বিবেকানন্দ চট্টোপাধ্যায়
ঊনবিংশ শতাব্দীর শিক্ষা প্রসার ও সংস্কার আন্দোলনে সমগ্র জাতি যে দু’জন মহাপুরুষের নিকট ঋণী, তাঁরা হলেন, প্রথমজন রাজা রামমোহন রায় এবং দ্বিতীয়জন ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের যে অনির্বাণ শিখা রামমোহন রায় প্রজ্বলিত করেছিলেন, সেটিকে অধিকতর দ্যুতিময় ও দেদীপ্যমান অবস্থায় রূপান্তরিত করে বহন করার স্ব-আরোপিত দায়িত্ব গ্রহণ করেন এক খর্বাকৃতি, অথচ হিমালয়সদৃশ সুউচ্চ ও প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আধুনিক মানুষ— ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। আধুনিকতা যে ব্যক্তির প্রদর্শনমূলক আচরণে প্রকাশ পায় না, তা মননশীলতা প্রোথিত এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে আপনাতেই বিচ্ছুরিত হয়, সেটি ঈশ্বরচন্দ্র বাল্যকাল থেকেই তাঁর জীবনচর্যার life style-এর মধ্য দিয়ে বারবার প্রমাণ করেছেন। স্কন্ধে উপবীত ঝোলানো, ত্রিসন্ধ্যা আহ্নিক করা এক ব্রাহ্মণকে আমরা দুই শতক পরে আজকেও আধুনিক মানুষ বলি, তা কি তাঁর বহিরঙ্গ appearance বিচারে?
ভারতীয় ঐতিহাসিকগণ ১৭০৭ অর্থাৎ ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকে কালখণ্ডকে আধুনিক যুগের ইতিহাস বলে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু বাস্তবে ভারত তার ১০০ বছর পরেও মধ্যযুগীয় কুসংস্কারের জাল ছিন্ন করতে পারেনি। ঊনবিংশ শতকের শুরুতে জাতির সত্যিকারের আধুনিকতা তথা নবজাগরণের সূচনা হয় রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের হাত ধরে। বিদ্যাসাগর তাঁর অসীম ধৈর্য, নিরবচ্ছিন্ন লড়াই এবং অধ্যবসায় দিয়ে মধ্যযুগীয় অশিক্ষা, কুসংস্কারের অমানিশা দূর করতে চেয়েছিলেন। এজন্য সমাজের স্বঘোষিত মোড়ল মাতব্বরদের কাছ থেকে কম প্রতিরোধের সম্মুখীন তাঁকে হতে হয়নি। কিন্তু তিনি ছিলেন লক্ষ্যে অবিচল। বাঙালি নারীর যন্ত্রণা সিংহহৃদয় বিদ্যাসাগরের অন্তরলোকে ঝড় তুলেছে, তাঁর হৃদয়কে মথিত করেছে। তিনি তাঁদের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করেছেন। ভারতের প্রথম আধুনিক মানুষ যে কাজ শুরু করেছিলেন, তা শেষ করায় ব্রতী হন বিদ্যাসাগর।
রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা বিলোপের মাধ্যমে যুবতী বিধবাদের জীবন রক্ষা করেন, আর বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ প্রচলনের মাধ্যমে তাঁদের আজীবনের ক্লেশ, দুর্দশা মোচন করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। কথায় আছে, আপনি আচরি ধর্ম অপরে শেখায়। বিদ্যাসাগর বচনবাগীশ ছিলেন না কখনও। তিনি নিজ পুত্র নারায়ণচন্দ্রের বিবাহ দিয়েছিলেন এক বিধবার সঙ্গে। মুখ ও মুখোশের ভিড়ে বর্তমান দিনে মানুষ চেনাই ভার! যাঁরা উঠতে বসতে আমেরিকার বিরোধিতা করেন, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার কট্টর সমালোচক, তাঁরাই আবার আমেরিকার উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাহায্য নেন। যাঁরা ব্যক্তিগত জীবনে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, তার সুফল পারিবারিক জীবনে সদ্ব্যবহার করছেন, তাঁরাই অন্যদের ধর্মশিক্ষার আবর্তে জড়িয়ে ফেলতে চান।
বিদ্যাসাগর খুব বেশি একটা লেখেননি। কিন্তু বাংলা গদ্য সাহিত্য সরল ও প্রাঞ্জল হয়েছে তাঁর হাতে। তাঁর লেখা বলতে সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনূদিত কিছু সাহিত্য এবং মৌলিক রচনা— সীতার বনবাস ও ভ্রান্তিবিলাস। রচনার ব্যাপ্তিতে বিদ্যাসাগরের বিশালতা ও অবদান বিচার্য নয়। নারীশিক্ষার প্রসারে তাঁর আন্তরিকতা এবং সমাজ সংস্কারে তাঁর নিষ্ঠার জন্য ভারতীয় সমাজ তাঁকে এক অদ্বিতীয় স্থান দিয়েছে। তাঁর মধ্যে কোনওরূপ মেকিত্ব ছিল না, যা ছিল, পুরোটাই নির্ভেজাল, খাঁটি। জরদগ্রব সমাজের নিষ্ঠুর রীতিনীতি, আদব-কায়দা, অচলায়তন তাঁকে নিশ্চল করতে পারেনি কোনও দিন। তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত লিঙ্গবৈষম্য ও সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে লড়ে গিয়েছেন। মধ্যবিত্ত সমাজের মুখোশের অরণ্য ত্যাগ করে তিনি আদিবাসী সমাজের সরলতা ও সহিষ্ণুতাঋদ্ধ মুখগুলির সান্নিধ্যে জীবনসায়াহ্ন অতিবাহিত করেছেন
সুদুর কারমাটাঁড়ে। দরিদ্র অসহায়দের জন্য তাঁর আকুলতা, তথাকথিত পিছিয়ে পড়া জনজাতির মানুষদের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ, নারীর শাপমোচনে অঙ্গীকার, শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে লেখা বর্ণপরিচয় ও বোধোদয় ইতিহাসের কষ্টিপাথরে আজও অসামান্য।
ছাত্রদের উদ্দেশে বলব, তোমরা বিদ্যালয়মুখী হও। ভার্চুয়াল শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে জীবন ভার্চু-সমৃদ্ধ হয় না। সামাজিকীকরণ মূল্যবোধের শিক্ষা দূর শিক্ষায় নেই। গৃহকোণে স্থানু একা একা শিক্ষাগ্রহণ ইনক্লুসিভনেসের শিক্ষা দিতে পারে না। এটা বুঝতে হবে। কারণ সমাজ তোমাদের মুখ চেয়ে বসে আছে। বিদ্যাসাগর শিক্ষার প্রসারে বহু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। আজ শিক্ষাক্ষেত্রে বহুরকম সমস্যা তৈরি হয়েছে, যেমন, পরিকাঠামোহীনতা, শিক্ষক অপ্রতুলতা এবং সর্বোপরি মানসিক জড়তা। তবুও স্কুলের প্রয়োজন শেষ হয়ে গিয়েছে, এটা বলার সময় বোধ হয় আসেনি। তাই বিদ্যাসাগরের ইচ্ছাকে সম্মান জানাতে হবে শিক্ষক ও ছাত্র উভয় সমাজকেই।

