অশোক বসু

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে আঁতলামি আছে, কিন্তু ফাজলামি নেই। দয়া করে ‘ফাজলামি’ শব্দটিকে খাটো করে দেখবেন না। ‘কোম্পানির ফোরম্যান আছে, বিফোরম্যান নেই?’ এ ধরনের আটপৌরে কাব্যিক ফাজলামি একমাত্র শিবরাম চক্রবর্তীর দ্বারাই সম্ভব ছিল। এখনকার লেখকরা, যাঁরা হাসির গল্প বা রম্যরচনা লেখেন, তাঁদের কাছ থেকে অনেক কিছুই আশা করেছিলাম আমরা, কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি, তাঁরা আমাদের সে আশা পূরণ করতে পারেননি। সেগুলিকে ঠিক হাসির গল্প বা রম্যরচনা বলা যায় না। এখন যেভাবে চলছে, সেভাবে চললে অদূর ভবিষ্যতে যে এ বিষয়ে মিরাকল ঘটবে, তেমনটিও আশা করি না।
আধুনিক বাংলা সাহিত্য নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, মানে মূলত যাঁরা লেখালেখি করেন, তাঁদের মধ্যে একটা প্রবণতা দেখা যায়, সেটি হল, তাঁরা প্রথম থেকেই খুব সিরিয়াস বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি বুঝতে পারবেন। আপনি যদি কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে যান, তবে দেখবেন, সেখানকার বেশির ভাগ আড্ডাবাজ লেখক বা ভবিষ্যতের লেখক, কাফকা, কামু, কুন্দেরা, এ ধরনের সব লেখকদের রচনা নিয়েই আলোচনা করছেন। সব গুরুগম্ভীর বিষয়। তাঁরা শুরু করেন আঁতলামি দিয়ে। এভাবেই বেশ কিছুদিন চলে। তাঁদের কেউ কেউ দু’-চারটি ভালো গল্প লেখেন, ছাপা-টাপা হয়। তারপর আর তেমন কিছু ঘটে না। দু’-চারজন নাম-টাম করেন কিছুটা। তবে তাঁরা আর আঁতলামি থেকে নামতে পারেন না।
ভাবে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে আঁতেল লেখকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তাঁদের যদি বলা হয়, রম্যরচনা বা হাসির লেখা নিয়ে চর্চা করতে, উত্তরে তাঁরা তখন একধরনের হাসি হাসেন, যার অর্থ, রসসাহিত্য নিয়ে চর্চা করা মানে নিম্নমানের সাহিত্য সৃষ্টি করা। তাঁরা তাই বাংলা সাহিত্যে হাসি থাকল বা না থাকল, সেসব নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামান না।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে যাঁরা প্রতিষ্ঠিত লেখক, তাঁদের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে হাসির গল্প লিখে আসছেন, এমনটি এখন আর কেউ নেই। একমাত্র সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের নাম বলা যেতে পারে। তবে তিনি বেশ কিছুদিন ধরে আর হাসির গল্প লিখছেন না। তাছাড়া তাঁর অনেক বয়স হয়েছে। পৃথিবীর আর কোনও মেজর ভাষায় এমন ঘটনা ঘটেছে কি না, আমার জানা নেই।
এখন যে প্রশ্নটি আমাদের সামনে চলে এল, তাহলে কি আমরা যাঁরা সাহিত্যপ্রেমী, বাংলা সাহিত্যের এই অবস্থাটা মেনে নিয়ে যেমন চলছে, তেমন চলার পক্ষে রায় দিয়ে চুপ করে বসে থাকব? আমরা মানে যাঁরা বাংলা সাহিত্যের সার্বিক উন্নতি চাই, তাঁরা কখনওই এ ধরনের অবস্থাকে মেনে নিতে পারি না।
অন্য পোস্ট: নিজেকে সন্তুষ্ট করতে গীতাপাঠ জরুরি
রসসাহিত্য একসময় বাংলা সাহিত্যের অহংকার ছিল। বাংলার সেই রসসাহিত্যকে পুনরুদ্ধার করতে হলে এখন আমাদের ঠিক কী কী করা উচিত ? আমরা এ বিষয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকতে পারি না। কিছু চেষ্টা তো করতেই পারি আমরা। আমার পরামর্শ হল, ১) সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সরকারি প্রতিযোগিতার কথা আমরা জানি। বিভিন্ন ক্যাটেগরিতে প্রাইজ দেওয়া হয়। কিন্তু রসসাহিত্যের ওপর কোনও পুরস্কার নেই। এবার থেকে হাসির লেখার ওপর প্রাইজ দিতে হবে।
সরকারি বিষয় দিয়ে শুরু করলাম, কারণ আমাদের মুখ্যমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী দু’জনই সাহিত্যপ্রেমী। তাঁরা আবার দু’জনই সুপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক। সুতরাং এ বিষয়ে আমরা আশা রাখতেই পারি। ২) বেসরকারি ক্ষেত্রেও রসসাহিত্যে সম্পর্কিত প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে। রাজ্যে সাহিত্যানুরাগী স্পনসরের অভাব নেই। ৩) বিভিন্ন খবরের কাগজ, ম্যাগাজিনে রম্যরচনা, হাসির গল্প, কবিতা, ছড়া, নিয়মিত ছাপতে হবে। রসসাহিত্যের ওপর নানা ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে, যাতে লেখকরা এ ধরনের লেখালেখিতে বেশি করে উৎসাহী হন। ৪) সাহিত্যের বিভিন্ন ফোরামে হাসির ওপর লেখালেখি নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কসভার আয়োজন করতে হবে। ৫) সরকারি ও বেসরকারি লাইব্রেরিতে রসসাহিত্যের বই বেশি করে রাখতে হবে এবং পাঠকদের সেসব বই পড়ার জন্য উৎসাহ দিতে হবে।
বাংলা সাহিত্য একসময় এ ধরনের রচনায় পরিপূর্ণ ছিল। আধুনিক যুগে বাংলা সাহিত্যে সে ধারাকে পুনরুদ্ধার করতে হলে উক্ত পন্থা অবলম্বন করলে কিছুটা ফল নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তবে এটাও ঠিক, অনেক কিছু নির্ভর করে পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ার ওপর। কালচারাল ক্লাইমেট বলে একটা কথা আছে। বাংলা সাহিত্য নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁরা সবাই সিরিয়াস সাহিত্য ভালোবাসেন, এমন কথা প্রায়ই শোনা যায়। আসলে ঘটনাটা তা নয়। রসসাহিত্যের মান উন্নয়ন করলে সাহিত্যপ্রেমীরা ফের এ ধরনের সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হবেন। দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি, এখন হাসির গল্প ও রম্যরচনা বলে যেসব লেখাকে চালানো হয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলি পড়ে মনে হয়, হয় কাতুকুতু দিয়ে হাসানো, নয়তো যৌনতার মোড়কে পরিবেশন করা। আমরা সাধারণ সাহিত্যপ্রেমী পাঠকরা এ ধরনের লেখা চাই না। সহজ, সরল ও সাবলীল লেখাই পাঠককে বেশি আকর্ষণ করে। এটা ঠিক, তার মধ্যে নির্মল সাহিত্য রস থাকবে।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের লেখক, কবি ও প্রাবন্ধিকদের কাছে আমার অনুরোধ, দয়া করে বাংলা সাহিত্য থেকে রসরচনা হারিয়ে যেতে দেবেন না। আপনারা সিরিয়াস লেখা নিয়ে চর্চা করুন। তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে হিউমার পুনরুদ্ধারের বিষয়ে আরও একটু বেশি সিরিয়াস হন।
