বটুকৃষ্ণ হালদার

‘চে গুয়েভারা, তুমি দীর্ঘজীবী হও/ তোমার মৃত্যু আমায় অপরাধী করে দেয়।’ এভাবেই চে গুয়েভারা যুগ যুগ ধরে বিপ্লবী মন্ত্রের মূল আদর্শ হয়ে উঠেছেন যুবসমাজের চোখে। তাঁর বৈপ্লবিক আদর্শ বুকে আঁকড়ে ধরে বিপ্লবীরা অক্সিজেন খুঁজে পান।
চে গুয়েভারা ছিলেন কিউবার বিপ্লবের প্রধান ব্যক্তিত্ব। মৃত্যুর ৫০ বছর পরেও একটি পত্রিকার বিংশ শতাব্দীর সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ১০০ জন ব্যক্তির তালিকায় রয়েছে তাঁর নাম। চে গুয়েভারা একজন চিকিৎসক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, গেরিলা নেতা, কূটনীতিবিদ, সমরতত্ত্ববিদ এবং আর্জেন্টিনীয় মার্কসবাদী বিপ্লবী ও কিউবার বিপ্লবের প্রধান ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রকৃত নাম এর্নেস্তো গেভারা দে লা সের্না। তবে গোটা বিশ্ব তাঁকে সাধারণত লা চে বা কেবল চে নামেই জানে। ১৯২৮ সালের ১৪ জুন তিনি আর্জেন্টিনার সান্তা ফে শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পরিবারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। ছোটবেলা থেকেই তাঁর চরিত্রে অস্থির চপলতা দেখে বাবা বুঝতে পেরেছিলেন যে, আইরিশ বিদ্রোহের রক্ত তাঁর এই ছেলের ধমনীতে বইছে। খুব শৈশব থেকেই সমাজের বঞ্চিত, অসহায়, দরিদ্রদের প্রতি একধরনের মমত্ববোধ তাঁর ভিতর তৈরি হতে থাকে। একটি সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারার পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে খুব অল্প বয়সেই তিনি রাজনীতি সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান লাভ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন স্পেনের গৃহযুদ্ধে প্রজাতন্ত্রবাদীদের একজন গোঁড়া সমর্থক। সে সংঘর্ষের সৈনিকদের তিনি প্রায়ই বাড়িতে থাকতে দিতেন। হাঁপানিতে সারাজীবন ভোগা সত্ত্বেও চে দারুণ মল্লবিদ ছিলেন। তাঁর পছন্দের খেলধুলার তালিকায় ছিল সাঁতার, ফুটবল, গলফ, শুটিং। তিনি সাইক্লিংয়ে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। রাগবি ইউনিয়নের একজন অতি আগ্রহী সদস্য ছিলেন এবং বুয়েনস এয়ারস বিশ্ববিদ্যালয় রাগবি দলের হয়ে খেলেছেনও। তাঁর বিদ্যালয়ের সহপাঠীরা তাঁকে ডাকতেন চানচো বলে, কারণ তিনি অনিয়মিত স্নান করতেন এবং সপ্তাহে একবার মাত্র পোশাক পালটাতেন।
চে ১২ বছর বয়সে দাবা খেলা শেখেন তাঁর বাবার কাছে এবং স্থানীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন। বয়ঃসন্ধি থেকে শুরু করে সারাটা জীবন তিনি কবিতার প্রতি আসক্ত ছিলেন, বিশেষ করে পাবলো নেরুদা, জন কিটস, এন্টনিও মারকাদো, ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা, গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল এবং ওয়াল্ট হুইটম্যানের কবিতা। তিনি ভালো কবিতা আবৃত্তি করতে পারতেন। না দেখে আবৃতি করতে পারতেন রুডিয়ার্ড কিপলিংয়ের ‘ইফ’ এবং জোসে হার্নান্দেজের ‘Martin Fierro’ কবিতা। নিজের সংগ্রহে থাকা ৩০,০০০-এরও বেশি বই চে-কে করে তুলেছিল একজন জ্ঞানপিপাসু ও অক্লান্ত পাঠক। তাঁর কাছে ছিল কার্ল মার্কস, উইলিয়াম ফকনার, এমিলিও সলগারির বই। পাশাপাশি জওহরলাল নেহরু, আলবেয়ার কামু, লেনিন, রবার্ট ফ্রস্টের বইও তিনি পড়তেন।
১৯৪৮ সালে যুবক বয়সে চে বুয়েনোস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তি হন। ভালোই চলছিল তাঁর ডাক্তারি পড়াশোনা, ব্যক্তিগত জীবন আর প্রেম। একসময় বন্ধুর সঙ্গে হঠাৎ মোটর সাইকেলে বের হন নিজ ভূখণ্ড ভ্রমণে। সে ভ্রমণ তাঁকে বঞ্চিত মানুষের ‘চে’ বা ‘বন্ধু’তে পরিণত করে।
দীর্ঘ মোটর সাইকেল ভ্রমণে চে দেখেন একদিকে নিম্নশ্রেণির মানুষের দুঃখ, দুর্দশা, বঞ্চনা, নিপীড়ন, অন্যদিকে শাসকের দুর্বৃত্তায়ন, শোষণ, অত্যাচার। এ বোধ থেকেই শুরু করেন মানবমুক্তির লড়াই। ব্যক্তিগত সুখ-শান্তি, আনন্দ, সচ্ছলতা, নাম-যশের মোহ অবজ্ঞায় দূরে ঠেলে রাস্তায় নামেন সামগ্রিক ও যৌথ সমাজে শান্তিতে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে। এ শুধু রক্তের নয়, ভালোবাসারও লড়াই। না হলে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে ভালোবেসে নিজের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে নামার সাহস সবার হয় না।
অন্য পোস্ট: সব কাজে আজও আমি বাবার কাছে অনুমতি নিই: পি সি সরকার জুনিয়র
একসময় চে রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানের নেতৃত্বাধীন গুয়াতেমালার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৪ সালে সিআইএ-র ষড়যন্ত্রে গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে চে-র বৈপ্লবিক আদর্শ ও চেতনা আরও বদ্ধমূল হয়। পরবর্তীকালে মেক্সিকো সিটিতে বসবাসের সময় তাঁর সঙ্গে রাউল ও ফিদেল কাস্ত্রোর আলাপ হয়। চে তাঁদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন। মার্কিন মদতপুষ্ট কিউবান একনায়ক ফুলজেনসিও বাতিস্তাকে উৎখাত করার জন্য সমুদ্রপথে কিউবায় প্রবেশ করেন। খুব অল্পদিনেই চে ফিদেলের বিপ্লবী সংঘের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। সেকেন্ড-ইন-কমান্ড পদে তাঁর পদোন্নতি হয় এবং বাতিস্তা সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যে দু’ছর ধরে চলা গেরিলা সংগ্রামের সাফল্যের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
কিউবার বিপ্লবের পর চে নতুন সরকারে একাধিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য, বিপ্লবী আদালতে যুদ্ধাপরাধী হিসাবে অভিযুক্তদের আপিল পুনর্বিবেচনা ও তোপচিদল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড প্রদান, শিল্পোদ্যোগ মন্ত্রী হিসাবে খামার সংস্কার আইন প্রবর্তন, কিউবার জাতীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর ইনস্ট্রাকশনাল ডিরেক্টরের ভূমিকা পালন এবং কিউবান সমাজতন্ত্রের প্রচারে বিশ্ব পর্যটন। এই পদাধিকারের কল্যাণে তিনি মিলিশিয়া বাহিনীকে প্রশিক্ষণ প্রদানের সুযোগ পান। ফলে এই বাহিনী পিগস উপসাগর আক্রমণ করে তা পুনর্দখলে সক্ষম হয়। কিউবায় সোভিয়েত পরমাণু ব্যালিস্টিক মিসাইল আনার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। চে ছিলেন এক বিশিষ্ট লেখক ও ডায়েরি লেখক। তরুণ বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকায় মোটর সাইকেলে ভ্রমণের স্মৃতিকথাটি তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় রচনা। বৃহত্তর বিপ্লবে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৬৫ সালে কিউবা ত্যাগ করেন। প্রথমে কঙ্গো-কিনসহাসায় তাঁর বিপ্লব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তারপর তিনি বলিভিয়ায় বিপ্লবে অংশ নেন। সেখানেই সিআইএ মদতপুষ্ট বলিভীয় সেনাদের হাতে বন্দি ও নিহত হন।
১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর ভোরবেলা। বলিভিয়ার দুর্গম ও সংকীর্ণ ইউরো গিরিখাতের চারদিকে বারুদের গন্ধ। হ্যান্ড মেশিনগান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসছে গুলি। মাঝেমধ্যে মানুষের আর্তনাদ ভেসে আসছে। বলিভীয় রেঞ্জারদের এক ইনফর্মার দুর্গম ও সংকীর্ণ ইউরো গিরিখাতের মধ্যে সেই মানুষটির গোপন গেরিলা ক্যাম্পের হদিশ পেয়েছিল। যিনি আর্জেন্টিনার মানুষ হওয়া সত্ত্বেও কিউবাকে স্বাধীন করতে রক্ত ঝরিয়েছেন। এবার তাঁর লক্ষ্য বলিভিয়ার স্বাধীনতা। ইউরো গিরিখাতের মধ্যে মাসের পর মাস পড়ে রয়েছেন। আমেরিকা ক্ষিপ্ত হায়নার মতো তাঁকে বছরের পর বছর খুঁজে বেড়াচ্ছে। সূর্যোদয়ের আগেই জঙ্গল ঘিরে ফেলেছিল আমেরিকা থেকে প্রশিক্ষিত দুই ব্যাটেলিয়ন বলিভীয় সেনা। সংখ্যায় তারা ১,৮০০। বৃত্ত ছোট করতে করতে ক্রমশ এগিয়ে আসছে তারা। বিপ্লবীর মাথার চুলে জট ধরেছে। সারা গায়ে ধুলো। পোশাক ছেঁড়া। লেগে রয়েছে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত। গুলিতে রক্তাক্ত তাঁর দুই পা। হাতের রাইফেল ছিটকে ঝোপের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছে। একটি গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে পকেট থেকে হাভানা চুরুট বের করতে যাবেন, এমন সময় তাঁকে ঘিরে ফেলে কয়েকজন বলিভীয় সেনা। তিনি বুঝতে পারেন, পালানো অসম্ভব। শান্তভাবে বলেন, ‘গুলি করো না। আমি চে গুয়েভারা। মৃত চে গুয়েভারার চেয়ে জীবিত চে গুয়েভারার দাম অনেক বেশি।’
অন্য পোস্ট: শিক্ষকদের বিক্ষোভ সামলাতে পুলিশের অস্ত্র ‘লাথিচার্জ’
মুহূর্তের মধ্যে হাত বেঁধে ফেলা হল চে-র। বলিভীয় সেনারা তাঁকে প্রায় চার মাইল হাঁটিয়ে নিয়ে যায় লা হিগুয়েরা শহরের বাইরে এক স্কুলবাড়িতে। শুরু করে জিজ্ঞাসাবাদ। সরাসরি প্রশ্নকর্তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে একের পর এক প্রশ্ন শুনে চলেছেন চে। কিন্তু উত্তর দিচ্ছেন না। মুখ খোলানোর জন্য শুরু করে অকথ্য অত্যাচার। বুটের লাথি, ছুরির খোঁচা, সিগারেটের ছ্যাঁকা, কিছুই বাকি ছিল না। কিন্তু মুখ খোলেননি চে। হাত বাঁধা অবস্থাতেই বলিভিয়ান আর্মি অফিসার এসপিনোসাকে জোড়া পায়ে লাথি মেরে দূরের দেওয়ালে ফেলে দেন চে। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে বলিভিয়ার রিয়ার অ্যাডমিরাল উগার্তেচের মুখে থুতু দেন তাঁর সঙ্গে নোংরা ভাষায় কথা বলার জন্য।
১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট রেনে ব্যরেন্টোস সকাল ১০টা নাগাদ চে-কে হত্যা করার আদেশ দেন। কিন্তু চে-র এমনই ক্যারিসমা যে, কেউ রাজি হননি সে কাজ করতে। শেষমেশ মারিও টেরান নামে এক বলিভিয়ান সার্জেন্টকে প্রচুর মদ খাইয়ে রাজি করানো হয় সে কাজ করতে। কমান্ডার ফেলিক্স রড্রিগেজ চে-কে জানান সে কথা। একজন সেনা অফিসার চে-কে জিজ্ঞেস করেন, তিনি তাঁর অমরত্বের কথা চিন্তা করছেন কি না। তখন চোখে চোখ রেখে চে বলেছিলেন, ‘না, আমি চিন্তা করছি বিপ্লবের অমরত্বের কথা।’ বেলা ১২টা নাগাদ ফের ঘরে ঢুকলেন রড্রিগেজ। চে হাঁটু মুড়ে বসেছিলেন। দরজা খোলার শব্দে মুখ তুলে তাকান। রড্রিগেজ চে গুয়েভারাকে বলেন, মৃত্যু আসন্ন। চে কোনও কথা বলেননি। তারপর রড্রিগেজ ঘরের বাইরে বেরিয়ে যান। মারিও টেরান ঘরে ঢুকলেন। ঘাতকের দিকে চোখ তুলে তাকালেন চে নিস্পৃহ দৃষ্টিতে। বললেন, ‘আমি জানি, তুমি আমাকে মারতে এসেছ।’ এ কথা বলে মৃদু হাসলেন। আর বললেন, ‘নাও, গুলি করো। তুমি কেবল একজন মানুষকে মারতে পারবে। তার মতাদর্শকে নয়।’ টেরান আর কিছু না বলে M2 কারবাইনের পুরো ম্যাগাজিনটাই শেষ করে দিলেন। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন চে গুয়েভারা। দুপুর ১টা ১০ মিনিটে বলিভিয়া সরকার চে গুয়েভারাকে মৃত বলে ঘোষণা করে। তাঁর শবদেহ লুকিয়ে রাখা হয় একটি হাসপাতালের লন্ড্রির চৌবাচ্চায়। তাঁর ছবি এক আলোকচিত্রী লুকিয়ে তুলে ছড়িয়ে দেন চারদিকে। মৃত্যুর পরও নিস্তার মেলেনি চে-র। সরকারের আদেশে বলিভিয়ান কমান্ডাররা মৃত চে-র হাত দুটো কবজি থেকে কেটে নিয়েছিলেন, যাতে তাঁর ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যায় এবং তাঁর বন্ধু ফিদেল কাস্ত্রোকে বোঝানো যায়, চে মৃত।
তবে চে-র মৃত্যু হয়নি। আজও কিউবার সান্টাক্লারায় চে-র সমাধিতে সারাবিশ্ব থেকে ফুল দিতে যান বহু মানুষ। আজও চে গুয়েভারার বধ্যভূমি বলিভিয়ার স্কুল বাড়িটি মানুষ দেখতে যায়। সেই হাসপাতালের লন্ড্রিটি বলিভিয়ার মানুষ সংরক্ষণ করে রেখেছে। লা হিগুয়েরা শহর পাহারা দিচ্ছে চে গুয়েভারার সুবিশাল ব্রোঞ্জ মুর্তি। নীচে লেখা আছে ‘তুমিই এনেছ নতুন প্রভাত’। আমৃত্যু দিয়েগো মারাদোনার হাতে আঁকা ছিল চে-র উল্কি।
বিপ্লব কখনও বিপ্লবীর মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। চেও তাই বেঁচে থাকবেন আজকের ও আগামীর বিপ্লবীদের মধ্যে।

