শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়
দিন যত পেরোচ্ছে, দেবসেনাপতি কার্তিককে নিয়ে ততই খেলনার মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। সদ্য বিবাহিত থেকে নিঃসন্তান দম্পতির ঘরে রাতের অন্ধকারে শব্দবাজি ফাটিয়ে, খাবারের মেনু দিয়ে কার্তিক ঠাকুর রেখে আসছেন একধরনের হুজুগে মানুষ। কার্তিক ঠাকুরকে দরজায় পেয়ে ছুঁচোগেলা অবস্থা হচ্ছে ওইসব দম্পতির পরিবারের। অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ছে। অর্থের অভাব সত্ত্বেও ধারদেনা করে পুজোর আয়োজন থেকে ভোজন, সব করতে হচ্ছে। কোনও কোনও দম্পতির পরিবার দরজায় ফেলে যাওয়া কার্তিক ঠাকুরকে কাছেপিঠের কোনও গাছের তলায় ফেলে দিয়ে আসছে। কোনও কোনও পরিবারে নিঃসন্তান দম্পতির ওপর নেমে আসছে কটাক্ষ, কটূক্তি, গঞ্জনা।
প্রবল পরাক্রমশালী দেবতা দেবসেনাপতি কার্তিককে নিয়ে কিছু উটকো ছোকরা অবহেলা এবং ঠাট্টা-তামাশার বস্তু মনে করে খেলা করছেন। নিঃসন্তান পরিবারে কার্তিক ঠাকুর দিলে সন্তান হয়, এ ধারণা কুসংস্কার ছাড়া আর কিছু নয়। সমাজে দিন দিন অশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বলেই কুসংস্কার বেশি করে আশ্রয় এবং প্রশ্রয় পাচ্ছে।
ভারতীয় প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে, কার্তিকেয় বা স্কন্দের বিক্রম ও অমিত বল দেবতাদের কাছেও একসময় অসহ্য ছিল। দেবরাজ ইন্দ্র পর্যন্ত তাঁর বীরত্বের কাছে অসহায় ছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র সদলবলে স্কন্দকে পরাজিত করতে অগ্রসর হন এবং স্কন্দের মুখ থেকে নির্গত অগ্নিশিখায় দেবরাজের সৈন্যসামন্ত পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ইন্দ্র বজ্র নিক্ষেপ করলে কার্তিকেয়র দক্ষিণ পাশ বিদীর্ণ হয়ে বিশাখের জন্ম হয়।
কার্তিকের অন্য নাম বিশাখ। তিনি দক্ষকন্যা স্বাহাকে মনে মনে চাইতেন। সপ্তর্ষির অপরূপা পত্নীদের দেখে অগ্নি কোনও সময় কামাতুর হন। স্বাহা তা বুঝতে পেরে মহর্ষি অঙ্গিরার স্ত্রী শিবার রূপ ধরে অগ্নির কাছে গিয়ে দৈহিক সম্পর্কে মিলিত হন। কিন্তু অগ্নির শুক্র গরুড়পক্ষিনী নিয়ে গিয়ে কাঞ্চনকুণ্ডে ফেলে দেয়। স্বাহা নাছোড় হয়ে বশিষ্ঠ ছাড়া সপ্তর্ষির বাকিদের পত্নীর রূপ ধরে অগ্নির সঙ্গে মিলিত হতে থাকেন। ষষ্ঠবার কাঞ্চনকুণ্ডে শুক্র নিক্ষিপ্ত হলে সম্মিলিত ছ’টি শুক্র থেকে স্কন্দ অর্থাৎ কার্তিকেয়র জন্ম হয়। কার্তিকেয়র জন্মের সঙ্গে সঙ্গে সপ্তর্ষি তাঁদের পত্নীদের ত্যাগ করেন। রুদ্রের অপর নাম অগ্নি। তাই কার্তিকেয়র বাবা শিব এবং অগ্নি নামেই শাস্ত্রে উল্লেখিত আছে। জন্মানোর সময় কার্ত্তিকেয়র ছ’টি মস্তক, একটি গ্রীবা এবং একটি উদর ছিল।
এছাড়াও কার্তিকেয়র জন্ম নিয়ে শাস্ত্রে বহু মত আছে। কার্তিকেয় দেবসেনাপতি ছিলেন। কিন্তু অবাক হতে হয়, সেই প্রবল বিক্রমশালী দেবতা কার্তিককে নিয়ে হেলাফেলা করা হয়। কার্তিকের প্রতিমা বিসর্জন না দিয়ে উপেক্ষায় গাছতলায় নামিয়ে রেখে আসা হয়। বিধর্মীরা হিন্দু দেবদেবীদের অমান্য করার টোটকা বের করলেন। আর হিন্দুদের একটি অংশ সেই টোটকাকে লুফে নিয়ে হিন্দু দেবতা কার্তিককে নিয়ে রসিকতা শুরু করলেন।
বিশিষ্ট শাস্ত্রবিদ ও পুরোহিত পিনাকীশংকর চক্রবর্তী এ বিষয়ে জানিয়েছেন, ‘ভক্তিমতি মা-বাবাদের প্রতি আবেদন, আমরা কেউ শিব বা দুর্গা নই। কার্তিক আমাদের পুত্র নয়। অযথা গাছের তলায় রোদ-বৃষ্টিতে বিবর্ণ অবস্থায় কার্তিক ঠাকুরকে রাখবেন না। জলে বিসর্জন দিন। এটাই শাস্ত্রীয় রীতি। ব্রাহ্মণদের প্রতি অনুরোধ, যজমানকে সঠিক করণীয় জানান।’
বিশিষ্ট শিক্ষক এবং সমাজসেবী মৈনাক অধিকারীর মত, ‘কার্তিক ফেলা আর বনে আগুন লাগানোর মেন্টালিটি একই।’ বিশিষ্ট শাস্ত্র প্রণেতা পণ্ডিত অশোককুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর একটি গ্রন্থে লিখেছেন, ‘রাতে একবারই পুজো, স্তোত্রপাঠ, ভোগ, হোম, আরতি করে ওইদিনই শেষ করবেন। পরদিন অন্যান্য প্রতিমার মতো বিসর্জন দেবেন।’
দেবসেনাপতি কার্তিকের পুজো নিয়ে সমাজে ঠাট্টা-তামাশা বন্ধ হোক। হিন্দু সনাতন ধর্ম মানুন। দেবসেনাপতি কার্তিক খেলনা বা ফেলনা নয়।

