শিবেন্দ্র ত্রিপাঠী

যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয়, এই দেশ কত প্রাচীন, আপনি বলবেন, হাজার হাজার বছরের। যদি প্রশ্ন করা হয়, এই হাজার হাজার বছর ধরে এদেশে কোন ধর্ম, কোন মতবাদ প্রচলিত ছিল, আপনি উত্তর দেবেন, সনাতন হিন্দু ধর্ম। আবার যদি জিজ্ঞেস করি, সেই প্রাচীন মতবাদের গ্রন্থগুলি কী কী, আপনি একনিঃশ্বাসে বলে যাবেন, বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, ত্রিপিটক, জৈনাগম, গ্রন্থসাহেব প্রভৃতি। অর্থাৎ ভারতের সভ্যতা-সংস্কৃতির ইতিহাস হাজার হাজার বছরের প্রাচীন এবং এই প্রাচীন গ্রন্থগুলি সনাতন ভারতের পরিচয় বহন করে চলেছে।
কিন্তু আজ যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করি, বর্তমান ভারতের পরিচয় কী, ভারত কোন মতবাদে পরিপুষ্ট, তাহলে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আপনার উত্তর আসবে, ভারত একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। অর্থাৎ দেশের সংবিধান ভারতের হাজার হাজার বছরের প্রাচীন সনাতন ধর্মকে তার রাষ্ট্রধৰ্ম হিসাবে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু যদি আমি বলি, ভারতের সংবিধান এদেশের আইডেন্টিটি ভগবান শিব, রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, মহাবীর, নানকদেবকে এদেশের আদর্শ পুরুষ হিসাবে মান্যতা দিয়েছে, অলিখিতভাবে ভারতের সুপ্রাচীন হিন্দু ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম বলে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবে আপনি আমাকে অশিক্ষিত বলবেন, চরম কমিউনাল বলে দাগিয়ে দিতে ছাড়বেন না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমার কথাই ঠিক।
সংবিধানে কোথাও লেখা না থাকলেও ভারত অলিখিতভাবে হিন্দু রাষ্ট্রই। স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত সরকার হিন্দুত্বকে এ দেশের আইডেন্টিটি বলে মেনে নিয়েছে। আপনি বলবেন, এর সপক্ষে কী প্রমাণ আছে? আছে, বন্ধু আছে। দু’-চারটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। ভারতের যতগুলি সরকারি সংস্থা, সরকারি দফতর আছে, তাদের একটি করে ধ্যেয় বাক্য (National Motto) আছে। সেগুলি ভারতের সুপ্রাচীন গ্রন্থ বেদ-উপনিষদ থেকে নেওয়া। যেমন, গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়ার ‘সত্যমেব জয়তে’ (মুণ্ডক উপনিষদ), ভারতের পার্লামেন্ট অর্থাৎ লোকসভার ‘ধর্মচক্র প্রবর্তনায়’ (প্রাচীন সংস্কৃত শ্লোক), সুপ্রিম কোর্ট অব ইন্ডিয়ার ‘যতো ধর্মস্ততো জয়ঃ’ (মহাভারত), আকাশবাণী (অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো)-র ‘বহুজন হিতায়’ (ঋগ্বেদ), দূরদর্শন অব ইন্ডিয়ার ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ (শিব মহাস্তোত্রম), মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্সের ‘বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম’ (মহাভারত), ইন্ডিয়ান আর্মির ‘সেবা অস্মাকং ধর্ম’, ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সের ‘নভো স্পৃষ্যং দীপ্তং’ (শ্রীমদ্ভাগবদগীতা), ইন্ডিয়ান নেভির ‘শং নো বরুণঃ’ (বেদ), সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (CBSE)-এর ‘অসতো মা সদ্গময়’ (বৃহদারণ্যক উপনিষদ), পোস্টাল অ্যান্ড টেলিগ্রাফ ডিপার্টমেন্টের ‘অহর্নিশং সেবামহে’, লাইফ ইনসিওরেন্স কার্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (LICI)-র ‘যোগক্ষেম বহাম্যহম’ (শ্রীমদ্ভাগবদগীতা), মিনিস্ট্রি অব লেবার (শ্রম মন্ত্রক)-এর ‘শ্রম এব জয়তে’, ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (পশ্চিমবঙ্গ)-এর ‘তমোস মা জোতির্গময়ঃ’ (বেদ) ধ্যেয় বাক্য ।
না, এখানেই শেষ নয়। আরও আছে। এখানে শুধু কয়েকটি উদাহরণ দিলাম। একইভাবে ভারতের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ধ্যেয় বাক্য ভারতের প্রাচীন বেদ-উপনিষদ, মহাভারত, গীতা থেকে নেওয়া। অর্থাৎ ভারতের সংবিধান লিখিত না হলেও অলিখিতভাবে ভারতের সুপ্রাচীন সনাতন হিন্দু ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম বলে স্বীকার করে নিয়েছে, একথা বলতে কোনও দ্বিধা নেই।
