কাজল মুখার্জি

মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক ভয়ংকর বিপর্যয়ের দিন হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে ১৯৮৪ সালের ২ ডিসেম্বরের ভোপাল গ্যাস বিপর্যয়। একে অনেকেই ইতিহাসের সর্বনিকৃষ্ট শিল্প বিপর্যয় হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন।
মধ্যপ্রদেশের ভোপাল শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া লিমিটেড-এর (বর্তমানে এভারেডি ইন্ডাস্ট্রিজ ইন্ডিয়া লিমিটেড নামে পরিচিত) একটি কীটনাশক কারখানা থেকে দুর্ঘটনাবশত ৪০ টন মিথাইল আইসোসায়ানেট (এমআইসি) পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার কারণে ওই বিপর্যয় ঘটে। ১৯৮৪ সালের ২ ডিসেম্বর রাতে একটি ট্যাংকে রক্ষিত মিথাইল আইসোসায়ানেট (এমআইসি) অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে পড়ে এবং বাতাসের চেয়ে ভারী গ্যাস মাটি ঘেঁষে বের হয়ে আশপাশের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, সমস্ত পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার ঘুমন্ত মানুষের মৃত্যু ঘটে। শহরের পরিবহণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং বহু লোক পালাতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়। ছড়িয়ে পড়া গ্যাসে আরও প্রায় ১,৫০,০০০ থেকে ৬,০০,০০০ মানুষ আক্রান্ত হয় এবং পরবর্তীতে তাদের মধ্যে প্রায় ১৫,০০০ মানুষ মারা যায়।
ভোপালের ইউনিয়ন কার্বাইড প্ল্যান্ট থেকে মারাত্মক মিথাইল আইসোসায়ানেট (এমআইসি) গ্যাসের লিকেজের ফলে তাৎক্ষণিকভাবে ২,৬৬০ জন সাধারণ মানুষের প্রাণ যায় এবং এলাকার কয়েক হাজার নিরীহ নাগরিককে শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী করে। বিভিন্ন মাত্রায় প্রভাবিত প্রায় ৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ গ্যাস লিক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে বলে অনুমান করা হয়।
দুর্ঘটনার পর ৪০ বছর পরেও গ্যাসসংক্রান্ত কারণে ২৫,০০০ জনেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছে। ওই বিপর্যয়ে মানুষ ছাড়াও ৪,০০০-এরও বেশি বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী মারা গিয়েছিল এবং আরও বহু প্রাণী আহত হয়েছিল। মানুষের দুর্ভোগের মাত্রা, পরিবেশগত ক্ষতি অনেক বেশি ছিল।
এমনকী ২০২২ সালেও গ্রিনপিস নামে একটি সংস্থা বর্তমানে অব্যবহৃত ইউনিয়ন কার্বাইড প্ল্যান্ট এবং তার আশপাশের মাটি, জল এবং কঠিন বর্জ্য পরীক্ষা করার সময় ভয়ংকর তেজস্ক্রিয়তা এবং নানারকম দূষণ খুঁজে পেয়েছিল। ৪০ বছর পরেও এখনও খুঁজলে হয়তো পাওয়া যাবে ভোপালের আকাশে বাতাসে ওই ভয়ংকর গ্যাস বিপর্যয়ের তেজস্ক্রিয়তার আভাস, মানুষের হাহাকারের শব্দ আর অগণিত পরিবারের নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার হদিশ। আর যেন পৃথিবীর কোনও জায়গাতেই ওরকম ভয়ংকর প্রাণঘাতী শিল্প বিপর্যয় না ঘটে, এটাই সকলের প্রার্থনা।
