Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

অম্বুবাচি: প্রকৃতি থেকে সংস্কৃতির যাত্রাপথে

Share Links:

রাহুল মুখার্জি
গবেষক

রাজকুমার মোদক
প্রফেসর, দর্শন বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

প্রবাদ বা প্রবচন কোনও ভাষার কৌলীন্যকেই শুধু প্রমাণ করে না, পাশাপাশি মানুষের জীবনশৈলীকেও তুলে ধরে। তাই তো সুদীর্ঘকাল ধরে বহমান প্রবাদ বা প্রবচনগুলি কখনওই ম্লান হয়ে যায় না। এরকমই বাংলা ভাষার অন্যতম প্রবাদ হল, ‘কীসের বার, কীসের তিথি, ৭ই আষাঢ় অম্বুবাচি’।

অম্বুবাচি বাংলা তথা অঙ্গ, বঙ্গ ও কলিঙ্গের এমন একটি পালনীয় ব্রত তথা পার্বণ বা উৎসব, যা অন্যান্য পালনীয় ব্রত তথা পার্বণ বা উৎসব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আর আলাদা এ কারণে যে, এখানে ধরিত্রী রন্ধ্রে রন্ধ্রে জীবন্ত মা তো হয়েই উঠেছেন, পাশাপাশি মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান মাধ্যম কৃষিকাজের সঙ্গে তাঁর সবিশেষ শারীরিক পরিবর্তনকে এমনভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা প্রকৃতিকে সংরক্ষণের হাতিয়ার রূপে বাংলা তথা ভারতীয় সংস্কৃতির এক অনন্য রূপ হয়ে দেখা দিয়েছে। এ প্রবন্ধে অম্বুবাচি নামক মহান ব্রতের পরিচয় এবং আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এর গুরুত্ব আলোচনা করা হবে।

বুৎপত্তিগত দিক থেকে ‘অম্বুবাচি’ শব্দটি সংস্কৃত ‘অম্বু’ (জল) এবং ‘বাচি’ (বৃদ্ধি বা প্রবৃত্তি) থেকে এসেছে। তার অর্থ জলের বৃদ্ধি, যা কিনা বর্ষা ঋতুর আগমনকেই সূচিত করে। রঘুনন্দন ভট্টাচার্য তাঁর ‘অষ্টবিংশতিতত্ত্ব’ নামক গ্রন্থে অম্বুবাচি ও তার স্থিতিকাল নিয়ে পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘যস্মিন বারে সহস্রাংশু যতকালে মিথুনং ব্রজেত। অম্বুবাচি ভবেন্নিতং পুনঃস্থকাল-বারয়ঃ।।’ অর্থাৎ সূর্য আষাঢ় মাসে যে দিন যে সময়ে মিথুন রাশিতে আদ্রা নক্ষত্রের প্রথম পাদে গমন করে, সে সময়কাল থেকে মাতৃস্বরূপা পৃথিবী এবং আদ্যাশক্তি মহামায়া ঋতুমতী হন অর্থাৎ অম্বুবাচির কাল শুরু হয়। পাশাপাশি তিনি এও বলেন, ‘তাবত্কালোবধি-বিংশতিদন্ডাধিক্ দিনত্রয়ম।’ অর্থাৎ সূর্যের মিথুন রাশি গমনের কাল থেকে শুরু করে তিন দিন কুড়ি দণ্ড কাল অম্বুবাচির স্থিতি। আচার্য রঘুনন্দনের ঘোষিত অম্বুবাচির এই তিথিকাল সুপ্রাচীন গ্রামবাংলার কৃষককুল যদি একইসঙ্গে পালন করে থাকে, তবেই তাদের পক্ষে কৃষিকাজের সঠিক প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব, এমন বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই এ ব্রত তথা উৎসবকে জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া।

এ প্রসঙ্গে যেটা উল্লেখ করা দরকার, সেটা হল, মানুষ কখনওই ক্রুড অবজেক্টিভ রিয়েলিটি নিয়ে বাঁচতে পারে না, কেননা সেখানে সে পরাধীন, একেবারেই অসহায়। তাই তার দরকার ইন্টারসাবজেক্টিভ রিয়েলিটি, যা সময়ের প্রেক্ষিতে মিথ বা গাথা, প্রপাগান্ডা বা জনশ্রুতি, ন্যারেটিভ বা প্রচার ইত্যাদি নামে পরিচিত। কোনও কিছুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য দরকার এ ধরনের মিথ বা গাথা, প্রপাগান্ডা বা জনশ্রুতি, ন্যারেটিভ বা প্রচার। অম্বুবাচির সঙ্গে যে মিথ বা গাথা জড়িয়ে রয়েছে, সেটি হল, এটাই নাকি একমাত্র সময়, যখন ধরিত্রী মা রজঃস্বলা হন। অর্থাৎ প্রকৃতি পুরুষ নয়, নারীই। যে কোনও হিন্দু মিথ বা গাথার বৈশিষ্ট্যই হল, সেটির তাত্ত্বিক প্রমাণ হিসাবে যেমন একটি পৌরাণিক কাহিনি যুক্ত থাকবে, তেমনই অভিজ্ঞতাভিত্তিক প্রমাণ রূপে একটি সুনির্দিষ্ট স্থানও থাকবে। অম্বুবাচি ব্রতের সঙ্গে সে বিষয়টিরও অন্যথা হয়নি।

দক্ষযজ্ঞে শিবের নিষেধ সত্ত্বেও রবাহূত হয়ে সতী তাঁর পিত্রালয়ে গিয়ে স্বামী নিন্দা সইতে না পেরে যখন আত্মাহুতি দেন, তখনই শুরু হয় সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে আত্মভোলা, ভাঙড়ভোলা, নটরাজ রূপধারী শিবের তাণ্ডব নৃত্য। সৃষ্টি রসাতলে যাওয়ার উপক্রম। তখন ভগবান বিষ্ণু সৃষ্টি রক্ষার উদ্দেশ্যে শিবকে থামানোর জন্য একসময় তাঁরই দেওয়া সুদর্শন চক্রের মাধ্যমে সতীর দেহ ৫১টি খণ্ডে বিভক্ত করেন। ফলস্বরূপ শিব তো শান্ত হলেন, তবে সতীর দেহের ওই খণ্ডিত অংশগুলি যে যে স্থানে পতিত হয়, সে সে স্থান বিভিন্ন মহাপীঠ নামে তীর্থস্থানে পরিণত হয়। সতীর যোনিমণ্ডল যে স্থানে এসে পতিত হয়, সে স্থানটি হল পূর্বতন ভারতের প্রাগজ্যোতিষপুর রাজ্য। সে রাজ্যের রাজা নরকাসুরকে বধ করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। আর অধুনা ভারতের আসাম প্রদেশের গুয়াহাটির কাছে যেটি নীলপর্বত নামে পরিচিত, যেখানে প্রতিদিন সূর্য ১৮০ ডিগ্রিতে উদিত হয়। পুরাণ অনুযায়ী, ওই পর্বতটি আবার স্বয়ং নীলকন্ঠ ধারণ করে রয়েছেন। আর ওই যোনিমণ্ডল দেবী মা কামাখ্যা নামে খ্যাত ।

প্রতিবছর আষাঢ়ের তিন দিন মা কামাখ্যা ঋতুমতী হন। দেবীর মন্দিরের গর্ভগৃহে মধ্যে কুণ্ডে ভুগর্ভস্থ জলের উপর যে ত্রিকোণাকার যোনিসদৃশ শিলাখণ্ড রয়েছে, সেটিই দেবী মা কামাখ্যা। এ সময় শিলাখণ্ডটি ভেদ করে গাঢ় গৈরিক রঙের জলস্রোত প্রবাহিত হতে থাকে। তিন দিন পর ওই স্রোত ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় এবং কুণ্ডের জল হয়ে ওঠে রক্তবর্ণ। উল্লেখ্য যে, কোনও বছর এ ঘটনার অন্যথা হয় না। এই অলৌকিক ঘটনাটিকেই যুগ যুগ ধরে দেবীর রজঃস্বলা হওয়ার নিদর্শন বলে মনে করা হয়ে আসছে। এমনকী মন্দিরসংলগ্ন ব্রহ্মপুত্রের জলেও লালচে রঙের স্রোত এসে মেশে।

প্রতিবছর এ সময় কামাখ্যা মন্দিরকে কেন্দ্র করে বিশাল মেলা বসে। তবে এই তিন দিন মা কামাখ্যাদেবীর মন্দির তো বটেই, ভারতের প্রায় সর্বত্র দেবী মন্দিরের মায়ের মুখ বস্ত্র দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। পুজোও বন্ধ থাকে। বলা হয়, মা এই কয়েকটি দিন বিশ্রাম গ্রহণ করেন। এখানে দেবী শুধু স্বর্গীয় নয়, তিনি হয়ে ওঠেন নৈসর্গিক মহীয়সী নারীত্বের প্রতিমূর্তি। নারীত্বের জয়ধ্বনির সঙ্গে শঙ্খনিনাদ বেজে ওঠে মন্দিরে মন্দিরে। বর্ষা ঋতুর আগমনে পৃথিবী নিজেও আদ্রিত হয়। লোকবিশ্বাস এটাই, ধরিত্রী মায়েরও রজঃস্বলা হওয়া। তাই এই কয়েকটি দিন বিশ্রাম। কৃষিকাজের জন্য মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি। এ সময় বাংলা, বিহার, ওড়িশা জুড়ে সমগ্র পূর্ব ভারত অম্বুবাচি মহোৎসব পালন করে থাকে। ওড়িশায় একে রজঃ উৎসব এবং রাঢ় বাংলায় অম্বুবাচি বলা হয়। সমগ্র ভারতের সকল সনাতনী যোগী, ব্রহ্মচারী, বৈষ্ণব, শাক্ত, শৈব, তান্ত্রিক সাধক মায়ের পরাগমোচন বা ঋতুমুক্তির জন্য কঠোর সাধন-ভজন, ব্রত ইত্যাদির মাধ্যমে যোগসাধনায় লিপ্ত হন।

অন্য পোস্ট: নটী বিনোদিনীর জীবনের অধিকাংশই অন্ধকারে ঢাকা

৭ থেকে ১১ আষাঢ় চার দিনব্যাপী গ্রামবাংলার মহিলারা এই ব্রত পালন করেন। এ সময় সাড়ম্বরে ধরিত্রী ও সকল মাতৃদেবী এবং শিব, নারায়ণ-সহ আদি দেবগণকে আম্র ও দুগ্ধ প্রদান করা হয়। দুগ্ধ ও আম্র উভয়ের আয়ুর্বেদিক পুষ্টিগুণ আমাদের মা-বোনদের ওজন বৃদ্ধির সহায়ক। এছাড়া পিঠা-পায়েস দেবীকে দেওয়ার রীতি তো রয়েছেই। এ সবই আনন্দ ও স্নেহের সঙ্গে যুক্ত মাতৃত্ব নামক গুণেরই বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে দেবতাদের সঙ্গে মানুষের ঐকান্তিক বোধের প্রকাশ। একজন কন্যার আদ্য ঋতুমোচন যেমন তার ভবিষ্যতে নবভ্রূণ ধারণকে সূচিত করে, তেমনই বর্ষার আগমন ধরিত্রীর নবপ্রাণ উৎপাদনকে সূচিত করে। তাই তাদের সম্মান প্রদর্শনের জন্যই এ বিশ্রাম দেওয়া। এ সময় সকল প্রকার কৃষিকাজ বন্ধ রাখা হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে।

পাহাড় ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদের জলের লাল হয়ে যাওয়া বিস্ময়কর হলেও এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে বিজ্ঞানের খেলা। ওই স্থানের মাটিতে রেড অক্সাইড এবং আয়রন কপার সালফেটের মাত্রা বেশি হওয়ায় বর্ষার শুরুতে এ সময় সেখানকার ব্রহ্মপুত্র নদের জল রক্তবর্ণ ধারণ করে। ফলস্বরূপ এ সময় ওই নদীর জল ব্যবহার করে যাতে কেউ বিষক্রিয়ার শিকার না হয়, সেজন্যই এ মহামেলার সূচনা বলে কোনও কোনও বৈজ্ঞানিক মনে করেন। কিন্তু যুগ যুগ ধরে চলে আসা এ ধরনের ভারতীয় রীতি, যেখানে বৈজ্ঞানিক মেধার সঙ্গে মিথ বা গাথার মেলবন্ধন ঘটিয়ে নারীদের সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি জনসচেতনতাকে একসূত্রে বেঁধে নিয়ে এগিয়ে চলার নিদর্শন রয়েছে, তা খুব কমই দেখা যায়।

পরিশেষে যেটা উল্লেখ করা দরকার, সেটা হল, অস্ট্রেলিয়ান ইকোফেমিনিস্ট ভ্যাল প্লামউড তাঁর ফেমিনিজম অ্যান্ড দি মাস্টারি অব নেচার (১৯৯৩) নামক বইয়ে যখন বোধবুদ্ধি দ্বারা পুষ্ট নানারকমের পরিবেশ সুরক্ষা তত্ত্বগুলিকে তুলোধোনা করে হৃদয় দ্বারা পুষ্ট কেয়ার এথিক্সের দ্বারা লালিত ইকোফেমিনিজমের ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত দেখাতে গিয়ে ইউরোপিয়ান সভ্যতার ধারেপাশে না ঘেঁষে আফ্রিকান সভ্যতার সাহায্য নেন, সেখানে বলাই যায় যে, ভারতীয় সংস্কৃতি এ সকল বিষয়ে অনেক বেশি সজাগ ছিল, আছে ও থাকবে। কেননা ভারতীয় সংস্কৃতি মিথ বা গাথা, বৈজ্ঞানিক মেধা, নারীর সামাজিক সম্মান জনসচেতনতা ইত্যাদির মেলবন্ধন।

4.7 3 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
6 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Subrata Das
Subrata Das
1 year ago

Mugdho holam. Matrishaktir sathe jibon o jibikar melbondhon bharatiya sonskritike ek onno sthan diyechhe . Prokriti ar debmohima suchona koreche shroddhabodher ja matrirup kolponay hoyeche sakar.

Angshu Pal
Angshu Pal
1 year ago

An informative one.

Pratap Laha
Pratap Laha
1 year ago

সামাজিক কিছু কুসংস্কারের কথা মেনে নিয়েও বলতে হয়, ভারতীয় সংস্কৃতিতে নারী-পুরুষের ভেদ সেই বৈদিক কাল হতেই তেমন প্রাধান্য পায়নি। তাই হয়তো বিশ্বের মহান সংস্কৃতি গুলির মধ্যে একমাত্র ভারতীয় সংস্কৃতিতে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর কে নারী হিসেবেও কল্পনা করা হয়েছে।
অম্বুবাচি যে শুধু আম খাওয়ার উৎসব নয় তা প্রবন্ধটি পড়েই প্রথম জানতে পারলাম।

SOVA
SOVA
1 year ago
Reply to  Pratap Laha

একদম ঠিক বলেছেন।

SOVA
SOVA
1 year ago

অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার। আমিও ছোট থেকে শুধু ভাবতাম যে অম্বুবাচী মনে আম খেতে হবে তার পাশাপাশি এই টুকু জানতাম যে মাটি কাটতে নেই 3 দিন কিন্তু আজ জানতে পারলাম অম্বুবাচী এর গুরুত্ব।

তনয় নন্দী
তনয় নন্দী
1 year ago

আমি ছোটো থেকে দেখে এসেছি যে অম্বুবাচী তে জল হয় তার কারণ টা আজ জানলাম। অনেক কিছু নতুন জানলাম । নমস্কার SIR।

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए