শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

স্বাধীনতার আগে খড়ের ছাউনির ঘর হোক বা দালান ঘর, সেগুলির দরজার কবাট ছিল শক্তপোক্ত। অতীতে গোটা দরজাকে বলা হত চৌকাঠ। চারটি কাঠের দণ্ড দিয়ে তৈরি কমবেশি ছ’ফুটের আয়তাকার চৌকাঠকে বলা হত দরজা (ফ্রেম)। এখন দরজায় চৌকাঠ থাকে না। হারিয়ে যাচ্ছে অতীতের চৌকাঠ। এর নীচের অংশ, যাকে থ্রেশহোল্ড বা সিল বলা হয়, তা এখনকার তৈরি দরজায় থাকে না। বর্তমানে দরজায় উপরের হেড, পাশের দু’টি খাড়া অংশ বা সাইড জ্যাম্ব থাকে। দরজার কবাটও হয়ে গিয়েছে আধুনিক। শক্তপোক্তর বালাই নেই।
অতীতে দরজার কবাট বা পাল্লা (শাটার) একটি পাটা দিয়েই হত। দু’টি পাল্লার জন্য দু’টি পাটার প্রয়োজন হত।পাটার উপর শক্ত কাঠের রেল বা বাতা দিয়ে মজবুত পাল্লা নির্মাণ করা হত। চৌকাঠের সঙ্গে পাল্লা দু’টি লাগানো হত ঢেঁকিকল দিয়ে। ঢেঁকিকলের পরিবর্তে বর্তমানে কবজার ব্যবহার হয়। দরজার পাল্লায় শিকল, লোহা বা পিতলের কড়া, দরজায় পাল্লা আটকানোর জন্য হুড়কা বা কাঠের ছিটকিনি থাকত। বর্তমান নতুন প্রজন্মের কাছে দরজার পাল্লায় কড়া, শিকল, হুড়কা, ঢেঁকিকল হারিয়ে গিয়েছে। এখন তো ঘরের কবাট নকশা আঁকা চিত্রিত, কিন্তু ভীষণ হালকা ও পলকা। বর্তমানে পাল্লার মাঝখানে টুকরো টুকরো কাঠ জুড়ে ফ্যান্সি প্যানেলের নির্মাণ হয়। প্যানেল কাচেরও হচ্ছে। চুরি-ডাকাতির ভয়ে এই পলকা প্যানেল অতীতের গৃহস্থ মানুষ কল্পনাও করতে পারতেন না।
সে সময় দরজার কবাটে ছিটকিনি আঁটতে ‘হুড়কো’ বা ‘হুড়কা’ ব্যবহৃত হত। ছিটকিনিকে খিল বলা হত। হুড়কো এখনও গ্রামে গেলে কিছু ঘরে দেখা মেলে। হুড়কো বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। দু’টি শক্ত কাঠের কবাটের ঠিক মাঝখানে পাল্লার একপাশে হুড়কা থাকত। একটি কবাটে হুড়কো কাঠের উঁচু বাটামের ছিদ্রে লেগে থাকত। অপর কবাটের বাটামে হুড়কোর মাপে ছিদ্র করা থাকত। কবাট বন্ধ করে হুড়কোটি টেনে অন্যদিকের ছিদ্রে ঢুকিয়ে দেওয়া হত।
পুরোনো আমলে মাটির ঘরের দরজার পাল্লা বন্ধ করে মোটা বাঁশ বা মোটা কাঠের ছিটকিনি ব্যবহার চলত। এগুলিকে বলা হত হুড়কো ডাং। মাটির দেওয়ালে দরজার উপরের দিকে গর্ত থাকত। হুড়কো ডাংয়ের দুই প্রান্ত ওই গর্তগুলিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হত। বর্তমানে হুড়কো ডাংয়ের ব্যবহার রয়েছে। বহু আধুনিক ঘরেও চৌকাঠের খাড়া দণ্ডে ‘দ’ আকারের ক্ল্যাম্প বসিয়ে তাতে হুড়কো ডাং এঁটে দেওয়া হয়। দরজার কবাটে হাতল, নব, কত কিছুর আধুনিক ব্যবস্থা থাকলেও অতীতের সেই চৌকাঠ ও পাল্লার কড়া-শিকল বিলুপ্ত হয়েছে।
তবে এখনও কয়েকজন মানুষ তাঁদের আধুনিক ঘরের পাল্লাতেও অতীতের ছিটকিনি, হুড়কো রেখে দিয়েছেন। সারেঙ্গা ব্লকের বীরভানপুরে অশোককুমার ধর তাঁর ঘরে আজও পুরোনো দিনের চৌকাঠ, পাল্লা স্মৃতি হিসাবে রেখে দিয়েছেন।
অতীতে ঘরের ভিতরে আলমারি, সোফা সেট, ডিভান থাকত না। থাকলেও খুব কম ঘরেই। জমিদার বাড়িতে হয়তো থাকত। প্রত্যন্ত গ্রামবাংলার মানুষ মেঝেতে চাটাই, তালাই, মাদুর, চট, শতরঞ্জির উপর কাঁথা বিছিয়ে শুয়ে ঘুমোতেন। শীতকালে কনকনে ঠান্ডায় বিছানায় গায়ে দিতেন কম্বল বা কাঁথা। গত শতকের পাঁচের দশকের আগে অবস্থাপন্ন ঘরে তুলোর লেপ ঢুকতে শুরু করে। অতীতে বাড়িতে মাসি-পিসি-দিদিরা ঘরে এলে একটি কাঁথা তৈরি করে দিয়ে যেতেন। (চলবে)

