Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

বলিউডে ধর্ম, প্রতিভা ও বিতর্ক: এ আর রহমানের অভিযোগ ঘিরে উত্তাল শিল্পজগৎ

এ আর রহমান।

Share Links:

বরুণ মণ্ডল 

ভারতীয় সংগীত ও চলচ্চিত্র জগৎ দীর্ঘদিন ধরেই বহু ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির শিল্পীদের মিলনক্ষেত্র। এখানেই জন্ম নিয়েছে বহু কালজয়ী গান ও সিনেমা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই শিল্পজগৎ ফের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। একদিকে জনপ্রিয় প্লেব্যাক শিল্পী অরিজিৎ সিং পেশাগত গান গাওয়া থেকে ধীরে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন, অন্যদিকে অস্কারজয়ী সুরকার এ আর রহমান অভিযোগ করেছেন যে, গত কয়েক বছরে তিনি বলিউডে কাজের সুযোগ কম পাচ্ছেন এবং এর পিছনে ধর্মীয় বিভেদের ছায়া থাকতে পারে। এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই ভারতীয় বিনোদন জগতে ঝড় ওঠে। সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে শিল্পীমহল— সবখানেই শুরু হয় তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক।

রহমানের অভিযোগ: ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা না বৃহত্তর বাস্তবতা?

রহমান এক সাক্ষাৎকারে জানান, গত প্রায় আট বছরে বলিউড থেকে তাঁর কাজের অফার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে। তাঁর মতে, ইন্ডাস্ট্রির ক্ষমতার কাঠামো বদলেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ‍‘অসৃজনশীল’ লোকজন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। পাশাপাশি তিনি ইঙ্গিত দেন, কিছু ক্ষেত্রে বিষয়টি ‍‘কমিউনাল’ বা ধর্মীয় বিভেদের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। যদিও তিনি স্বীকার করেন, সরাসরি বৈষম্যের মুখোমুখি হননি, বরং নানা গুজব ও অভ্যন্তরীণ কথাবার্তার মাধ্যমেই এমন ধারণা পেয়েছেন।

রহমানের এই বক্তব্যের পিছনে রয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত ইতিহাসও। একসময় হিন্দু পরিবারে জন্ম নিয়ে পরে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই ধর্মীয় পরিচয় অনেক সময় সংবেদনশীল আলোচনার জন্ম দেয়। ফলে তাঁর অভিযোগ শুধুই ব্যক্তিগত হতাশা নয়, অনেকের কাছে এটি বলিউডে সংখ্যালঘু শিল্পীদের অবস্থান নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে ধরে।

বলিউডের পালটা প্রতিক্রিয়া ও ভিকটিম কার্ড বিতর্ক

রহমানের মন্তব্যের পরপরই বলিউডের একাধিক তারকা মুখ খুলেছেন। অনেকেই স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, সংগীত বা সিনেমার জগতে ধর্ম নয়, প্রতিভাই শেষ কথা। এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে দুই সুপারস্টারের নাম—সলমান খান ও শাহরুখ খান। এই দুই অভিনেতা মুসলিম হয়েও কয়েক দশক ধরে বলিউডের শীর্ষে রয়েছেন। কোটি কোটি দর্শকের ভালোবাসা এবং বক্স অফিসের সাফল্য তাঁদের অবস্থানকে আরও মজবুত করেছে। অনেক শিল্পীর মতে, যদি ধর্মই প্রধান বাধা হত, তাহলে সলমান বা শাহরুখের মতো তারকারা কখনওই এত বড় হয়ে উঠতে পারতেন না। গায়ক শান স্পষ্ট বলেছেন, ‍‘সংগীতে কোনও সংখ্যালঘু অ্যাঙ্গেল নেই।’ চিত্রনাট্যকার জাভেদ আখতার এবং অভিনেত্রী রানি মুখার্জিও জানিয়েছেন, বলিউডে ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদের অভিজ্ঞতা তাঁরা দেখেননি।

অন্যদিকে অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাওয়াত রহমানকে ‍‘পূর্বধারণায় আচ্ছন্ন’ বলেও কটাক্ষ করেন। পরিচালক রামগোপাল ভার্মা বলেন, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি শুধু টাকা আর বাজার নিয়ে চলে, ধর্ম এখানে অপ্রাসঙ্গিক।এসব বক্তব্য থেকেই অনেকের অভিযোগ, রহমান আসলে ‍‘সংখ্যালঘু ভিকটিম কার্ড’ খেলছেন।

সমর্থনের সুর ও ভিন্ন ব্যাখ্যা

তবে সবাই যে রহমানের বিরোধিতা করেছেন, তা নয়। গায়ক আমাল মালিক বলেন, ইন্ডাস্ট্রিতে গ্রুপিজম ও কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে, যা অনেক প্রতিভাবান শিল্পীর সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। যদিও তিনি ধর্মীয় দিকটিকে পুরোপুরি সমর্থন করেননি।

রাজনীতিক মেহবুবা মুফতি রহমানের বক্তব্যকে ভারতের বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসাবে দেখেছেন। তাঁর মতে, সংখ্যালঘুদের সূক্ষ্ম বৈষম্যের অভিজ্ঞতা অস্বীকার করা যায় না।

অন্য ব্যাখ্যাও উঠে এসেছে। কেউ বলেছেন, রহমানের সংগীতের ধরন বদলে গিয়েছে। আধুনিক ট্রেন্ডে তাঁর কাজ আগের মতো জনপ্রিয় হচ্ছে না। আবার কেউ মনে করেন, বয়স ও পারিশ্রমিকের কারণেও প্রযোজকরা নতুন সুরকারদের দিকে ঝুঁকছেন। প্রবীণ অভিনেত্রী ওয়াহিদা রহমান পর্যন্ত বলেছেন, কাজ কমার পিছনে বয়স বড় কারণ হতে পারে, ধর্ম নয়।

অরিজিৎ সিংয়ের প্রসঙ্গ ও শিল্পীর মানসিক চাপ

এই বিতর্কের মাঝেই অরিজিৎ সিংয়ের পেশাগত বিরতি নেওয়ার ইঙ্গিত নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ এটিকে বলিউডের বদলে যাওয়া পরিবেশের ফল হিসাবে দেখছেন। আবার অনেকে বলছেন, অতিরিক্ত কাজের চাপ, মানসিক ক্লান্তিই মূল কারণ।

এ প্রসঙ্গ টেনে অনেকেই বলেছেন, শিল্পজগতে সুযোগ কমা বা সরে দাঁড়ানো সব সময় বৈষম্যের ফল নয়, অনেক সময় এটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা বাজারের বাস্তবতা। এ আর রহমান যখন নিজের সুযোগ পাওয়ার জন্য বিতর্কিত মন্তব্য করে চলেছেন, ঠিক সে সময় অরিজিৎ সিং নতুনদের সুযোগ এবং নিজেকে নতুন ভাবে আবিষ্কারের জন্য ব্যবসায়িক গান গাওয়া থেকে বিরতি নিচ্ছেন।

উপসংহার

এ আর রহমানের অভিযোগ বলিউডের জটিল বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। একদিকে রয়েছে প্রতিভা, বাজার ও কর্পোরেট প্রভাবের কঠিন সমীকরণ, অন্যদিকে সমাজের ধর্মীয় বিভেদের ছায়া। কেউ কেউ এটিকে একজন শিল্পীর স্বাভাবিক কেরিয়ার ডাউনফেজ বলে দেখছেন, কেউ কেউ আবার এতে সংখ্যালঘু অভিজ্ঞতার প্রতিফলন খুঁজে পাচ্ছেন।

তবে ইতিহাস বলছে, ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সংগীত জগৎ এখনও বহুত্ববাদেই শক্তিশালী। সলমান খান, শাহরুখ খান থেকে শুরু করে বহু মুসলিম শিল্পীর সাফল্য তার প্রমাণ।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হল সংযম ও বাস্তবতার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন। খ্যাতিমান ব্যক্তিদের মন্তব্য সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সামগ্রিক সত্যে রূপ দেওয়ার আগে আরও গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, শিল্প মানুষের হৃদয়কে এক করে, কিন্তু সমাজের বিভাজনের প্রভাব থেকে তা পুরোপুরি মুক্ত নয়। এ সত্য মেনেই ভবিষ্যতে আরও সহনশীল ও ন্যায়ভিত্তিক শিল্পজগৎ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৫)

জাতীয় বিজ্ঞান দিবস ও বিজ্ঞানী সি ভি রমণ

রতন থিয়াম সারাজীবন রাজনীতির আঙিনায় একজন শিল্পী হিসাবে দায়বদ্ধ থেকেছেন

এআই যেন এক গোলকধাঁধা

পিছিয়ে পড়াদের স্বার্থে খয়রাতি অবশ্যই সমর্থনযোগ্য

নত হলে উন্নত হওয়া যায়

কবিতা কখনও সম্পূর্ণ বোধগম্য হবে না

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৪)

শংকরের প্রয়াণে বাংলা সাহিত্যের আকাশে সত্যিই যেন একটি আলো নিভে গেল

মনের রসদ জোগাতে গ্রন্থাগারগুলির পুনরুজ্জীবন জরুরি (শেষ পর্ব)