অজয় ভট্টাচার্য

সরকারি স্কুলে গরমের ছুটি পড়ার কথা ছিল ১২ মে এবং খোলার কথা ছিল ২৩ মে। রবিবার বাদে মোট ১১ দিন ছিল গ্রীষ্মাবকাশের ছুটি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকারি নির্দেশে গরমের ছুটি শুরু হয়েছিল ৩০ এপ্রিল এবং ছুটি শেষ হচ্ছে ৩১ মে। ২ জুন ফের স্কুল খুলবে। গত বছরের ছুটির তালিকা অনুযায়ী গ্রীষ্মাবকাশ ছিল ১০ দিনের। কিন্তু বাস্তবে তা কখনওই ১০ বা ১১ দিনে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা বাড়তে বাড়তে মাসাধিক কালে পর্যবসিত হয়। দায়ী করা হয় বিশ্ব উষ্ণায়নজনিত কারণে প্রখর গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহকে। কিন্তু কেন আবহাওয়া বা জলবায়ুর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ছুটির তালিকা প্রস্তুত করা হয় না, তার কোনও সদুত্তর নেই। সেক্ষেত্রে পুজোর ছুটি থেকে বেশকিছু ছুটি বাঁচিয়ে গ্রীষ্মাবকাশে কাজে লাগানো যেত।
এ বছর পুজোর ছুটি বাবদ ২৫ দিন রাখা হয়েছে তালিকায়। মাঝের রবিবারগুলি ধরলে তা প্রায় ২৮ দিনের ধাক্কা। তাই পার্বণের দিনগুলি বাদ দিয়ে পঠনপাঠনের জন্য ক’টা দিন অনায়াসে কাজে লাগানো যেত। বরং সে সময় আবহাওয়া পঠনপাঠনের জন্য বেশ উপযুক্ত থাকে। পুজোর ছুটি থেকে ক’টা দিন বাঁচিয়ে গরমের ছুটিতে কাজে লাগাতে পারলে ফি-বছর বেশকিছু পঠনপাঠন দিবস অকারণে নষ্ট হত না। এমনিতেই নতুন নিয়মে দ্বাদশ শ্রেণির তৃতীয় সেমিস্টারের পরীক্ষা হওয়ার কথা সেপ্টেম্বর মাসে। কিন্তু এভাবে ছুটি চলতে থাকলে তৃতীয় সেমিস্টারের সিলেবাস শেষ হবে কীভাবে, তার কোনও সদুত্তর নেই। গরমের ছুটি এগিয়ে আনার যৌক্তিকতাকে খণ্ডন করতে প্রকৃতিও যেন উঠেপড়ে লেগেছে। ছুটির প্রথম দিনই কালবৈশাখী তার উপস্থিতি জানিয়ে দিয়ে গিয়েছে। তবে অযাচিত এই ছুটির আবহে শিক্ষকরাও বেশ বিপাকে পড়েছেন। তাঁরা হাটেবাজারে, চায়ের দোকানে, যেখানে যাচ্ছেন, সেখানেই একের পর এক প্রশ্নবান ধেয়ে আসছে তাঁদের উদ্দেশ করে। সরকারি আধিকারিকদের হাতের কাছে না পেয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আছড়ে পড়ছে শিক্ষকদের ওপর। অথচ স্কুল বন্ধ রাখার পিছনে তাঁদের কোনও হাত নেই। বরং তাঁরাও এই টানা ছুটির বিরুদ্ধে। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্ত তো তাঁদের মেনে নিতেই হবে।
দীর্ঘ ছুটির বিরুদ্ধে অভিভাবকদের অভিযোগও প্রচুর। লম্বা ছুটি ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় বিমুখ করে তোলে। এমনকী তা শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাছাড়া ছুটির সময় শিক্ষকরা কাজ না করেই বেতন পান। অথচ সাধারণ মানুষ দিনরাত পরিশ্রম করেও সুখের নাগাল খুঁজে পান না। তাই ছুটি দেওয়ার জন্য সরকারের ওপর সাধারণ মানুষের যতটা না ক্ষোভ, তার চেয়ে বেশি ক্ষোভ শিক্ষকদের ওপর। ভাবনাচিন্তার স্তর আর একটু গভীরে নিয়ে গেলে দেখা যাবে, কসবার রাজপথে শিক্ষকের বুকে লাথি উঠে আসাটাও এ জাতীয় ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। আসল কথা হল, রাজনীতি আর দেদার ছুটির পাকচক্রে শিক্ষকরাও বুঝতে পারেননি, শ্রদ্ধার আসন থেকে একটু একটু করে সরতে সরতে তাঁরা কবে কখন শ্রেণিশত্রুর আসনে বসে পড়েছেন!
