Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

পরকীয়া প্রেম নিকষিত হেম! (শেষ পর্ব)

পরকীয়া সংক্রান্ত রায়দানের মাধ্যমে আসলে আদালত বলতে চেয়েছে, ওহে মানুষ, তোমরা প্রাপ্তবয়স্ক, বুদ্ধিদীপ্ত। তোমরা বুঝে নাও, কী করবে। আইন ব্যক্তিগত বিষয়ে মাথা গলাবে না। কাউকে শাস্তিও দেবে না। তোমরা স্থির করো, চিরকাল উদভ্রান্ত পলাতক বালক বা বালিকার মতো ছুটে বেড়াবে, নাকি শান্তির নীড় খুঁজবে। তোমরা নীল আকাশে ভেসে বেড়ানোর দুরন্ত বাসনায় লাফ দেবে, দিয়ে আছাড় খাবে, নাকি স্বাভাবিক মানুষের মতো বিচরণ করবে তোমাদের লোকায়তে। লোকোত্তরে যাওয়ার বাসনা না হয় মনেই থাক। মানসপ্রতিমা ভেসে বেড়াক আকাশে আকাশে।

Share Links:

সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

পুরোনো আইনটির পক্ষ সমর্থনে যা ছিল, তা হল, ‘পরকীয়া অপরাধ’, কারণ তা বিবাহ প্রতিষ্ঠানটির পবিত্রতাকে ধাক্কা দেয়, প্রথাসিদ্ধ সমাজ কাঠামোর স্থিতাবস্থাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে। বিস্ময়ের হলেও ইতিবাচক যে, এসব সম্ভাবনার কথা বারবার রায়ে উল্লেখ করা হলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলিকে একপ্রকার খারিজ করে কেবল তিনটি সাংবিধানিক ধারা মানার তাগিদেই সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে।

আগেই লিখেছি, আলোচ্য রায়টি পড়ে মনে হয়েছে যে, প্রেম ও প্রেমজনিত প্রয়োজনকে একপ্রকার মৌলিক প্রয়োজন হিসাবে মান্যতা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ‘পরকীয়া’ সম্পর্ক প্রেম হিসাবে, সাংবিধানিকভাবে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার যেভাবে বুঝে পেল, তা অভিনন্দনযোগ্য। কিন্তু ‘বিবাহ’ কি পারবে কোনওদিন রাষ্ট্রের শ্যেন দৃষ্টি উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার বুঝে নিতে? সম্ভবত না। সাংবিধানিকভাবে সম্পত্তির অধিকার বিবাহ সুনিশ্চিত করেছে, করে নেয়, নেবেও। তবে সম্পত্তির অধিকার দাম্পত্য ‘সম্পর্ক’কে কতটা স্বস্তি দেয়, তা খুব সহজবোধ্য নয়। সম্ভবত ‘সম্পত্তির ব্যক্তি মালিকানা’ ও ‘ব্যক্তির প্রকৃত স্বাধীনতা’ সমানুপাতিক হারে এগোয় না।

সংবিধানের ৪৯৭ ধারাটি আংশিকভাবে নয়, সামগ্রিকভাবে এই রায়ে আলোচিত। অর্থাৎ ধারা ৪৯৭ আর এদেশে প্রযোজ্য নয় বলে সুপ্রিম কোর্ট মত দিয়েছে, ‘পরকীয়া’ আর অপরাধ নয়। ভারতে প্রচলিত ব্রিটিশ জমানার আইনের জায়গায় নয়া ভারতীয় ন্যায় সংহিতা আইন চালু হয়েছে। তাতেও ‘পরকীয়া’ আর অপরাধ নয়।

আইনরক্ষকদের কিছু বাধ্যবাধকতা আছে। বিচার বিভাগের দায় আছে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে সংরক্ষণ করার। সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর রক্ষী হিসাবে সুপ্রিম কোর্ট তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন এর বাইরে গিয়ে মনস্তত্বের ভিত্তিতে দেখব, পরকীয়ার প্রকৃতি কী।

পরকীয়ার আহ্বান আদৌ কেন? সুখে থাকতে ভূতে কিলোনো নয় কি সেটা? একটা কথা কখনওই বিস্মৃত হলে চলবে না, আমরা বাইরের বস্তুজগৎকে যতটা চিনি (যদিও খুব সামান্যই চিনি), আমাদের মনের জগৎকে তার অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ চিনি। রবীন্দ্রনাথের কথায়, “আপনার পানে চাই কোনো পরিচয় নাই।” মনের ভিতরে আলাদা ব্রহ্মাণ্ড আছে। আমরা এটুকু বুঝি, আমাদের মনোলোকের ভিতরটা দুর্গম, গভীর, গোপন ও ভয়ংকর রকমের জটিল। মনস্তাত্ত্বিক আলোচনায় যাওয়ার আগে কিছু সহজবোধ্য বিষয় খোলসা করা ভালো। যৌনতা কোনও অপরাধ নয়, নতুবা স্বীকার করতে হয়, আমরা সবাই অপরাধের সন্তান। অসুস্থ স্ত্রী বা স্বামী অপরকে যৌনসুখ দিতে পারে না, এও একরকমের ক্ষুধা। সেটা না মেটালে বিকৃতি আসতে বাধ্য। আর সেটা রুখতে গেলে যদি কেউ পরনারী বা পরপুরুষের সঙ্গে যৌনতায় লিপ্ত হয়, তবে ঠিক কী কারণে সেটা অপরাধ হতে পারে? সুপ্রিম কোর্ট এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছে। আরও আছে। যৌনসুখের অনুভূতি আপেক্ষিক। একজন স্ত্রীকে তাঁর স্বামী সেই স্ত্রীর অনুভূতিসাপেক্ষে তাঁকে পূর্ণ তৃপ্তি দিলেও স্বামী পূর্ণ তৃপ্তি নাও পেতে পারেন এবং একই ঘটনা অন্যদিকেও ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রেও পরনারী বা পরপুরুষে উপগত হওয়াকে অপরাধ বলা যাবে কি?

অন্য পোস্ট: হর দাদুর মাছ ধরা

প্রেমের পরিণতি যে বিবাহ, সেটা তো মানুষের সৃষ্টি করা, যদিও তার অনেক বাস্তব আবশ্যিকতা আছে। তবু তা কৃত্রিম। আবার প্রেম যখন বিবাহে পরিণত হয়, তখন প্রেম উধাও হয়। সাংসারিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের বোঝা বইতে গিয়ে কখন যে যৌবনের স্বর্ণশিখামণ্ডিত মুহূর্ত অতিবাহিত হয়ে যায়, তা উভয়ই বুঝতে পারেন না। সত্যিকারের প্রেমানুভূতি ঝড়ের মতো ‘সে যে হায় হেসে চলে যায় জোয়ার জলে ভাসিয়ে ভেলা।’ তখন মনের বীণায় ছন্দ জাগে বসন্ত পঞ্চমের রাগে। আমার মনের ভুবনে আলো ফেলবে কোন সূর্য বা চাঁদ, তা আমি জানি না। আমি কি মনের দরজায় প্রহরী বসাব? সবাই খোঁজে সেই মানুষকে, যার কাছে মনে হয়, ‘তাহাতে ক্ষতি কার, দু’কথা বলি যদি কাছে তার?’ ‘সে যে ব্যথিত হৃদয় আছে লুকায়ে তমালকুঞ্জ পথে বনের ছায়াতে।’ তাপহরা, তৃষাহরা সঙ্গসুধা সবাই চায়। কিন্তু যেখানে এই অনুভূতি থাকে না, আমাদের মতে, তা পরকীয়ার আলোকোজ্জ্বল দিক দেখায় না। সেটা নিছক কার্নাল প্লেজার ছাড়া কিছু নয়। কাজেই তাকে পরকীয়া প্রেম নিকষিত হেম বলা যায় না। চণ্ডীদাস তাই বলেছেন, ‘কামগন্ধ নাহি তায়।’ তবে সেটা অপরাধও নয়, অপ্রয়োজনীয়ও নয়।

উত্তুঙ্গ, উদ্বেল প্রেম মানুষকে থিতু হতে দেয় না, যেটা অপরিহার্য। জৈবিক প্রয়োজন মেটাতে হয় তাকে, অশনবসন, নিরাপদ আশ্রয়, সহ-নাগরিকদের আক্রমণ ও প্রকৃতির রোষ থেকে প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্যরক্ষা, ভবিষ্যতের সংস্থান, সন্তান প্রতিপালন, এতকিছু উড়ুক্কু প্রেম দিতে পারে না। সেই উদাত্ত প্রেম থাকে আমাদের মানসলোকে, কিন্তু সেই অনুভূতির পরশ থাকবে না স্বাভাবিক মানুষের মননে, চিন্তায়, হোক তা অধরা, অসম্ভব? পরকীয়া এই শর্ত মেটাতে পারলে তবেই তাকে স্বাগত এবং সেটা খাঁটি সোনা।

আমার দেখা প্রতি চারটি পরিবারের একটি পরিবারে পরকীয়া প্রেম আছে। অর্থাৎ ২৫ শতাংশ। যদি কম করে ধরি, তবে সেটা ২০ শতাংশ। মনে মনে পুরুষ বহুগামী আর নারী বহুগামীনী। প্রতিটি দেশ এ বিষয়টি আছে। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে এটা জোর দিয়ে বলা যায় যে, তাঁর সঙ্গে কাদম্বরী দেবীর কোনও শারীরিক সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু একটি সূক্ষ্ম বৌদ্ধিক সম্পর্ক, এক অপ্রকাশযোগ্য অশরীরি শিহরণ, আবার শরীর পুরোপুরি বাদ দিয়েও নয়, ছিল না কি? সারা জীবনে বহু কবিতা, গানে তিনি প্রকাশ করেছেন সেই অব্যক্তকে। আকাঙ্ক্ষার সেই চির অচরিতার্থতাই সাফল্যের চাবিকাঠি। সনাতনী সম্ভাবনার বৃত্তে তার সঞ্চরণ।

আসলে আদালত বলতে চেয়েছে, ওহে মানুষ, তোমরা প্রাপ্তবয়স্ক, বুদ্ধিদীপ্ত। তোমরা বুঝে নাও, কী করবে। আইন ব্যক্তিগত বিষয়ে মাথা গলাবে না। কাউকে শাস্তিও দেবে না। তোমরা স্থির করো, চিরকাল উদভ্রান্ত পলাতক বালক বা বালিকার মতো ছুটে বেড়াবে, নাকি শান্তির নীড় খুঁজবে। তোমরা নীল আকাশে ভেসে বেড়ানোর দুরন্ত বাসনায় লাফ দেবে, দিয়ে আছাড় খাবে, নাকি স্বাভাবিক মানুষের মতো বিচরণ করবে তোমাদের লোকায়তে। লোকোত্তরে যাওয়ার বাসনা না হয় মনেই থাক। মানসপ্রতিমা ভেসে বেড়াক আকাশে আকাশে।

4 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए