গৌতম সরকার

বিষয় ও আঙ্গিকের অনন্যতাই রতন থিয়ামকে বিশ্বের দরবারে আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারের অন্যতম পথিকৃৎ করে তুলেছিল। গত বছর ২৩ জুলাই তাঁর জীবনাবসানের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় নাটকে একটা বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
মণিপুরের সঙ্গে মহাভারতের সম্পর্ক মূলত শোষণের, চিত্রাঙ্গদা তাঁর বড় প্রমাণ। রতন বারবারই মহাভারতে ফিরে গিয়েছেন। চক্রব্যূহ, উরুভঙ্গমের মতো একের পর এক নাটক তৈরি করেছেন। এই মহাকাব্য থেকে রসদ নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে কোনও সওয়াল করেননি। চিরকাল শান্তিকামী থেকেছেন।
রতন সারাজীবন রাজনীতির আঙিনায় একজন শিল্পী হিসাবে দায়বদ্ধ থেকেছেন। সমকাল সম্পৃক্ত তাঁর নাটকে উঠে এসেছে কুকি-মেইতেই সংঘর্ষ আর ইন্ডিয়ান স্টেটের রাজনৈতিক গা-জোয়ারি। এই সবকিছুর বিরুদ্ধে নাট্যমঞ্চে তিনি আর তাঁর সহকর্মীরা সোচ্চার হয়েছেন। প্রতিবাদকে যুদ্ধক্ষেত্রের সৈনিকদের কাছ থেকে আপামর দর্শকের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার ব্রতে ব্রতী হয়েছিলেন। লড়াইয়ে সব সময় ময়দানে ছিলেন। তাঁর অগ্রজ কানহাইলালের মতো সরাসরি শত্রু শিবিরে হানা দেননি। আবার কোনও অন্যায় যুদ্ধেও যোগ দেননি। সব সময় বিশ্বাস রেখেছেন আপন শৈলী ও সংস্কৃতিতে। আধুনিকতার সঙ ঐতিহ্যের অপরূপ সুন্দর দ্বিঘাত সমীকরণ তাঁর সৃষ্টির মাধুর্যকে মণিপুর, ভারত ছাড়িয়ে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছে। একদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রাজা’ নাটক নিয়ে কাজ করেছেন, অন্যদিকে অপূর্ব মুনশিয়ানায় হেনরিক ইবসেনের ‘হোয়েন উই ডেড অ্যাওয়েকেন’ নাটক নির্মাণে তিনি এক নিজস্ব নাট্যভাষ সৃষ্টি করে এই দুই মহান সৃষ্টিকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখতে ও ভাবতে শিখিয়েছেন। তিনি নাট্যমোদী দর্শককে চণ্ডাশোক নয়, ‘উত্তর প্রিয়দর্শী’-কে, শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথকে হিংসা ও রৈরিতা ভুলে উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর মারণযজ্ঞের অসুখ হিসাবে দেখতে ও চিনতে শিখিয়েছিলেন।
রতন থিয়ামের নাম ছিল নিমাই থিয়াম। ১৯৭১ সালে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে পাকাপাকি মণিপুরের চলে যান, তবুও তাঁর জন্মতীর্থ নবদ্বীপের সঙ্গে সারাজীবন নাড়ির টান রয়ে গিয়েছিল। অন্য সময় না হলেও দোলের সময় প্রতিবছর নবদ্বীপ আসতেন, এমনকী চরম অসুস্থতার মধ্যে গত বছরও ঘুরে গিয়েছেন।
রতন কৃষ্টি ও কলা নৃত্যশিল্পী বাবা-মা তরুণ কুমার এবং বিলাসিনী দেবীর কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। মণিপুর রাজবাড়ি সংলগ্ন নাটমন্দিরের বৈষ্ণব আচার, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলার সাড়ম্বর শোভাযাত্রা সহকারে নগর সংকীর্তনের প্রথা পরবর্তীতে তাঁকে তাঁর নিজস্ব নাট্যভাষ তৈরি করতে এবং তার নান্দনিক প্রয়োগের প্রাথমিক শিক্ষা দিয়েছিল। শিকড়ের কাছে চিরকাল ঋণী থেকে গিয়েছেন। আশপাশের পরিবেশ থেকে প্রপস্ সংগ্রহ করে মঞ্চ সাজাতেন। তাঁর নাটকে একইসঙ্গে দেখা যায় আড়বাঁশির মেঠো সুর, আবার মঞ্চ কাঁপানো রণভেরির ভীমগর্জন। রতন থিয়াম ছিলেন আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ। নাটকের এক নিজস্ব ভাষা তৈরি করে মণিপুরি নাটকের আঙ্গিকের আমূল বদল ঘটান।
রতন ছিলেন একজন বহুমুখী প্রতিভাধর মানুষ। তিনি আঁকতে পারতেন, মঞ্চ নির্মাণে অসাধারণ দক্ষতা ছিল, আবার লোকনৃত্য ও সংগীতেও সমান পারদর্শী ছিলেন। এসবই তিনি পেয়েছিলেন তাঁর নিজস্ব মেইতেই সম্প্রদায়ের নিজস্ব কলাশিল্প অনুশীলনের মধ্য দিয়ে। ভারতীয় থিয়েটারকে প্রসেনিয়াম থিয়েটারের প্রভাবমুক্ত করে বিশ্বের দরবারে মেলে ধরেছিলেন, যার মধ্যে কলোনিয়াল হ্যাবিটের লেশমাত্র ছিল না। মেইতেই সংস্কৃতি ও শিল্পকলা চর্চা তাঁকে ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা শিক্ষাঙ্গনে নিজেকে পরিণত করতে সাহায্য করেছিল।
সারাজীবন ধরে রতন থিয়াম বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে একের পর এক মহান সৃষ্টি দর্শকদের উপহার দিয়েছেন। একবার স্থানীয় মার্শাল আর্টে পারদর্শীদের নিয়ে একটি নাট্যদল তৈরি করেন, যাঁদের কোনও প্রথাগত অভিনয় শিক্ষা তো ছিলই না, উপরন্তু তাঁরা কোনও দিন মঞ্চে পা দেননি। রতন তাঁর দীর্ঘ অধ্যবসায়, অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সেসব আনকোরা মানুষকে দিয়ে অভিনয় করিয়ে বাহবা পেয়েছিলেন। তাঁর নাট্যনির্মাণ, প্রয়োগ ও উপস্থাপনার অভিনবত্বের জন্য তাঁকে প্রখ্যাত জাপানি নাট্যব্যক্তিত্ব তাদাশি সুজুকির সঙ্গে তুলনা করা হয়। ১৯৭৬ সালে তিনি ‘কোরাস রেপার্টারি থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠা করেন। গত শতকের নয়ের দশকে সেখানে তিনি ‘ভিলেজ থিয়েটার’ কনসেপ্টের আমদানি করেন, যেটি পরবর্তীতে ভারতের অন্যান্য নাট্যদল গ্রহণ করেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শুধু থিয়েটারকে জীবিকা করে বেঁচে থাকা সম্ভব নয, আবার পেশাদার না হলে থিয়েটার কর্মীদের পক্ষে অভিনয় চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। তাই একটা বড় এলাকাকে ‘ভিলেজ’ নাম দিয়ে সেখানে অভিনয়ের পাশাপাশি শস্য-মাছ চাষ, কাপড় বোনা প্রভৃতির মতো পেশাদারী কাজ শুরু করেন। সেখানে এসব কাজ করতেন নাট্যকর্মীরা।
রতন থিয়াম আসলে থিয়েটার মঞ্চের নামে এমন একটি ভূমি নির্মাণ করেছিলেন, যেটা আদতে ছিল যৌথ খামার, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল সকলে মিলে একসঙ্গে থেকে থিয়েটার জার্নিটাকে উপভোগ করা এবং কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠা। এই আত্মনির্ভরশীলতা থিয়েটার কর্মীদের তাঁদের কাজের প্রতি আরও দায়বদ্ধ থাকতে উদ্বুদ্ধ করেছে, কোরাস রেপার্টারি থিয়েটারের এটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য।
নাট্যজগতে রতনকে ‘থিয়েটার অব রুটস’ বিপ্লবের অন্যতম কর্ণধার বলে মানা হয়। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া মেইতেই সংস্কৃতি ছিল তাঁর সম্পদ। গৌড়ীয় বৈষ্ণব প্রেক্ষিত সেই সংস্কৃতিতে প্রয়োজনীয় জলসিঞ্চন করেছিল। যৌবনে দেখা প্রসেনিয়াম থিয়েটারের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন সাতের দশকে। সে সময় তিনি কলকাতায় এসে শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্টিকে খুব সামনে থেকে দেখেন। তারপরই রতন প্রথাগত ঘেরাটোপের ভারতীয় থিয়েটারের সঙ্গে আন্তর্জাতিকতার উদার সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটান। ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার নির্দেশক ইব্রাহিম আলকাজীর সঙ্গে পরিচয় হয়। আলকাজী তখন নাটকে ইউরোপ-আমেরিকা ঘরানার ব্যবহারে ক্লান্ত। চাইছেন পশ্চিমি কালচার থেকে বেরিয়ে এসে যথাসম্ভব প্রাচ্য সংস্কৃতির প্রবেশ ঘটাতে। চাইছেন এদেশে প্রসেনিয়াম থিয়েটারের ভূত ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে পোস্ট-কলোনিয়াল এসথেটিকদের প্রয়োগ ঘটাতে। ড্রামা স্কুলের কৃতী ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করছেন নিজেদের শিকড়কে আরও চিনতে থাকার পাশাপাশি নিজস্ব নাট্যভাষ তৈরি করতে। সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে রতন মণিপুরের ইম্ফলে গড়ে তোলেন ‘কোরাস রেপার্টারি থিয়েটার’। সৃষ্টি করতে লাগলেন চক্রব্যূহ, ঋতুসংহারম, উত্তর প্রিয়দর্শী, অন্ধ যুগ, ভাস রচিত কর্ণভরম, রবীন্দ্রনাথের রাজা, শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথের মতো একের পর এক সাড়াজাগানো নাটক। ১৯৮৭ সালে সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার লাভ করেছেন। ১৯৮৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করেছে। এছাড়া এডিনবার্গ আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবে ফ্রিঞ্জ ফার্স্ট পুরস্কার, জন ডি রকফেলার পুরস্কার, মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত সার্ভান্টিনো আন্তর্জাতিক উৎসবে ডিপ্লোমা, কালীদাস সম্মান, ভারত মুনি সম্মান প্রভৃতি লাভ করেন। তবে তিনি নিজে স্বীকার করেন, জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার তাঁর থিয়েটার দেখে দর্শকরা মুগ্ধ হন।
রতন থিয়াম সারাজীবন ধরে থিয়েটারের সেবা করে গিয়েছেন। সঙ্গে পেয়েছিলেন একদল একনিষ্ঠ সহকর্মী আর তাঁর প্রিয় পরিবার। তিন সন্তানই তাঁর নাটকের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত থেকেছেন। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রাচীন ভারতীয় থিয়েটারের ঐতিহ্য ব্যবহার করে একদিকে একের পর এক নাটক লিখে গিয়েছেন, অন্যদিকে অপূর্ব মুনশিয়ানায় সেগুলি মঞ্চস্থ করেছেন। তাঁর সৃষ্টিতে সমসাময়িক নাট্যবোদ্ধা, সহকর্মী ও অনুজ শিল্পী ও পরিচালকরা মুগ্ধ ও আপ্লুত হয়েছেন। সকলের কাছেই তাঁর চলে যাওয়া নাট্যজগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি।
রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত স্মৃতিচারণ করেছেন, ‘রতন সারাটা জীবন নিজের শিকড় খুঁজে ফিরেছেন। ভারতের মতো এত বড় দেশের কত ঐতিহ্য রয়েছে, সেখানে নিজের শিকড় খোঁজার কাজটা সহজ ছিল না। সেই অসাধ্যসাধন করে গিয়েছেন তিনি।’
নাট্য নির্দেশক ও অভিনেতা দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘রতন থিয়াম আধুনিক থিয়েটারে একটি আলাদা ভাষা নির্মাণ করেছিলেন। এটা সম্ভব হয়েছিল পাশ্চাত্যের বাস্তববাদী থিয়েটারের সঙ্গে ভারতীয় নাট্যের সঠিক সংমিশ্রণের মধ্য দিয়ে।’
মেঘনাদ ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘রতন বিশ্বাস করতেন, থিয়েটার হল শিকড়। তিনি তাঁর রসদ আহরণ করতেন গ্রিক সংস্কৃতি ও জাপানি নাট্যরীতি থেকে। কিন্তু সেটা অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে বপন করেছেন নিজ কর্মভূমি মণিপুরে। তাঁর সৃষ্টি জাপানি নোহ থিয়েটারের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়েছিল।’
অভিনেতা চন্দন সেনের স্মৃতিচারণায়, ‘থিয়েটারকে এক নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিয়েছিলেন রতন থিয়াম। আদিবাসীদের কথা এখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এদেশের নাট্যমঞ্চে। কেউ কখনও ভাবতে পারেননি যে, একজন চাষি বা দিনমজুর মঞ্চে দাঁড়িয়ে সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন। তাঁর সৃষ্টি শুধু বিনোদনের নয়, অনেক বেশি অরাজকতার বিরুচ্ছে সোচ্চার প্রতিবাদ।’
রতন থিয়ামের মতো বহুমুখী শিল্পী শতাব্দীতে একজনই জন্মান। তাঁর সব নাটকে প্রতিফলিত হয়েছে অন্তরের চেতনা। সেখানে বাহ্যিক সবকিছুই গৌণ, অন্তরের অনুভবটাই মুখ্য। এভাবেই তাঁর ভাবনার নির্যাস দিয়ে একের পর এক নাটক তৈরি করে দর্শক মনকে ছুঁয়ে গিয়েছেন। তাঁর চিন্তাভাবনা, রূপকল্প ও সমসময়ের কাছে দায়বদ্ধতা এবং একইসঙ্গে প্রাচীন শৈলীর প্রতি আনুগত্য শুধু থিয়েটার বা অভিনয় জগতকেই নয়, ভারতীয় সংস্কৃতিকে ঋদ্ধ করেছে। তিনি বহু নাট্য প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে অধ্যবসায়ের মাধ্যমে যৌবনে থিয়েটারের যে দীপশিখা জ্বালিয়েছিলেন, সেই আলোর শিখাকে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করে তাঁর সৃষ্টির মশাল তিনি দিয়ে গিয়েছেন পরবর্বতী প্রজন্মের হাতে। তাঁদের সৃষ্টির মধ্যেই তিনি বেঁচে থাকবেন, এ বিশ্বাস তাঁর চিরসঙ্গী ছিল।

