অজয় ভট্টাচার্য
‘হিউম্যান ওয়াইল্ড লাইফ কনফ্লিক্ট’ নিয়ে কম আলোচনা হয়নি। তবুও ঝাড়গ্রামে গর্ভিবতী হাতির পেটে জ্বলন্ত লোহার রড ঢুকিয়ে হত্যা করার সংবাদটি এই বিতর্ককে উসকে দিল আরও একবার। বন্যরা লোকালয়ে অনধিকার প্রবেশ করছে,এর চেয়েও বড় সত্য হল, মানুষ বন্যদের বাসস্থান কেড়ে নিচ্ছে। বনজঙ্গল সাফ করে মানুষ তার সভ্যতার আঁচড় টেনে চলেছে সর্বত্র। সংরক্ষিত অভয়ারণ্য করেও টুরিস্টদের উৎপাত এবং চোরাশিকারিদের হাত থেকে রেহাই মিলছে না। তবে সুসংবাদ হল, এআই নির্ভর ট্র্যাপ ক্যামেরার সাহায্যে হাতিদের চলাচলের ওপর নজর রাখা হচ্ছে এবং নিকটস্থ বাসিন্দাদের আগেভাগে সতর্ক করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
হাতির উপদ্রবে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার দৃষ্টান্ত ভূরি ভূরি থাকলেও মানুষের সঙ্গে হাতির বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের উদাহরণও কম নেই। সরকারি ‘কর্মী’ হাতিরাও ভোটের ডিউটির চিঠি পায়। হাতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান সম্পর্ক যতটুকু মধুর হয়েছে, তার মূলে আছে উভয়ের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হাতি তার চিরাচরিত তৃণভোজী খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে মানুষের রান্না করা লোভনীয় খাদ্যের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। তাহলে ধরে নিতেই হয়, হাতির পরিপাকতন্ত্র উভয় প্রকার খাদ্য পরিপাকের উপযোগী। সেও অভিযোজিত হয়ে উঠেছে পরিবর্তিত পরিবেশের উপযোগী হয়ে। সম্প্রতি মানুষ এবং হাতির আরও একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আবিষ্কৃত হয়েছে। সেই আবিষ্কারের মূলেও রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাত।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, ডলফিন, তোতা, টিয়া তাদের সঙ্গীকে নাম ধরে ডাকতে পারে। তবে তা মানুষের মতো নয়। অন্যের শব্দ নকল করে ডাকাডাকির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।একেবারে মানুষের মতো সুনির্দিষ্ট নাম ধরে ডাকতে পারে হাতি। ‘নেচার ইকোলোজি অ্যান্ড এভোলিউশন’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে এমনটাই দাবি করেছেন একদল বিজ্ঞানী। তাঁদের এই সিদ্ধান্তে আসতে সাহায্য করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্র। কারণ হাতি যে ‘গুড়গুড়’ শব্দ সৃষ্টি করে পরিবারের একে অন্যকে ডাকাডাকি করে, তা মানুষের বোধগম্য নয়। একমাত্র মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমের পক্ষেই এই বিশেষ সংকেতবাহী শব্দগুলিকে শনাক্তকরণ এবং পৃথকীকরণ সম্ভব।
অন্য পোস্ট: ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা: ৪০ বছর আগের ভয়ংকর স্মৃতি
শ্রুতিসীমার (সেকেন্ডে ২০ থেকে ২০ হাজারবার কম্পন) বাইরের শব্দ মানুষ শুনতে পায় না। আবার সব মানুষের ক্ষেত্রে শ্রুতিসীমা সমান নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঊর্ধ্বসীমা কমতে থাকে। বিভিন্ন পশু, যেমন, কুকুর, বেড়াল, বাদুড়, হাতি প্রভৃতিমানুষের চেয়ে বেশি কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়। তাছাড়া কোনও শব্দ শুনলে তার অনুভূতি আমাদের মস্তিষ্কে প্রায় এক-দশমাংশ সেকেন্ড স্থায়ী হয়। তাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে শব্দনির্বন্ধ। এ কারণে দু’টি শব্দকে শুনতেহলে তাদের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান অন্তত এক-দশমাংশ সেকেন্ড হওয়া প্রয়োজন। মানুষের এই সীমাবদ্ধতার জন্যই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্রের সাহায্য নিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা বেছে নিয়েছিলেন কেনিয়ার একটি অভয়ারণ্যকে। হাতির নামসূচক ৪৬৯টি সাংকেতিক শব্দের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তেপৌঁছেছেন। নাম শুধু একটি শব্দ নয়, সর্বজনীন হলমার্কও বটে।
গত শতকের পাঁচের দশকে শুরু হয়েছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পথচলা। প্রারম্ভিক পর্বে ডব্লিউ গ্রেওয়াল্টারের আবিষ্কৃত কৃত্রিম বুদ্ধিসম্পন্ন যন্ত্রটি ছিল কচ্ছপের আদলে তৈরি একটি রোবট। আজ আরও উন্নততর পর্যায়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। জীবজগতে লুকিয়ে থাকা রহস্যের সমাধানে নিয়োজিত হচ্ছে সেসব অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রযুক্তি। তা মানুষের সীমাবদ্ধতাকে দূর করে তাকে স্বপ্নলোকে যাওয়ার হাতছানি দিচ্ছে। তবে উন্নততর প্রযুক্তির সাহায্যে স্বপ্নলোকে যাওয়ার স্বপ্ন শুধু সাদা মনের মানুষই দেখছে না, অপরাধী মনও দেখছে। তাই ভাঁড়ার ঘরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাজোরদার হওয়া প্রয়োজন।
