মানস চক্রবর্তী

ভারতের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিদিন হিন্দুরা অপমানিত হচ্ছে। নিজেদের দেশে নিজেরা কেন প্রতিদিন পরাজয়ের শিকার হব? কেন আমাদের সংস্কৃতি ভূলুণ্ঠিত হবে? আমরা ভুলে গিয়েছি আমাদের ইতিহাস। আমাদের ইতিহাস বীরত্ব, শৌর্য, বীর্যে পরিপূর্ণ। আজ প্রত্যেক হিন্দুকে রানা প্রতাপ, শিবাজি, গোবিন্দ সিংহের মতো স্বধর্ম ও দেশরক্ষার ব্রত গ্রহণ করতে হবে।
নোয়াখালি সম্মেলনে স্বামী প্রণবানন্দ বলেছেন, ‘বাঙালি হিন্দুর সামনে আজ একমাত্র পন্থা বীরবিক্রমে যাবতীয় অন্যায়, অত্যাচারের তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিবিধান করা এবং আত্মরক্ষার জন্য সংঘবদ্ধ হওয়া। এই আত্মরক্ষার সংগ্রামে অগ্রসর হওয়ার জন্য প্রত্যেক হিন্দুর প্রাণে দুর্জয় সংকল্প জাগিয়ে দিতে হবে। হিন্দু কখনও কারও অনিষ্ট করতে চায় না। কিন্তু তা বলে হিন্দুরা নীরবে কোনও অন্যায় বা অত্যাচার সহ্য করবে না।’ এ কথা আমাদের ভুললে চলবে না।
আমাদের কীসের ভয়? স্মরণ করি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্যের কথা, ‘হিন্দু, তুমি কি জানো না, তুমি শক্তির পূজক, মহাশক্তির উপাসক? তোমার সেই শক্তির সাধনা কোথায়? শিবের হাতে ত্রিশূল, তা দেখে তুমি কী চিন্তা করবে? শ্রীকৃষ্ণের হাতে সুদর্শন, তা দেখে তুমি কী ভাবনা ভাববে? কালীর হাতে রক্তাক্ত খড়্গ, দুর্গার হাতে দশপ্রহরণ, তা দেখে তুমি কী শিক্ষা লাভ করবে? এই মহাশক্তির সাধনা করে মানুষ দুর্বল হতে পারে কি? একবার ধীর স্থির হয়ে চিন্তা করো?’ এ কথা স্মরণ করে আমাদের ধর্ম ও সমাজ রক্ষায় তৎপর হতে হবে।
মারের বদলে মার দিতে ভয় পেলে আমাদের চলবে না। স্বামীজি একবার বিদেশ থেকে জাহাজে করে ফিরছেন। দু’জন খ্রিস্টান মিশনারি ইচ্ছা করে গায়ে পড়ে হিন্দু ধর্মের সঙ্গে খ্রিস্ট ধর্মের তুলনামূলক আলোচনা করতে এলেন স্বামীজির সঙ্গে। স্বামীজির জ্ঞানের কাছে ওঁরা দাঁড়াতে পারলেন না। আলোচনায় হারতে লাগলেন। তখন ওই দু’জন মিশনারি জঘন্য ভাষায় হিন্দু ও হিন্দু ধর্মের নিন্দা ও কুৎসা করতে শুরু করলেন। স্বামীজি অনেকক্ষণ কিছু বললেন না। চুপ করে রইলেন। শেষে আর সহ্য করতে না পেরে একজনের কাছে উঠে গিয়ে জামার কলার চেপে ধরে বললেন, ‘আমার ধর্মের নিন্দা করলে জাহাজ থেকে ছুড়ে ফেলে দেব।’ তখন মিশনারি ভয় পেয়ে ক্ষমা চাইলেন এবং বললেন, ‘আর কখনও এমন করব না।’ তারপরে জাহাজে ওঁদের সঙ্গে যখনই স্বামীজির দেখা হত, ওঁরা স্বামীজির সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন। এই পন্থাই এখন আমাদের মেনে চলা উচিত।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের শিখিয়েছেন, ভারত এগোবে তার নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে। কোনও ‘ইজম’ ভারতের চালিকাশক্তি হতে পারে না। ভগিনী নিবেদিতা বলেছেন, ‘India must grow in her own line of growth. India must remain. India always and ever.’ ভারতের মানুষ শক্তির উপাসক। অস্ত্রশস্ত্র সুসজ্জিতা সংগ্রামরতা দেবীর উপাসক। জগদগুরু আচার্য প্রণবানন্দজি বলেছেন, ‘এবার শুধু ফুলের পূজায় হবে না, বীর্যের পূজা চাই। যে দেবতার যে ভাব, যে লীলা, যে অস্ত্রশস্ত্র, তা দিয়ে পূজা করলে সেই দেবতার শক্তি ও আশীর্বাদ লাভ করা যায়। শিবের প্রীতি ত্রিশূলে, শ্রীরামচন্দ্রের প্রীতি ধনুর্বাণে, শ্রীশ্রীকৃষ্ণের প্রসন্নতা সুদর্শনে, দশভুজা দুর্গার প্রীতি দশপ্রহরণে।
অন্য পোস্ট: বিবেকানন্দ আধুনিক বিজ্ঞান যুগের মানুষ
কুরুক্ষেত্রে রক্তের গঙ্গা বয়ে গেল। ভগবান বললেন, কুরুক্ষেত্র হল ধর্মক্ষেত্র। ‘ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে…।’ অনেকে ভারতের ধর্ম না জেনেই ভীষ্ম বধ, জয়দ্রথ বধ, দ্রোণাচার্য বধ, কর্ণ বধ, দুর্যোধন বধের জন্য শ্রীকৃষ্ণকে দোষারোপ করেন। বালি বধের জন্য রামচন্দ্রকে দোষারোপ করেন। ধর্মরক্ষা এবং ধর্মস্থাপনের জন্য এই বধের প্রয়োজন ছিল। তাঁরা সকলেই ছিলেন অন্যায়ের সমর্থনকারী এবং নিজেরাও যথেষ্ট অন্যায় করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, অন্যায় করা এবং অন্যায় সহ্য করা দুই-ই সমান অপরাধ। ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।’
কর্ণের রথের চাকা মাটিতে ঢুকে গিয়েছে। তিনি অর্জুনকে বলছেন, ‘হে কুন্তীনন্দন, তুমি অপেক্ষা করো। বীরধর্মের অসম্মান করো না। হে অর্জুন, যে বিধ্বস্ত হয়েছে, পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালিয়ে যাচ্ছে, যে ব্রাহ্মণ, যে হাত জোড় করেছে, শরণাগত এবং প্রাণভিক্ষা করছে, অস্ত্রত্যাগ করেছে, বর্ম খণ্ডিত হয়েছে, অস্ত্র পড়ে গিয়েছে বা ভেঙে গিয়েছে, এসব ব্যক্তির ওপর অস্ত্র নিক্ষেপ করা বীরধর্ম নয়। আমাকে কিছু সময় দাও। আমি রথের চাকা উঠিয়ে নিই। তারপর আমার সঙ্গে যুদ্ধ করো।’ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, ‘এখনই কর্ণকে বধ করার উপযুক্ত সময়।’ তারপর কর্ণের দিকে ফিরে বললেন, ‘রাধানন্দন, এখন তোমার ধর্মের কথা মনে পড়ছে। পাণ্ডবদের ত্রয়োদশ বছর বনবাস পার হলেও তুমি তাদের রাজ্যে ফিরিয়ে দিতে চাওনি। তখন তোমার ধর্ম কোথায় ছিল? তোমারই পরামর্শে দুর্যোধন ভীমকে বিষ মিশ্রিত খাবার খাইয়েছিল, সর্প দিয়ে দংশন করিয়েছিল। তখন তোমার ধর্ম কোথায় ছিল? বারাণাবত নগরের লাক্ষাভবনে নিদ্রিত অবস্থায় পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার ব্যবস্থা করেছিলে। তখন তোমার ধর্ম কোথায় ছিল? দুঃশাসন যখন রজঃস্বলা দ্রৌপদীকে কেশাকর্ষণ করে সভাগৃহে নিয়ে আসছিল, তখন তুমি তাকে উপহাস করেছিলে। তোমার ধর্ম কোথায় ছিল? অভিমন্যু একাকী এবং বালক হওয়া সত্ত্বেও তোমরা সপ্তরথি মিলে তাকে বধ করেছিলে। তখন তোমার ধর্ম কোথায় ছিল? ওইসব কর্মে তুমি ধর্মকে সরিয়ে রেখেছিলে। সুতরাং আজও ধর্মের দোহাই দিয়ে কোনও লাভ নেই। তোমাকে আজ মরতেই হবে।’
অন্য পোস্ট: ভারতের সংবিধান সনাতন হিন্দু ধর্মকেই মান্যতা দিয়েছে
বর্তমান ভারতেরও আজ মহাসংকট। আজ সনাতন ধর্ম ও সংস্কৃতি অপমানিত, অসম্মানিত। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পথই এখন একমাত্র অনুসরণীয়। আজ আমরা ভারত ধর্মকে ভুলে, ভারতীয় মহাপুরুষদের আদর্শ ভুলে, ভারতীয় অবতারদের আদর্শ ভুলে ভীরু কাপুরুষ একটি জাতিতে পরিণত হয়েছি। স্বার্থপরতা, লোভ আর সুশিক্ষার অভাব জাতি হিসাবে আমাদের পৌরুষহীন করে দিচ্ছে। আমরা আজ দিগভ্রান্ত। শত্রু-মিত্র ঠিক চিনে উঠতে পারছি না। কুরুক্ষেত্রের রণভূমিতে অর্জুন আত্মীয়দের দেখে যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত নেন। ভগবান কড়া সুরে অর্জুনের সে সিদ্ধান্তের নিন্দা করেন। বলেন, ‘ক্লৈব্যং মা স্ম গমঃ পার্থ নৈতত্ত্বয্যুপপদ্যতে/ ক্ষুদ্রং হৃদয়দৌর্বল্যং ত্যক্ত্ব্যেত্তিষ্ঠ পরন্তপ।’ এর অর্থ, অর্জুন এ সময় তোমার এই পৌরষহীনতা শোভা পায় না। হৃদয়ের এই তুচ্ছ দুর্বলতা পরিত্যাগ করে যুদ্ধের জন্য উত্থিত হও। কৌরবরা আজও বর্তমান। কৌরবরূপী অনাচারী, দুরাচারীরা যখনই আমাদের ইতিহাস, আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানবে, তখনই আমাদের তীব্র প্রতিবাদ, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
স্বামীজি গৌতম বুদ্ধের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। আবার রাষ্ট্র ক্ষেত্রে অহিংসা নীতির সর্বক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে প্রয়োগের কড়া সমালোচনাও করেছেন। শুধু ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ বললে হবে না, সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, ‘ধর্ম হিংসা তদৈব চ’। পুরাণ, ইতিহাস এর সাক্ষী। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পরেই ধর্মের সংস্থাপন করেছেন। অধার্মিক রাবণকে বধ করার পরেই রামচন্দ্র ধর্মের সংস্থাপন করেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস দেখুন। শহিদের রক্তের পিচ্ছিল পথেই এসেছে স্বাধীনতা। অহিংসার নামে কাপুরুষতা, দুর্বলতাকে কোথাও স্থান দেওয়া হয়নি। আত্মরক্ষাই স্বধর্ম, নিজের সংস্কৃতি রক্ষা করাই স্বধর্ম। ‘স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরোধর্ম ভয়াবহঃ’, এই সংকল্প হোক সমগ্র হিন্দুজাতির।
