীঠ ও বেনারসেও তিনি ভালো কাজের পরিচয় রেখেছিলেন। তারাপীঠ ও বারাণসীর দুর্গাকুণ্ড মন্দির রানি ভবানী নির্মাণ করেছিলেন। বগুড়া জেলার ভবানীপুর শক্তিপীঠ উন্নয়ন ও সংস্কারের জন্য বিরাট অবদান রেখেছিলেন। ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের এত খ্যাতি প্রচারিত হয়, কিন্তু বাংলার রানি ভবানীর কেন হন না?
