Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

গান্ধীজিকে ‘মহাত্মা’ বলায় রবীন্দ্রনাথের ঘোরতর আপত্তি ছিল

গান্ধীজিকে  রবীন্দ্রনাথ 'মহাত্মা' বলেছেন, এরূপ ধারণা বিভান্তিকর হলেও সাধারণ্যে প্রচারলাভ করে। একথা সাধারণ্যেই শুধু ছড়ায়নি, বইপত্রেও প্রকাশিত হয়েছে। অথচ রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজিকে 'মহাত্মা' বলেননি শুধু নয়, তা নিয়ে তাঁকেই রীতিমতো প্রশ্ন করেছেন।

Share Links:

স্বপনকুমার মণ্ডল
প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

গান্ধীজির জীবন বিতর্কে মোড়া। তাঁর মতো জনপ্রিয় নেতা কেউ নেই, বিতর্কেও তাঁর জুড়ি মেলা ভার। তাঁর ঘটনাবহুল দীর্ঘ জীবন ইতিহাস রঞ্জিত ঘটনাপ্রবাহে ভরা। সত্য ও অহিংসার ব্রতে আজীবন স্বনিয়ন্ত্রিত পথে হেঁটেছেন বলেই পাহাড়প্রমাণ ভুলের কথা স্বীকার করেও ‘আমার জীবনই আমার বাণী’কে মূর্ত করে তুলেছেন। সেখানে তাঁর অহিংস নীতি বিশ্ববন্দিত হলেও সাধারণ্যে ‘গান্ধীগিরি’তে রসিকতা নেমে এসেছে।

শুধু তাই নয়, গান্ধীজির সংগ্রামী জীবনেও অহিংস নীতির সহিংস প্রকৃতি বর্তমান। ১৯২১ সালে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে গান্ধীজি স্বরাজ এনে দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশনে তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন, ‘যদি আমার আহ্বানে তোমরা সাড়া দাও, আমি প্রতিজ্ঞা করছি এক বছরের মধ্যেই তোমরা স্বরাজ লাভ করতে পারবে।’ গান্ধীজি তাঁর  প্রতিজ্ঞা পূরণ করতে পারেননি, ২১ বছর পরে তা আদায় করতেই সহিংস আন্দোলনের ডাক দেন। ১৯৪২-এর আগস্টে ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’র ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন আজ ইতিহাস। অন্যদিকে তাঁকে নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নানাভাবেই মুখর। সেখানে রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, আম্বেদকর, যোগেন মণ্ডল, কে নেই! তারপরেও তিনি অবিসংবাদী জাতির জনক, অহিংসার মূর্তপ্রতীক। তাঁর চরকায় ভারত জেগে ওঠে, তাঁর চশমতাতেই স্বচ্ছ ভারত উঠে আসে। আবার তাঁর বিপুল গ্রহণযোগ্যতাই বিতর্ককে আমন্ত্রণ জানায়, তাঁর মহান আত্মত্যাগও প্রশ্নকে জিজ্ঞাসা করে তোলে। শুধু তাই নয়, বিতর্কের নানা পরতে তাঁর ‘মহাত্মা’ও প্রশ্নের সামনে এসে দাঁড়ায়।

আসলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূল্যায়ন নিয়ে উচ্চকিত ধারণাই অজান্তে আমাদের প্রশ্নহীন আনুগত্যের শিকার করে তোলে। সেখানে রবীন্দ্রনাথের শংসায় জনপ্রিয়তা লাভের সৌরভ শুধু বিমোহিত করে না, বিভ্রান্তিও ছড়ায়। এরকমই একটি বিভ্রান্তি গান্ধীজিকে নিয়েও প্রবহমান। তাঁকে  রবীন্দ্রনাথ ‘মহাত্মা’ বলেছেন, এরূপ ধারণা বিভান্তিকর হলেও সাধারণ্যে প্রচারলাভ করে। একথা সাধারণ্যেই শুধু ছড়ায়নি, বইপত্রেও প্রকাশিত হয়েছে। অথচ রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজিকে ‘মহাত্মা’ বলেননি শুধু নয়, তা নিয়ে তাঁকেই রীতিমতো প্রশ্ন করেছেন।

অন্য পোস্ট: স্টিফেন হকিং-এর আবিষ্কার

অসহযোগ আন্দোলনের সময় গান্ধীজি রবীন্দ্রনাথের সমর্থন নিতে কলকাতায় এসেছিলেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত হবে না, এই শর্তে জোড়াসাঁকোর বিচিত্রা ভবনের দোতলায় তাঁদের সেই আলোচনা চলে ঘণ্টাচারেক। ওই আলোচনাতেই রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজিকে প্রসঙ্গক্রমে সরাসরি প্রশ্ন করেন, ‘কিন্তু আপনি কি মহাত্মা?’ বেশকিছু কাল পরে রবীন্দ্রনাথ সেই  অপ্রকাশ্যে থাকা সাক্ষাৎকারের কথা তাঁর প্রতিষ্ঠিত শ্রীনিকেতনের রূপকার লেনার্ড এলমহার্স্টকে জানিয়েছিলেন। এলমহার্স্টের দিনলিপিতে লেখা সেই সাক্ষাৎকারের বিবরণ তাঁর ‘Poet and Plowman’ (সেপ্টেম্বর ১৯৭৫) বইটিতে প্রকাশিত হয়। বইটি বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত। সেখানে গান্ধীজির দেশের জনগণের প্রতিমা বা প্রতীক হিসাবে দেওয়া ‘মহাত্মা’র কথা শুনে যে রবীন্দ্রনাথ সন্তুষ্ট হননি, তা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট। তাঁর কথায়, ‘গান্ধীজি, আপনার দেশবাসীর সম্পর্কে এমন ধারণা কি সম্মানজনক? একে কি সৎ বলা যাবে?’ অথচ জনমানসে রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজিকে ‘মহাত্মা’ বলেছেন বলে পূর্বের ধারণা এখনও  প্রবহমান। এজন্য সত্যকে শুধু মেনে নেওয়াই নয়, প্রকাশের মাধ্যমে তা যাতে আর না ছড়ায়, সেদিকেও দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গান্ধীজির তিক্ততাও কম হয়নি। অথচ দু’জনের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাও কম ছিল না। একজন নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত সাহিত্যিক, অন্যজন দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের ত্রাতা হিসাবে বরণীয়। মত ও পথে দু’জনই স্বতন্ত্র পথিক। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনা গান্ধীজির মনে ধরেনি। আবার গান্ধীজির আন্দোলনের প্রকৃতি রবীন্দ্রনাথের সমর্থন পায়নি। অথচ তারপরেও দু’জনের মধ্যে শ্রদ্ধার সম্পর্ক আজীবন ছিল।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীর দায়িত্ব গান্ধীজির ওপরেই ন্যস্ত করতে চেয়েছিলেন। আসলে গান্ধীজির ভাবমূর্তি যতই বিতর্কিত হোক, তাঁর জীবনাদর্শই তাঁকে মূর্তি থেকে প্রতিমায় পরিণত করেছে। সেখানে তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বিতর্কের অবকাশ তৈরি করলেও সত্য ও অহিংসার যাপিত জীবনাদর্শে কটিবস্ত্রেই তিনি কোটি কোটি মানুষের পথচলার অগ্রদূত, অকুতোভয় জীবনবিভূতি।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए