অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

একময় কলকাতা পুলিশকে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের পুলিশের সঙ্গে তুলনা করা হত। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড ব্রিটিশ নিরাপত্তা সংস্থার নাম। বিশ্ব বিখ্যাত এই পুলিশ সংস্থার সদর দফতর লন্ডনে। তারা যে কোনও ক্রিমিনাল কেসের তদন্ত করে সহজেই প্রকাশ করে ফেলতে পারে। একটা সময় ছিল, কলকাতা পুলিশের হেড কোয়ার্টার ‘লালবাজার’-এর নাম ব্রিটিশ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সঙ্গে উচ্চারিত হত। আর আজ কলকাতা পুলিশ বোধ হয় রাজনীতির জাতাঁকলে নিজেদের দায়িত্ব ভুলে গিয়েছে। একটা কথা প্রচলিত আছে, পুলিশের অসাধ্য কিছু নেই। পুলিশ চাইলে সব করতে পারে। অর্থাৎ সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট আমলের শেষ দিকে যেমন পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল, এখন যেন তার পুনরাবৃত্তিই দেখতে পাচ্ছি।
অনেকেই বলেন, রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছু নেই। এর একটা কারণ প্রতিদিনের সংবাদপত্র দেখলেই বোধ হয় পরিষ্কার হয়ে যায়। এমন কোনও দিন নেই, যেদিন রাজ্যে কোনও না কোনও মেয়ে ধর্ষিতা হচ্ছে না। এখন ধর্ষণের তালিকায় তিন বছরের শিশু থেকে বৃদ্ধা, কেউ বাদ যান না।
আমরা দেখেছি, আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রীর নৃশংস খুনের ঘটনা এবং তার পরবর্তী অবস্থা। একজন উদীয়মান মহিলা চিকিৎসক সরকারি হাসপাতালে তাঁর কর্মস্থলে খুন হলেন এবং তার সুরাহা কলকাতা পুলিশ করতে পারেনি। খুনের রহস্যভেদ করতে পারেনি কলকাতা পুলিশের সদর দফতর লালবাজার। আজও তিলোত্তমার মা রাস্তায় রাস্তায় ন্যায়বিচারের দাবিতে ঘুরছেন।
একটা কথা প্রচলিত আছে, একবার সরকারি চাকরিতে ঢুকলে তা আর যায় না। এই ‘মিথ’ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ২৫,৭৫২ জনের চাকরি বাতিল হওয়ায়। হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্ট বারবার স্কুল সার্ভিস কমিশন এবং রাজ্যের শিক্ষা দফতরকে যোগ্য-অযোগ্য শিক্ষকদের তালিকা দেওয়ার কথা বলেছে। কিন্তু তারা তা দেয়নি। ফলে সুপ্রিম কোর্ট এই ঐতিহাসিক রায় দিতে বাধ্য হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে দু’জনের বেঞ্চ এই রায় দিয়েছে।
২৫,৭৫২ জন শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁদের স্ত্রী, বৃদ্ধ বাবা-মা, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া। বাড়ির কাজের লোক, যিনি বাবুর মাইনের ওপর নির্ভর করে থাকেন। জড়িয়ে রয়েছেন মুদিখানার দোকানদাররা, যাঁরা মাস্টারমশাইদের মাসকাবারি মালপত্র নিশ্চিন্তে গত ৮-১০ বছর ধরে দিয়ে এসেছেন। এখন কি তাঁরা মাস্টারমশাইদের মালপত্র দেবেন? কোন ভরসায় দেবেন? সরকারি চাকরি কোনও দিন যাবে না, এই ‘মিথ’ যেমন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল, তেমনই বিভিন্ন ক্ষেত্রের দোকানদাররা হারালেন তাঁদের নিয়মিত খদ্দের। অর্থাৎ কয়েকজন অযোগ্য প্রার্থীকে টাকার বিনিময়ে চাকরি বেচে আজ সমাজের দফারফা করে দিলেন অদৃশ্যে থাকা দুর্নীতির মাথারা। আর এর প্রতিবাদে যোগ্য চাকরি প্রার্থীরা জেলার বিভিন্ন ডি আই অফিস ‘তালাবন্ধ করার ডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু চাকরিহারা শিক্ষকদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। পুলিশকে এতদিন বিক্ষোভ সামলাতে দেখেছি জল কামান, কাঁদানে গ্যাস, লোহার ব্যারিকেড ব্যবহার করে, কিন্তু কসবা ডি আই অফিসে চাকরিহারা শিক্ষকদের বিক্ষোভ সামলাতে নতুন অস্ত্র আমদানি করা হয়েছে। তা হল, ‘লাথিচার্জ’। যোগ্যরা শিক্ষকরা তো ক্রিমিনাল নন। তাঁরা স্কুল সার্ভিস কমিশন, মধ্য শিক্ষা পর্ষদে কিছু আধিকারিকের মদতে টাকার বিনিময়ে সাদা ওএমআর শিট জমা দিয়ে, র্যাঙ্ক জাম্প করে চাকরি পাওয়া শিক্ষক নন। পরীক্ষা দিয়ে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষকতার পেশায় এসেছেন মানুষ গড়বেন বলে। যাই হোক, ইতিহাস বলে, ক্ষমতায় কেউ চিরস্থায়ী নয়।
