সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

বাংলার ইতিহাস বলতে গেলে একটি অস্পষ্ট ছবি ফুটে ওঠে। পাল ও সেন রাজাদের সম্পর্কে নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিক কালানুক্রমিক চর্চা আমাদের পাঠ্যবইগুলিতে খুব কমই মেলে। খণ্ড-বিচ্ছিন্ন উপাখ্যান ও পুনরাবৃত্তি। তারপর বিদেশি আফগান, তুর্কি ও মোগলদের কীর্তিকলাপ। বাংলার নিজস্ব ঘরানার ইতিহাসের বড়ই অভাব। আর প্রাচীন বাংলা বলতে কিছুতেই যেন শশাঙ্কর পিছনে যাওয়া যাচ্ছে না।
কিন্তু সম্প্রতি অনেকগুলি উদ্ঘাটন এই কুয়াশার আবরণ কাটিয়ে দিতে পারছে। অতি সম্প্রতি তপতী গুহঠাকুরতা ও তাঁর গবেষক গোষ্ঠী তথ্য-সহ প্রমাণ করেছেন যে, বাংলা ভাষা কম করেও আড়াই হাজার বছরের পুরোনো। আবার অনতি অতীতের অন্বেষণে আবিষ্কৃত চন্দ্রকেতুগড় দেখিয়েছে, আড়াই হাজার বছর আগের ঐতিহাসিক প্রত্নস্থল রয়েছে। বিখ্যাত গ্রিক মনীষী টলেমির জিওগ্রাফিকায় প্রাচীন গঙ্গারিডাই রাজত্বের কথা আছে।
চন্দ্রকেতুগড় বাংলার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রত্নস্থল। কলকাতা থেকে ৩৫ কিমি উত্তর-পূর্ব দিকে একদা ভাগীরথীর অন্যতম শাখানদী (বর্তমানে অবলুপ্ত) ও বিদ্যাধরীর কূলঘেঁষে এর অবস্থান। এখানকার দেগঙ্গা (এটা দেবগঙ্গা, দ্বীপগঙ্গা বা দীর্ঘগঙ্গা নামের অপভ্রংশ) গ্রামের রাজপথের সমান্তরাল এক প্রবাহিত নদীর (পদ্মা) শুষ্কখাত এখনও দেখা যায়। এই প্রত্নস্থল আনুমানিক ৪০০ থেকে ৮০০ খ্রিস্টপূর্বে গড়ে উঠেছিল।
প্রত্নস্থলে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার উৎখনন চালানো হয়েছে। উৎখননে প্রাপ্ত প্রত্নসামগ্রী চন্দ্রকেতুগড়ের প্রাচীনত্ব ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব প্রমাণ করে। এখানকার নিদর্শনাবলির প্রধান অংশ কলকাতার আশুতোষ সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু নিদর্শন শহর এবং শহরের বাইরে ব্যক্তিগত সংগ্রহেও রয়েছে। চন্দ্রকেতুগড়ে প্রাপ্ত পঞ্চচূড় অপ্সরা, নগরশ্রেষ্ঠী ও গজদন্ত শিল্প ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নামী সংগ্রহালয়ে রয়েছে। প্রত্নস্থলটিতে বর্তমানে দেবালয়, হাদিপুর, বেড়াচাঁপা, শানপুকুর, ঝিকরা ও ইটাখোলা গ্রামের অনেকটা এলাকাজুড়ে প্রাচীন নগরবসতির চিহ্ন পাওয়া যায়। মাটির তৈরি বিশাল দুর্গপ্রাচীর প্রত্নস্থলটির মূল কেন্দ্রকে প্রায় এক বর্গমাইল এলাকাজুড়ে আয়তাকারে ঘিরে রয়েছে। মাটির তৈরি এই দুর্গপ্রাচীরের অভ্যন্তরেই চন্দ্রকেতুগড়, খনা-মিহিরের ঢিবি, ইটাখোলা এবং নুনগোলা প্রভৃতি স্থানে খননের মাধ্যমে প্রাচীন ভারতের নগরসভ্যতার পাঁচটি পৃথক সাংস্কৃতিক স্তর বা পর্বের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। ওই স্থানের খনা-মিহিরের ঢিবি অংশের সঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় রাজা বিক্রমাদিত্যের সভারত্ন তথা বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ বরাহমিহির এবং তাঁর পুত্রবধূ খনার নাম যুক্ত। লোকপ্রবাদ রয়েছে যে, এখানেই খনা ও বরাহমিহিরের বাসস্থান ছিল। এছাড়া এখানে দেবালয়-এর রাজা চন্দ্রকেতুর নামে একাধিক কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে।
বিভিন্ন ঐতিহাসিকের মতে, চন্দ্রকেতুগড়ই ছিল সম্ভবত ‘প্লেরিপ্লাস’ এবং টলেমি সূত্রে উল্লিখিত বিখ্যাত প্রাচীন সমুদ্রবন্দর ‘গঙ্গারিডাই’-এর রাজধানী বা গাঙ্গে বন্দর। এই প্রত্নস্থলটির সঙ্গে জলপথে প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, বিশেষত রোমের বাণিজ্যিক যোগসূত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
অন্য পোস্ট: রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধানে বিষ্ণুর দশাবতার তত্ত্ব
ইতিহাস: প্রথম স্তর প্রাক্-উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র (Pre-NBPW) পর্যায়ের স্তরকে নির্দেশ করে।
দ্বিতীয় স্তর ৪০০ থেকে ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সময়কাল। এই স্তরের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নিদর্শনগুলির মধ্যে রয়েছে লম্বা গলার লাল মাটির পাত্র, কানাবিহীন বড় গোলাকার পেয়ালা ও বাটিকা, কালো, সোনালি এবং বেগুনি রঙের উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মাটির, ধূসর রঙের সাধারণ মাটির পাত্রের টুকরো, চোখে সুরমা লাগানোর জন্য তামার তৈরি দণ্ড ও হাতির দাঁতের সামগ্রীর খণ্ড, ছাপাঙ্কিত তাম্রমুদ্রা, লিপিবিহীন ছাঁচে ঢালা ও বিরল তাম্রমুদ্রা এবং বেশ কিছু পোড়ামাটির সামগ্রী, যার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে পুঁতি, নামাঙ্কিত সিল ও সিলমোহর। অস্থি ও গজদন্ত শিল্প, সোনা ও রুপোর গয়না, দামি ও কম দামি রত্নপাথরের বহু পুঁতির নিদর্শন মিলেছে।প্রাপ্ত এক রৌপ্যমুদ্রায় উৎকীর্ণ পাশাপাশি সারি বেঁধে দু’জন পুরুষ, একজন নারী, উপরে বাঁধানো চত্বরের মধ্যে বৃক্ষ ও বাঁদিকে মাকড়সা। মুদ্রার অন্যদিকে ত্রিশৃঙ্গ পর্বতের উপরে পেখম ছড়ানো ময়ূর, যা মৌর্যযুগের স্মারক। আর এক দুষ্প্রাপ্য রৌপ্যমুদ্রায় উৎকীর্ণ একটি একতল সমুদ্রগামী জলযান। তার অন্যদিক শুশুকের (ডলফিন) আকারে নির্মিত।
তৃতীয় স্তর কুষাণ যুগের সমসাময়িক এবং এটি আপাতদৃষ্টিতে সর্বাপেক্ষা সমৃদ্ধ। এ স্তর থেকে রোমক ‘রুলেটেড’ (নকশা করা) পাত্রের অংশবিশেষ, কালো অথবা অনুজ্জ্বল লাল (mat-red) রঙের ‘অ্যামফোরা’ (amphorae) বা গ্রিস দেশীয় মাটির পাত্রের বেশ কিছু ভাঙা অংশ, ছাপাঙ্কিত নকশাযুক্ত মনোরম লাল মাটির ধূসর পাত্র, অ্যাম্বারের অলংকার ও পুঁতি, রুলেটেড মৃৎপাত্র এবং ছাঁচে নিখুঁতভাবে তৈরি পোড়ামাটির ক্ষুদ্র মূর্তি পাওয়া গিয়েছে। এছাড়া খরোষ্ঠি লিপিযুক্ত ও শস্যবাহী জাহাজের চিত্র সম্বলিত সিলমোহর মিলেছে। এ পর্বকে খ্রিস্টীয় প্রথম তিন শতাব্দীর মধ্যে ধরা হয়। কুষাণ সম্রাট হুবিষ্কের ছবি (মাথায় মুকুট, হাতে অঙ্গুরীয়, পাশে গ্রিক হরফে প্রাচীন ফারসিতে লেখা ‘সাও-নানো সাও ওইসি কোষানো’ অর্থাৎ শাহানশাহ হুবিষ্ক কুষাণ) ও ব্যাবিলনীয় দেবী ‘নানা’র ছবি সম্বলিত স্বর্ণমুদ্রা মিলেছে। সে সময়ের তাম্রমুদ্রাগুলি চতুষ্কোণ বা গোলাকার, ত্রিচূড় পর্বত, চৈত্য, বৃক্ষ ও হাতির প্রতীকযুক্ত। নৌকো উৎকীর্ণ মুদ্রাগুলি সে যুগের বাণিজ্যের স্মারক।
চতুর্থ স্তরকে গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর যুগের বলে চিহ্নিত করা হয়। এ স্তরের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে সিল ও সিলমোহর, পোড়ামাটির সামগ্রী, ছাপাঙ্কিত নকশাযুক্ত ও ছাঁচে নির্মিত মাটির পাত্র। ১৯৬৯ সালে সিংহের আটি গ্রাম থেকে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের ধনুর্ধর মূর্তি ও লক্ষ্মীদেবীর মূর্তি সম্বলিত স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গিয়েছে। হাদিপুরে পুকুর সংস্কারকালে প্রাপ্ত কয়েকটি স্বর্ণমুদ্রার একটিতে গুপ্তরাজ প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ও লিচ্ছবি রাজকন্যা কুমারদেবীর বিবাহদৃশ্য উৎকীর্ণ। সে যুগের গৃহনির্মাণের জন্য রোদে পোড়ানো মাটির তাল দিয়ে তৈরি বড় বড় অসদৃশ ইট পাওয়া গিয়েছে। এ স্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হচ্ছে ১৪ ফুটের বেশি উচুঁ ‘সর্বতভদ্র’ রীতির ইট নির্মিত বিশাল একটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। কোনও বিশেষ দেবদেবীর সঙ্গে সম্পর্কিত করা যায়, ধর্মীয় এমন কোনও নমুনা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া যায়নি। তবে গুপ্ত স্তর থেকে সূর্য দেবতার প্রতিকৃতি একটি বেলেপাথর ফলকের নিম্নাংশে পাওয়া গিয়েছে।
অন্য পোস্ট: আর পিন কোড নয়, অব্যর্থ ঠিকানা ডিজিপিন
পঞ্চম স্তরের প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ খুবই কম। এগুলি সম্ভবত পালযুগের বলে ধরে নেওয়া হয়। প্রত্নস্থল থেকে সর্বমোট ২৭২টি রৌপ্যমুদ্রা পাওয়া গিয়েছে। প্রবীণ মানুষজনের মধ্যে সঞ্চিত দীর্ঘকালীন কিংবদন্তি এবং দুর্ভেদ্য জঙ্গলাবৃত প্রত্নস্থলটির আশপাশ থেকে প্রাপ্ত প্রত্নবস্তুর ওপর নির্ভর করে ১৯০৬ সালে স্থানীয় অধিবাসীরা এবং চিকিৎসক তারকনাথ ঘোষ আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার কাছে প্রত্নতাত্ত্বিক পরিদর্শনের আবেদনপত্র পেশ করেন। তাঁর আবেদনে সাড়া দিয়ে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের
পূর্বাঞ্চল শাখার সুপারিন্টেন্ডেন্ট মিস্টার লঙহার্স্ট পরিদর্শনে এলেও তিনি এখানকার গুরুত্ব আবিষ্কার করতে অসমর্থ হন। তারপর ১৯০৭ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রথম সম্পাদক তথা পুরাতত্ত্ববিদ নৃপেন্দ্রনাথ বসু এবং ১৯০৯ সালে খ্যাতনামা প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় স্থানটি পরিদর্শন করেন। রাখালদাসই সর্বপ্রথম চন্দ্রকেতুগড়ের প্রাচীনত্ব ও গুরুত্ব সম্যকভাবে উপলব্ধি করে এই প্রত্নস্থল সম্বন্ধে বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা দেন। কিন্তু সে সময় কিছু মূল্যবান প্রত্নবস্তু পাওয়া গেলেও কোনও উৎখনন সংঘটিত হয়নি৷ ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের ১৯২২-’২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে কাশীনাথ দীক্ষিত লেখেন, ‘চন্দ্রকেতুগড় বাংলার প্রাচীনতম জনবসতিগুলির অন্যতম।’
