Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

মা কোথায়

Share Links:

ভাস্কর সেনগুপ্ত

কৃষ্ণানন্দ স্বামী লিখেছিলেন,
‘এখনো কি মন রবে অচেতন।
ঐ শুন মায়ের বাজনা বাজিতেছে।।
ভূতল রসাতল আকাশ মণ্ডল।
সবই মিলে আনন্দে নাচিতেছে।।
দুখে বা দুর্গমে দুর্গা নাম সার।
আজই দুর্গা পূজা কি দুঃখ আবার।।
মায়ের মত মা কভু দেখি নাই।
মা বলে ডাকিলে অমনি সাড়া পাই।।’

সে বছর পাড়ার পুজোমণ্ডপে গিয়ে দেখলাম প্রচুর লোক। ডিজে বাজছে। সামনে কতকগুলো বাচ্চা ছেলে বড়দের মতো যেমন টিভিতে দেখেছে, নাচার চেষ্টা করছে। কতক গৃহবধূ খুব প্রয়োজনীয় বিষয়ে বক্তব্য রাখতে ব্যস্ত। পাড়ার মাতব্বররা বাহাদুরি দেখাতে ব্যস্ত। পুরোহিত মঞ্চের এক কোণে বসে কী করছেন, নিজেই জানেন না।

মায়ের দিকে তাকালাম, কেমন ব্যথামিশ্রিত করুণ চাহনি! মাকে দেখতে পেলাম না। শূন্য হৃদয়ে গেলাম স্কুলের ঠাকুর দেখতে। ঠিক বিপরীত দৃশ্য। নিস্তব্ধ। কেউ কোনও কথা বলছে না। সকলে হিসেব করে চলছে। হিসেব করে বলছে। মনে হল, হেডমাস্টারের সামনে ছাত্ররা বসে আছে। মায়ের দিকে তাকালাম। দেখলাম, প্রাণহীন মান। হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।

খাবার ঘরে বসে আছি। হঠাৎ নজর পড়ল আমার মায়ের ছবির দিকে। মনে হল, যখন আমি কথা বলতে পারতাম না, নড়তে চলতে পারতাম না, তখন তুমি ঠিক বুঝতে, আমি কি চাই। যা প্রয়োজন, সব দিতে। যখন বড় হলাম, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমার সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়া, সব পরিবর্তন হত। তবু তুমি ঠিক বুঝতে। সুখে-দুঃখে, আনন্দে-সম্পদে, সর্বদা আমার সঙ্গে ছিলে। কত রাগ করেছি তোমার ওপর! কত অভিমান ও অভিযোগ করেছি! তবু তুমি আমার সকল অত্যাচার হাসিমুখে নিয়েছ। মা, আজ তোমার কথাই বারবার মনে পড়ে।

মােয়র ছবিটা ঝাপসা হয়ে গেল। মুখ লুকোেনার জন্য একটা পুরোনো ভারতাজির পত্রিকা খুললাম। মা দুর্গার কৃপার কথা লেখা রয়েছে। ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী ও এক কন্যাসন্তান নিয়ে সংসার। বাড়িতে খুব ঘটা করে পুজো হয়। মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেল। দুর্গাপুজোর সময় এসেছে। ব্রাহ্মণ মেয়ের শ্বশুরবাড়ি গেলেন আশায় আশায়, যদি মেয়েকে চার দিনের জন্য ছাড়েন জমিদার, তাহলে পুজোটা নির্বিঘ্নে সমাপন সম্ভব। জমিদারবাবু কিছুতেই রাজি হলেন না। বললেন, আরে মশাই, আমাদের বাড়িতেও পুজো আছে। বউমা থাকবে না, হতেই পারে না।

ভগ্নমনোরথ হয়ে ফিরে চলেছেন ব্রাহ্মণ। কী জানি, কী হয়! পিছন থেকে হঠাৎ মেয়ের ডাক শুনে থমকে গেলেন। দেখলেন, মেয়ে ছুটতে ছুটতে আসছে। বাবা, আমি বলে কয়ে শ্বশুর মশাইকে রাজি করিয়েছি। তবে তিন দিনের জন্য। চলো চলো, শিগগির চলো।

তিন দিন মেয়ে মা দশভুজার মতো সব কাজ করে দিল। দশমীর সকালে হন্তদন্ত হয়ে ফিরে গেল। পরের দিনই ব্রাহ্মণ গেলেন কুটুমবাড়ি। বললেন, আপনি দয়া করে মেয়েকে ছেড়ে ছিলেন বলেই আমাদের বাড়ির পুজো সম্পন্ন হল। একটু প্রসাদ এনেছি।

জমিদারবাবু বললেন, আমি কিছু বুঝতে পারছি না। বউমা ছিল বলেই তো আমাদের পুজো সম্ভব হল। আপনি মেয়েকে কোথায় পেলেন?
ব্রাহ্মণ বিস্ময়ে হতবাক। বললেন, তাহলে আমাদের বাড়ির পুজোর সব ব্যবস্থা কে করল? মা স্বয়ং?

ভারতাজিরের ওই একই খণ্ড দেখলাম আর একটি ঘটনা লেখা রয়েছে। নরহরিবাবু কামাখ্যায় জমিদারবাবুর বাড়িতে চাকরি করেন। সেবার দুর্গাপুজোর সময় কিছুতেই ছুটি পেলেন না। বাড়িতে পুজো আছে বলেও ছুটি মিলল না। অবশেষে ঠিক করলেন, এখানেই মনে মনে পুজো করবেন। ষষ্টি, সপ্তমীর পুজো হল। অষ্টমীর দিন দেখলেন, একটি বাচ্চা মেয়ে খুব ছোট্ট একটি কাপড় পরে যাচ্ছে। নরহরিবাবু জিজ্ঞেস করলেন, মা, তোমার এমন পোশাক কেন? মেয়েটি বলল, তোদের বাড়ির পুজোয় যেমন দিয়েছে, তেমনই পরেছি। তবে আমি পুজো নিইনি।

নরহরিবাবু ছুটতে ছুটতে গেলেন জমিদারবাবুর কাছে। বললেন, আমাদের বাড়ির পুজোয় গন্ডগোল হয়েছে। আমি চললাম। আমার চাকরি যদি যায়, যাক।
জমিদারবাবু অনুমতি দিলেন। তখনই নৌকো করে রওনা হলেন। বাড়ি গিয়ে দেখলেন, ভাইরা অতি নিম্নমানের ভোগ দিয়ে পুজো করছে। নরহরিবাবু ভালো জিনিস কিনে ভোগ নিবেদন করলেন। মা সত্যিই আসেন। ভোগ গ্রহণ করেন। পত্রিকাটা সরিয়ে রাখলাম।

সামনের বুক সেল্ফের দিকে তাকালাম। ভারতের সাধক চার খণ্ড আছে। একটা টেনে বের করলাম। পাতা ওলটাতেই চোখে পড়ল কমলাকান্ত। অন্যমনষ্কভাবে পাতা ওলটাচ্ছি। একটা পাতায় চোখ আটকে গেল। চান্নাগ্রামের বিশালাক্ষী মন্দিরে কমলাকান্ত সারাদিন সারারাত থাকেন। সেই দিন আপন মনে গান করছেন আর মার বিগ্রহ সাজাচ্ছেন। এমন সময় দেখলেন, এক বয়স্ক মহিলা দরজার কাছে বসে আছেন। কমলাকান্ত বললেন, আপনি কে, মা? এখানে বসে কেন?

—বাবা, আমি ধর্ম নারায়ণের মা। তোমার গান শুনতে বড় ভালো লাগে, তাই এলাম।

কমলাকান্ত কাজে ব্যস্ত। খানিক পরে দেখলেন, ধর্মনারায়ণের মা কখন চলে গিয়েছেন। পরদিন সকালে ধর্মনারায়ণ দুধ দিতে এলেন। কমলাকান্ত বললেন, কাল তোর মা এসেছিলেন মন্দিরে। ধর্মনারায়ণ বললেন, সে কি গো! আমার মা তো আমার যখন তিন মাস বয়স, তখন চলে‌ গিয়েছেন।

কমলাকান্ত মাটিতে বসে পড়লেন। ভাবলেন, তবে কি আমার শ্যামা মা এসেছিলেন!

মনটা কেমন আনমনা হয়ে গেল। মা এমনভাবেই জানান দেন। মনটা কেমন বিবশ হয়ে গেল। বসার ঘরে গেলাম। খবর কাগজ নাড়তে নাড়তে একটা পুরোনো সাপ্তাহিক বর্তমান হাতে এল। দক্ষিণেশ্বরের মা ভবানী মন্দিরের পত্তনের কথা। রািন রাসমণি মায়ের মন্দির করার বাসনায় জমি খুঁজে বেড়াচ্ছেন। একদিন একটা বজরা করে রওনা হয়েছেন। শেওড়াফুলির কাছে এসে দেখেন, গঙ্গার ঘাটে একটি বাচ্চা মেয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। বজরা পারে ভেড়ানো হল। ওই মেয়েটিকে অনুসরণ করতে করতে শেওড়াফুলি মা ভবানীর মন্দির দেখলেন। একদম জঙ্গলের মধ্যে। ফিরে এলেন। ওই বাচ্চা মেয়েটিকে আর দেখা গেল না। তারপর এলেন দক্ষিণেশ্বরে। জমি পছন্দ হল। মন্দির বানানো হল। এবার বিগ্রহের পালা। যে বিগ্রহ মা দেখিয়েছিলেন শেওড়াফুলিতে, সেরকম বিগ্রহ করার জন্য কৃষ্ণনগরের পোটোকে ডাকা হল। পোটো একটি বিগ্রহ করে আনলেন। রািন রাসমণির পছন্দ হল না। আলমারিতে রেখে দেওয়া হল। আরও একটি বিগ্রহ করে আনলেন। সেটাও আলমারিতে স্থান পেল। অবশেষে তৃতীয় বিগ্রহটা পছন্দ হল। সেটা দক্ষিণেশ্বরে ঠাঁই পেল। হই হই করে ঐতিহাসিক মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়ে গেল।

তার কিছুদিন পরে কাশী বোস লেনের গুহ পরিবারের কর্তা স্বপ্ন দেখলেন, মা বলছেন, ‘আমি জানবাজারে আছি। আমাকে নিয়ে যা।’

গুহবাবু পরদিন প্রত্যূষে রানি রাসমণির কাছে হাজির। স্বপ্নের কথা বললেন। রানি রাসমণি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমার কাছে দুটো বিগ্রহ আছে। প্রতিষ্ঠা হল গুহদের কালীবাড়িতে। আজও আছে।’

মন আরও অস্থির হয়ে উঠছে। জগদীশ্বরানন্দের চণ্ডী খুলে বসলাম। জগদীশ্বরানন্দের লেখা ভূমিকা আকর্ষণ করল আমাকে। মনুর টীকাকার কুল্লুক ভট্টর পিতা উদয়নারায়ণ প্রথম দুর্গাপুজো করেন। চণ্ডীর ৮/৬ মন্ত্রে মৌর্য শব্দ আছে। আর ১/৬ মন্ত্রে কোলাবিধ্বংসী যবনের নাম আছে। অর্থাৎ দুর্গাপুজো ২০০০ বছরের পুরোনো। হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো থেকে দেবীপুজোর নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। সুতরাং ৫০০০ বছরের পুরোনো। ঋগ্বেদে বিশ্ব দুর্গা, সিন্ধু দুর্গা, অগ্নি দুর্গার উল্লেখ আছে। শুক্লযজুর্বেদ ও কৃষ্ণ যজুর্বেদে অম্বিকাদেবীর কথা আছে। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, সর্বত্র দেবীপুজোর কথা আছে। এমনকী বাংলার বারো ভূঁইয়া আমলে যশোরাজ প্রতাপাদিত্যের সেনাধ্যক্ষ আকবরের মহল্লার ভিতরে দুর্গাপুজো করেছেন। নবদ্বীপের মুকুন্দ সঞ্জয়ের চণ্ডীমণ্ডপে চৈতন্যদেব টোল খুলেছিলেন। নিত্যানন্দ খড়দায় নিজগৃহে প্রতিমা বসিয়ে দুর্গাপুজো করেছেন। দুর্গাপুজো ভারতের ধমনীতে ধমনীতে প্রবহমান।

দুর্গাপ্রসন্নর জীবনী হাতে এল। খুলে দেখলাম এক অদ্ভুত ঘটনা। দুর্গাপ্রসন্ন একদিন মন্দিরে বসে আছেন। এমন সময় তাঁর এক শিষ্য এসে বললেন, ‘বাবা আমাদের গ্রামে ভীষণ কলেরার প্রকোপ হয়েছে। গাঁ তো উজাড় হয়ে গেল! আপনি বাঁচান।’

দুর্গাপ্রসন্ন বললেন, ‘মায়ের পুজোর ব্যবস্থা কর। আগামী শনিবার রাতে পুজো করব।’

যথাসময়ে পুজো শুরু হল। দুর্গাপ্রসন্ন পুজো অন্তে মায়ের চরণে পুষ্প নিবেদন করতে যাবেন, দেখলেন, মা আসন ত্যাগ করে উঠে যাচ্ছেন। দুর্গাপ্রসন্ন বাঁ-হাত দিয়ে মায়ের পা চেপে ধরলেন। ডানহাত দিয়ে পুষ্প নিবেদন করলেন। পুজো শেষে প্রত্যূষে বাড়ি ফিরে দেখলেন, বাড়ির সবার কলেরা হয়েছে।

ঠাকুরঘরে ঢুকে গেলেন। বললেন, ‘মা, আমাকে শাস্তি দে। আমার বাড়ির লোককে কেন শাস্তি দিচ্ছিস!’

দুর্গাপ্রসন্নর কন্যাসন্তানের দেহান্ত হল। গ্রামের কলেরা বন্ধ হয়ে গেল।

বিহারের এক দরিদ্র গৃহস্থ। মেয়ের বিবাহের অর্থ জোগাড় করতে পারছেন না। বেনারস গেলেন। মা অন্নপূর্ণার মন্দিরে পড়ে রইলেন। বললেন, ‘মা, কিছু ব্যবস্থা করো।’

সারাদিন নাওয়া-খাওয়া ফেলে মন্দিরে পড়ে রয়েছেন। রাতেরবেলায় এক বৃদ্ধা রমণী এসে বললেন, ‘বাবা, তোমার কী হয়েছে? এখানে বসে আছ কেন?’

—‘মা, আমার মেয়ের বিবাহ দেব, তাই মা অন্নপূর্ণার কাছে এসেছি অর্থের জন্য।’

বৃদ্ধা বললেন, ‘আমার ছেলের রামপ্রসাদ নাম। হালিশহরে থাকে। তার কাছে যাও। সে তোমায় টাকা দেবে।’

খোঁজখবর করতে করতে সে হালিশহর উপস্থিত হল। রামপ্রসাদ তখন গঙ্গাস্নানে যাচ্ছেন। রামপ্রসাদ বললেন, ‘আমার মা বেনারসে?’ পরমুহূর্তেই বুঝলেন, কে এই মা। মুচকি হেসে মনে মনে বললেন, ‘যার কোনও চালচুলো নেই, সে আবার করবে সাহায্য!’ মুখে বললেন, ‘দেখা যাক, মায়ের কী ইচ্ছে। আপনি এখানে দাঁড়ান। আমি একটা ডুব দিয়ে আসি।’ আবক্ষ গঙ্গায় নেেম গান ধরলেন— ‘মা গো আনন্দময়ী, নিরানন্দ করো না।’ এমন সময় বজরা করে মহারাজ চলেছেন। রামপ্রসাদের গান শুনে বজরা ভেড়াতে বললেন। গান শেষে এক পোঁটলা মোহর দিয়ে চলে গেলেন। রামপ্রসাদ ওই ভদ্রলোককে বললেন, ‘দেখুন, মা আপনার টাকা পাইয়ে দিলেন।’

বুঝলাম, মা আমাদের ঘরে ঘরে বিরাজ করছেন। ঠাকুরঘরে গিয়ে বসলাম। মা দুর্গার পটমূর্তির দিকে তাকালাম। মনে হল, মা যেন বলছেন, ‘তোরা যে প্রার্থনা করছিস, শরণাগত দীনার্ত পরিত্রাণ পরায়ণে সর্বসার্তি হরে দেবী নারায়ণী নমস্তুতে, তোরা কি শরণাগত আর দীন হতে পেরেছিস?’

অন্তর বলে উঠল, না, মা, হতে পারিনি। মা যেন আবার বললেন, ‘আমি যে মা, তোদের সংসার নিয়ে এই মিথ্যে‌ খেলা ভেঙে দিতে পারি না। অপেক্ষা করি, কখন খেলা ফেলে আমার দিকে তাকাবি। তখন কোলে তুলে নেব।’

মনে হল, মা আবার বলছেন, ‘আমার কাছে সন্তানের অধিকারে চা। ভিক্ষাপাত্র হাতে নিয়ে নয়।’

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

শৈশবের ইঁদুরদৌড়

জো জিতা, ওহি সিকান্দার

আসলে ‘আমি’বলতে কী বোঝায়

বঙ্গাব্দের সূচনায় শশাঙ্কর অবদান

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৯)

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো