Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

বেলডাঙার কার্তিক লড়াই

Share Links:

অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার অন্যতম প্রাচীন উৎসব কার্তিক পুজো। কার্তিক মাসের সংক্রান্তিতে কার্তিক পুজো করা হয়। পৌরাণিক মতে, কার্তিক দেবতাদের সেনাপতি। কার্তিক অপরূপ দর্শন দেবতা। রূপ, সৌন্দর্য ও যৌবনের প্রতীক।

এই পুজো উপলক্ষে বেলডাঙার মানুষ খুবই উৎসাহিত। বিশেষ করে কার্তিক পুজোর দ্বিতীয় দিন চলে বিসর্জনের শোভাযাত্রা। এই শোভাযাত্রাকে বলে ‘কার্তিক লড়াই’। কার্তিক লড়াই কিন্তু কোনও ঝগড়া নয়। কার্তিক লড়াই হল কার্তিক ঠাকুরের বিসর্জনের শোভাযাত্রা, যেমন দেখা যায় দুর্গাপ্রতিমা নিয়ে, কালীপ্রতিমা, জগদ্ধাত্রী বিসর্জনের শোভাযাত্রা কিংবা নবদ্বীপ বা শান্তিপুরের ভাঙা রাসের শোভাযাত্রায়।

বেলডাঙার কার্তিক লড়াই ১০০ বছরের বেশি প্রাচীন। অতীতে বেলডাঙায় কার্তিক ঠাকুরের বহু পুজো হত। পরের দিন শোভাযাত্রা করে বিসর্জন দেওয়া হত। কার্তিক লড়াই দেখার জন্য বেলডাঙা-সহ আশপাশের সাধারণ মানুষের ঢল নামে।

একসময় বেলডাঙায় ঘরে ঘরে কার্তিক পুজো করা হত। মহিলারা সন্তানলাভের জন্য কার্তিক ব্রত করতেন। বিভিন্ন ভঙ্গিমার কার্তিক প্রতিমা তৈরি করা হত। তার মধ্যে তিনটি কার্তিক বিশেষ উল্লেখযোগ্য। হোড় বংশীয় জমিদারদের রাজকার্তিক, বেনেপাড়ার বাবু কার্তিক, আর ছিল ছুতোর পাড়ার হাতি কার্তিক। রাজকার্তিকের চালিতে আটটি মূর্তি থাকত। উপরে দু’পাশে দু’টি পরিমূর্তি, মাঝের সারিতে রাজবেশে তিনটি ধনুর্ধর কার্তিক মূর্তি থাকত। তার মধ্যে মাঝেরটি আকৃতিতে অন্য দু’টির চেয়ে  বড়। আর নীচের সারিতে থাকত দু’পাশে দুটো ছুটন্ত  ঘোড়সওয়ার সেনা। আর তার মধ্যস্থলে সশস্ত্র দারোয়ান মূর্তি। এই রাজকার্তিক এখন আর দেখা যায় না। বাবু কার্তিক প্রতিমাটি বিশালাকৃতি। বাবু কার্তিক সম্ভবত উনিশ শতকের কলকাতার বাবু কালচারের প্রতিভূ। মাথায় লম্বা চুল, সৌখিন গোঁফ,  দু’গালে লম্বা জুলফি, ঊর্ধ্বাঙ্গে কোঁচানো উত্তরীয় বুকের উপর পর্যন্ত ঝোলানো, হাতে তির-ধনুক। আর তৃতীয় হল ছুতোর পাড়ার হাতি কার্তিক মূর্তি। ময়ূর নিয়ে হাতির পিঠে সওয়ার হয়ে  কার্তিক যেন যুদ্ধে চলেছেন।

অন্য পোস্ট: দেবসেনাপতি খেলনা বা ফেলনা নয়

বর্তমানে বেলডাঙার কার্তিক পুজোয় এসেছে বড় পরিবর্তন। একসময় শুধু কার্তিকের পুজো-অর্চনা করা হত বেলডাঙার ঘরে ঘরে। এখন অনেক জায়গায় কার্তিকের ছাড়াও থাকছে অন্যান্য দেবতার মূর্তি। তার মধ্যে অন্যতম দেবাদিদেব মহাদেব বা শিবঠাকুর। তাছাড়া থাকছে যুদ্ধং দেহি দেবী দুর্গা, কালী আর কৃষ্ণ, গণেশ, শ্রীচৈতন্যের মূর্তি। তার মধ্যে বিভিন্ন ভঙ্গিমার বিশালাকৃতির শিবের মূর্তি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বুড়ো শিব খুবই জনপ্রিয়। কার্তিক লড়াইয়ের এই শোভাযাত্রায় বিশালাকৃতির বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি সমেত কাঠামো কাঁধে নিয়ে পথ পরিক্রমা করা হয়। মূর্তি বাঁশের তৈরি মাচার উপর রেখে তা কাঁধে নিয়ে শোভাযাত্রায় ছুটতে থাকার দৃশ্য দর্শকদের কাছে খুবই আকর্ষনীয়। এভাবে দুপুরের পর থেকে বিভিন্ন বারোয়ারি পুজোর উদ্যোক্তারা কার্তিক লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেন।

ছ’য়ের দশকের পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা জেলার একটি হিন্দু অধুষ্যিত গ্রাম পাইকসা, যা বর্তমানে নরসিংদী জেলার অধীনে, সেখানকার হিন্দুদের বাড়িতে বাড়িতে কার্তিক পুজোর প্রচলন ছিল। ওইদিন সকাল থেকেই সাজো সাজো রব। কার্তিক পুজোয় ওই গ্রামে একটি প্রথা ছিল। এমন একটি জিওল (ওই গ্রামের ভাষায় কাফিলা গাছ)  গাছের ডাল কাটা হত, যার মাথায় তিনটি শাখা থাকত। সেই তিনটি শাখায় খড় বেঁধে জঙ্গল থেকে মশা-মাছি ধরে খড়ের মধ্যে দেওয়া হত। তারপর সন্ধ্যায় পাড়ার ছেলেরা তাতে আগুন ধরিয়ে গ্রামের কোনও একটি ধানের জমির পাশে জমায়েত হতেন এবং সেখানে গোটা গ্রামের মানুষ মশালের আলোয় আনন্দ করতেন। মশা-মাছি মশালের সঙ্গে জ্বালানোর অর্থ পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন করা। তারপর রাতে বাড়িতে বাড়িতে কার্তিক পুজো অনুষ্ঠিত হত মহাধুমধামে।

3 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Arpan
Arpan
1 year ago

❤️

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए