Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

নটী বিনোদিনীর জীবনের অধিকাংশই অন্ধকারে ঢাকা

নটী বিনোদিনী একদশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর অভিনয় ও গানের প্রতিভায় দর্শকদের মুগ্ধ করে রেখেছিছেন। কিন্তু তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও অখ্যাতির মধ্যে কেটেছিল।

একজন গণিকা হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করার পর নটী বিনোদিনীকে কলকাতার জাতীয় থিয়েটারের প্রধান অভিনেত্রী হিসাবে বেছে নেন বাংলা থিয়েটারের কিংবদন্তি গিরীশচন্দ্র ঘোষ।

Share Links:

সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

প্রথম দিকে বাংলা থিয়েটার জগৎ ছিল পুরুষ অধিকৃত। সেখানে কোনও মহিলারই অংশগ্রহণের অনুমতি ছিল না। পুরুষরা নাটকে নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন। তবে পরে পরিস্থিতি বদলে যায়। কলকাতা থিয়েটার মঞ্চে নারী শিল্পীদের যোগদান শুরু হয়, এমনকী ইংরেজি থিয়েটারের আগেও। কলকাতার মঞ্চে প্রথম প্রজন্মের অভিনেত্রীদের মধ্যে অন্যতম বিনোদিনী দাসী, যিনি পরবর্তী বছরগুলিতে নটী বিনোদিনী নামে জনপ্রিয় ছিলেন। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মঞ্চস্থ করা নাটক নটী বিনোদিনীর মাধ্যমে ছ’য়ের দশকে সবাই বিস্তারিতভাবে জানতে পারে তাঁর কথা। তারপর ধীরে ধীরে এ পর্যন্ত প্রায় তিনটি চলচ্চিত্র, অনেক যাত্রা ও নাটক হয়েছে তাঁর জীবন ঘিরে।

বিনোদিনীর জীবনের দু’টি বিষয় খুব তাৎপর্যপূর্ণ। বিবেকানন্দের জন্ম হয় যে বছর, সে বছর উত্তর কলকাতায় বিনোদিনীরও জন্ম। আবার রবীন্দ্রনাথ যে বছর মারা যান, সে বছর অর্থাৎ ১৯৪১ সালে বিনোদিনীও মারা যান। তিনি থিয়েটারে আসেন ১২ বছর বয়সে আর অভিনয় জীবন থেকে সরে যান মাত্র ২৩ বছর বয়সে। কিন্তু তিনি মারা যান ৭৮ বছরেরও বেশি বয়সে। এই দীর্ঘ ৫৬ বছর তাঁর কীভাবে কেটেছিল, তা নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাতে কাউকে দেখি না। তাঁর জীবনের আলোকিত অংশ নিয়েই আমরা বেশি উৎসাহী। কিন্তু তাঁর নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ জীবনের কথা মানুষের জানা দরকার।

বিনোদিনী দাসীর জন্ম কলকাতার রেড লাইট এরিয়ায় পতিতার কন্যা রূপে। কিন্তু তাঁকে সে নরকজীবন কাটাতে হয়নি। যেহেতু উচ্চবংশের পরিবারের মহিলাদের মঞ্চে অভিনয় করার অনুমতি ছিল না, তাই থিয়েটার পরিচালকরা পতিতালয় থেকে মহিলাদের অভিনয়ে নিযুক্ত করতেন। এটা সমগ্র ভারতীয় নাট্যকলার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল, যেখানে একমাত্র পতিতারাই নাট্যশিল্পী হতেন। বিনোদিনী ছিলেন এমনই এক অভিনেত্রী। কিন্তু তাঁর ব্যতিক্রমী প্রতিভা তাঁকে সকলের মধ্যে অনন্য করে তুলেছিল। তাঁর সময়ের প্রধান বাঙালি নাট্যশিল্পীদের একজন হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

বিনোদিনী দাসী মাত্র ১২ বছর বয়সে এক নাট্যশিল্পী হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। ২৩ বছর বয়সে অবসর নেওয়ার সময় তিনি বাঙালি নাট্যপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। আজও তিনি স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। একজন গণিকা হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করার পর নটী বিনোদিনীকে কলকাতার জাতীয় থিয়েটারের প্রধান অভিনেত্রী হিসাবে বেছে নেন বাংলা থিয়েটারের কিংবদন্তি গিরীশচন্দ্র ঘোষ। বিনোদিনী স্টার থিয়েটারেও অভিনয় করেছিলেন। মাত্র ১২ বছরের অভিনয় জীবনে তিনি ৮০টিরও বেশি নাটকে অভিনয় করেছিলেন। সেগুলির বেশির ভাগ চরিত্রই পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক। তাঁর অভিনীত বিখ্যাত চরিত্রগুলি মধ্যে রয়েছে সীতা, প্রমীলা, দ্রৌপদী, কৈকেয়ী, কপালকুণ্ডলা, মতিবিবি প্রভৃতি। তাঁর চমৎকার অভিনয় তাঁকে ‍‘তারকা থিয়েটারের চাঁদ’, ‍‘নেটিভ মঞ্চের ফুল’ ইত্যাদি খেতাব এনে দেয়। বিনোদিনী শ্রীচৈতন্যের ভূমিকাতেও অভিনয় করেছিলেন। দর্শকাসনে উপস্থিত শ্রীরামকৃষ্ণের প্রশংসাও পেয়েছিলেন।

নটি বিনোদিনীর কর্মজীবন ভারতীয় থিয়েটারের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের সঙ্গে মিলে যায়। সে সময় ভারতীয় নাটক খোলা আকাশের নীচে অভিনীত হওয়ার ঐতিহ্য থেকে রূপান্তরিত হচ্ছিল এবং ইউরোপীয় রীতির প্রসেনিয়াম থিয়েটারের রূপকে অভিযোজিত করছিল। এছাড়া নটী বিনোদিনী ভারতীয় মেকআপকে ইউরোপীয় রূপের সঙ্গে মিশ্রিত করেছিলেন। থিয়েটারের জন্য মঞ্চের মেকআপকে এক নতুন রূপ দিয়েছিলেন।

অন্য পোস্ট: শিক্ষকরা শ্রেণিশত্রু হয়ে গেলেন

নটি বিনোদিনী তাঁর জীবনের শেষের দিকে একজন কবি ও লেখক হিসাবে প্রতিভার প্রকাশ ঘটান। তিনি এশিয়ার প্রথম দিকের অভিনেত্রীদের একজন, যিনি তাঁর আত্মজীবনী ‍‘আমার কথা’ লিখেছেন। এতে তিনি বাংলা থিয়েটারের সমসাময়িক জগতের বর্ণনা দিয়েছেন এবং একইসঙ্গে সমসাময়িক বাঙালি সমাজের ওপরও আলোকপাত করেছেন। ঐতিহাসিক মূল্য এবং রচনাশৈলীর জন্য আত্মজীবনীটি প্রশংসিত হয়। তিনি আর একটি আত্মজীবনীমূলক রচনা ‍‘আমার অভিনেত্রী জীবন’ লিখতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু তা অসম্পূর্ণ রেখে মারা যান।

নটী বিনোদিনীর জীবনের শেষের দিনগুলি অন্ধকারে ঢাকা ছিল। ১৯০৪ সালে ১৩ বছর বয়সে তাঁর একমাত্র কন্যার মৃত্যু হলে তিনি শোকগ্রস্ত হন। তিনি তাঁর এক বন্ধু রাঙ্গাবাবুর আশ্রয়ে থাকতেন, যিনি ১৯১২ সালে মারা যান। তার পরে বিনোদিনীর অবস্থান সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায়নি। সম্ভবত তিনি সে অঞ্চলে ফিরে যান, যাকে তিনি সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করতেন, যেখানে পতিতারা থাকেন এবং তিনি তাঁর শৈশবের একটি বড় অংশ কাটিয়েছিলেন।

নটী বিনোদিনী ১৯৪১ সালে ৭৮ বছর বয়সে মারা যান। তিনি একদশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর অভিনয় ও গানের প্রতিভায় দর্শকদের মুগ্ধ করে রেখেছিছেন। কিন্তু তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও অখ্যাতির মধ্যে কেটেছিল। অপেক্ষায় আছি, কেউ যদি সে অন্ধকার দিক উন্মোচন করেন।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए