ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া
শ্রীঅরবিন্দ ঘোষের রাজনৈতিক দর্শনের প্রকৃত মৌলিকতা কেবল তাঁর স্বাধীনতার দাবিতে নয়, বরং সেই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য প্রণীত সুসংহত কর্মপরিকল্পনায় নিহিত। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, কেবল বক্তৃতা, আবেদন বা ক্ষণস্থায়ী জন-আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মতো শক্তিশালী ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। একটি বিদেশি শাসনকে দুর্বল করার জন্য প্রয়োজন জনগণের মানসিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং বিকল্প জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি এমন এক কর্মসূচির রূপরেখা প্রণয়ন করেন, যা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে প্রথম সুসংবদ্ধ জাতি-রাষ্ট্র নির্মাণের পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শ্রীঅরবিন্দের পরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিল একটি যুগান্তকারী ধারণা— State within the State, অর্থাৎ ‘রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র’। তাঁর মতে, ভারতবাসী যদি শিক্ষা, বিচার, সামাজিক সংগঠন, অর্থনীতি এবং জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে, তবে ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে অর্থহীন হয়ে পড়বে। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল সংঘর্ষের আগে আত্মপ্রস্তুতি। বিদেশি রাষ্ট্রকে কেবল প্রতিরোধ নয়, তার বিকল্প একটি জাতীয় কাঠামো নির্মাণই ছিল তাঁর লক্ষ্য। রাজনৈতিক তত্ত্বের ভাষায় এটি ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বৈধতার ভিত্তি (Legitimacy)-কে ক্রমশ ক্ষয় করার কৌশল।
এই কর্মসূচির প্রথম স্তম্ভ ছিল স্বদেশি আন্দোলন। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের ফলে স্বদেশি ইতিমধ্যেই একটি জনপ্রিয় স্লোগানে পরিণত হয়েছিল, কিন্তু শ্রীঅরবিন্দ তাকে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের সুসংহত দর্শনে উন্নীত করেন। তাঁর মতে, বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল একটি জাতি কখনও রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে পারে না। অর্থনৈতিক পরাধীনতা রাজনৈতিক পরাধীনতারই আর এক রূপ। তাই দেশীয় শিল্প, কারুশিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, প্রযুক্তি এবং উৎপাদন ব্যবস্থার বিকাশকে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে ঘোষণা করেন। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীকালে আত্মনির্ভর অর্থনীতির ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে সাযুজ্যপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়। তবে শ্রীঅরবিন্দের অর্থনৈতিক চিন্তা আবেগপ্রবণ ছিল না; ছিল বাস্তববাদী। তিনি স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে ভারতের শিল্পোৎপাদন এখনও এত উন্নত নয় যে, সমস্ত বিদেশি দ্রব্যের বিকল্প দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব। এ কারণেই তিনি এবং বাল গঙ্গাধর তিলক উভয়েই ব্রিটিশ পণ্যের কার্যকর রাজনৈতিক বয়কটের পক্ষে মত দেন, কিন্তু সব বিদেশি দ্রব্য বর্জনের দাবিকে অবাস্তব বলে মনে করেন। তাঁদের প্রস্তাব ছিল— যেসব পণ্য ভারত উৎপাদন করতে পারছে না, সেগুলি ব্রিটেনের পরিবর্তে জার্মানি, আমেরিকা বা অন্য দেশ থেকে আমদানি করা হোক। উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ বাণিজ্যের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা। এই নীতির মধ্যে অর্থনৈতিক বাস্তববোধ এবং রাজনৈতিক কৌশল— উভয়েরই সমন্বয় লক্ষ করা যায়।
এ প্রসঙ্গে শ্রীঅরবিন্দ ভারতীয় ধনিক শ্রেণির ভূমিকারও তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেন। তিনি চেয়েছিলেন শিল্পপতি, ব্যবসায়ী এবং জমিদারদের নিয়ে একটি শক্তিশালী স্বদেশি অর্থনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল হতাশাজনক। অধিকাংশ বড় ব্যবসায়ী ব্রিটিশ আমদানির সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাঁরা আন্দোলনে যোগ দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন; আবার জমিদার শ্রেণির একটি বড় অংশ সরকারি অসন্তোষের ভয়ে দূরত্ব বজায় রেখেছিল। ফলে স্বদেশি আন্দোলনের প্রধান ভার বহন করতে হয় মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজকে। এই পর্যবেক্ষণ কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি ঔপনিবেশিক ভারতের শ্রেণি-চরিত্র সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মন্তব্য।
শ্রীঅরবিন্দের কর্মসূচির দ্বিতীয় প্রধান স্তম্ভ ছিল জাতীয় শিক্ষা। তিনি ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থাকে ভারতীয় মেধা ও সৃজনশীলতার পরিপন্থী বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, ঔপনিবেশিক শিক্ষার উদ্দেশ্য স্বাধীনচেতা নাগরিক তৈরি নয়; বরং এমন একশ্রেণির কর্মচারী তৈরি করা, যারা ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রয়োজন পূরণ করবে। ফলে এই শিক্ষা ভারতীয়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের পরিবর্তে নির্ভরশীলতা, মৌলিক চিন্তার পরিবর্তে মুখস্থবিদ্যা এবং নেতৃত্বের পরিবর্তে আনুগত্যের মানসিকতা তৈরি করেছিল। বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজে তাঁর কর্মজীবন ছিল এ ধারণারই বাস্তব পরীক্ষা। তিনি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, দর্শন ও বিজ্ঞানচর্চা আধুনিক জ্ঞানের সঙ্গে সৃজনশীল সমন্বয়ে বিকশিত হবে। পাশাপাশি তিনি জনগণের সালিশি আদালত প্রতিষ্ঠারও আহ্বান জানান। তাঁর মতে, ছোটখাটো দেওয়ানি বিরোধ এবং সামাজিক সমস্যার সমাধান যদি জনগণ নিজেরাই করতে শেখে, তবে ব্রিটিশ আদালতের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং সমাজে আত্মশাসনের অভ্যাস গড়ে উঠবে। একইভাবে তিনি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনের ওপরও জোর দেন। এই বাহিনীর উদ্দেশ্য কেবল সভা-সমাবেশে শৃঙ্খলা রক্ষা নয়; বরং যুবসমাজকে সংগঠিত করা, আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখানো এবং ভবিষ্যৎ জাতীয় প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত করা। তাঁর দৃষ্টিতে স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল চরিত্র গঠন, সংগঠন এবং আত্মশক্তি অর্জনেরও আন্দোলন।
এ সমস্ত কর্মসূচিকে একসূত্রে বাঁধলে দেখা যায়, শ্রীঅরবিন্দ আসলে একটি সমান্তরাল জাতীয় সমাজ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটি দেশীয় বিকল্প তৈরি করা— সরকারি বিদ্যালয়ের পরিবর্তে জাতীয় বিদ্যালয়, সরকারি আদালতের পরিবর্তে জনগণের সালিশি পরিষদ, বিদেশি পণ্যের পরিবর্তে দেশীয় শিল্প, সরকারি প্রশাসনের পরিবর্তে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এর মাধ্যমে জনগণের আনুগত্য ধীরে ধীরে বিদেশি রাষ্ট্র থেকে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের দিকে সরে আসবে। এ কৌশল ছিল রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি রাষ্ট্র গঠনের পূর্বপ্রস্তুতি।
ঐতিহাসিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, শ্রীঅরবিন্দের এই কর্মসূচির সব অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারি দমননীতি, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে বহু উদ্যোগ স্থায়ী হতে পারেনি। তবু তাঁর চিন্তার বীজ ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের গভীরে রোপিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে অসহযোগ আন্দোলন, জাতীয় শিক্ষা, স্বদেশি শিল্পের প্রসার এবং গণসংগঠনের যে বিকাশ আমরা প্রত্যক্ষ করি, তার মধ্যে শ্রীঅরবিন্দের পরিকল্পনার সুস্পষ্ট প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
অতএব শ্রীঅরবিন্দকে কেবল একজন বিপ্লবী বা সাংবাদিক হিসাবে মূল্যায়ন করলে তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা যায় না। তিনি ছিলেন এমন এক রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, যিনি স্বাধীন ভারতের কাঠামো নিয়ে তখনই ভাবতে শুরু করেছিলেন, যখন অধিকাংশ নেতা স্বাধীনতার লক্ষ্য নির্ধারণ নিয়েই দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তাঁর পরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিল আত্মশক্তি, আত্মনির্ভরতা এবং আত্মমর্যাদার ওপর প্রতিষ্ঠিত এক জাতির স্বপ্ন—যে স্বপ্ন পরবর্তী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম বৌদ্ধিক ভিত্তিতে পরিণত হয়।
ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
