সুদীপনারায়ণ ঘোষ

তিন বন্ধু বিনয়, বাদল ও দীনেশ ব্রিটিশ আধিকারিকদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করতে কলকাতা পুলিশের আইজি কর্নেল এন এস সিম্পসন ও অন্য ব্রিটিশদের হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। সে পরিকল্পনা থেকেই রাইটার্স বিল্ডিং সচিবালয়ে হামলা হয়। ১৭৭৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জুনিয়র কর্মচারীদের থাকার জন্য টমাস লিয়নের পরিকল্পিত রাইটার্স বিল্ডিং এখনও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সচিবালয় হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
বিনয়কৃষ্ণ বসু বর্তমান বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার রোহিতভোগ গ্রামে ১৯০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জন্মেছিলেন। ম্যাট্রিক পাশ করে তিনি মিটফোর্ড মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তি হন। ঢাকায় বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিনয় বিপ্লবী যুগান্তর পার্টির গুপ্ত ‘মুক্তি সংঘে’ যোগ দেন।
বাদল গুপ্তের জন্ম ঢাকার বিক্রমপুর অঞ্চলের পূর্ব শিমুলিয়া গ্রামে। বিক্রমপুরের বানারিপাড়া স্কুলে শিক্ষক নিকুঞ্জ সেনের দ্বারা তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। পরে তিনি বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের সদস্য হিসাবে যোগদান করেন এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হন। বাদল তাঁর দুই মামা প্রয়াত ধরণীনাথ গুপ্ত ও নগেন্দ্রনাথ গুপ্তের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে প্রভাবিত হয়েছিলেন। দু’জনই আলিপুর বোমা মামলায় জড়িত হয়ে অরবিন্দ ঘোষের সঙ্গে কারাবরণ করেছিলেন।
দীনেশ গুপ্ত ১৯১১ সালের ৬ ডিসেম্বর বর্তমান বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার জোশোলং গ্রামে জন্মেছিলেন। ঢাকা কলেজে অধ্যয়নকালে ১৯২৮ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশন চলাকালীন তিনি সুভাষচন্দ্র বসুর বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সে যোগ দেন। ওই বছরেই বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশন শেষ হওয়ার পরেও মেজর সত্য গুপ্তের নেতৃত্বে এই দল তার কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। মেজর সত্য গুপ্ত মেদিনীপুরে কিছু সময় কাটিয়ে স্থানীয় বিপ্লবীদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁরা তাঁদের বিপ্লবী তৎপরতার জন্য পরিচিত ছিলেন।
বাংলার বিভিন্ন জেলে পুলিশি নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ১৯৩০ সালে ‘অপারেশন ফ্রিডম’ শুরু হয়। এই লক্ষ্যে বেঙ্গল ভলান্টিয়াররা কুখ্যাত ব্রিটিশ আধিকারিকদের নির্মূল অভিযান শুরু করে। ১৯৩০-এর আগস্টে দলটি ঢাকার পুলিশ ইন্সপেক্টর জেনারেল লোম্যানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। শেষ পর্যন্ত বিনয় ঢাকার মেডিক্যাল স্কুল হাসপাতালে তাঁকে গুলি করে কলকাতায় চলে আসেন।
১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর ব্রিটিশ শাসনকালে কলকাতা শহরের প্রাণকেন্দ্র রাইটার্স বিল্ডিং সেদিন যথারীতি কর্মমুখর ছিল। ব্রিটিশ ও বাঙালি অফিসার এবং কেরানিরা নিজেদের নিত্যকার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তখনই তিনজন সে নীরবতা ভেঙে গর্জন করে ওঠেন। ত আজও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
ওইদিন হঠাৎ তাণ্ডব শুরু হয়। ইউরোপীয় পোশাক পরা তিন যুবক আড়াল থেকে আইজি প্রিজন কর্নেল এন এস সিম্পসনের ওপর গুলি চালান। তিনি রাজনৈতিক বন্দিদের নিষ্ঠুর নিপীড়নের জন্য কুখ্যাত ছিলেন। শীঘ্রই ব্রিটিশ পুলিশ তিন বিপ্লবীকে ঘিরে ফেলে। পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংক্ষিপ্ত বন্দুকযুদ্ধ হয়। ব্রিটিশ অফিসার টোয়াইনাম, প্রেন্টিস এবং নেলসন গুলিতে গুরুতর আহত হন। ব্রিটিশরা এই ত্রয়ীকে পরাস্ত করতে সক্ষম হলেও তিন বিপ্লবী আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করেন। বাদল গুপ্ত সঙ্গে সঙ্গে পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে নিয়েছিলেন আর বিনয় ও দীনেশ আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে নিজেদের সোজাসুজি গুলি করেন। বিনয় ১৩ ডিসেম্বর, ১৯৩০ এক হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
কেবল দীনেশই বেঁচে ছিলেন। সরকার বিরোধী কর্মকাণ্ড ও হত্যার কারণে তাঁকে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৩১-এর ৭ জুলাই আলিপুর জেলে ১৯ বছর বয়সে তিনি ফাঁসিতে ঝুলে শহিদ হন।
মহাকরণের সেই অলিন্দ যুদ্ধ প্রায় একঘণ্টা চলে। দীনেশ গুপ্তকে বন্দি করে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে রাখা হয়েছিল। ফাঁসির দু’দিন আগে তাঁকে ফাঁসির মঞ্চের পাশের কুঠুরিতে রাখা হয়।

১৯৩০-এর ৮ ডিসেম্বরের শীতের দিনে তিন যুবক অমরত্ব অর্জন করেছিলেন। দু’জনের বয়স ছিল ২২ বছর এবং তৃতীয়জনের মাত্র ১৯। তাঁদের সম্মানে ডালহৌসি স্কোয়ারের নামকরণ করা হয় বিবাদী বাগ। তিনজন অসমসাহসী যুবক ব্রিটিশ অফিসারদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। এই তিন বিপ্লবী আন্দোলনের রাশ নিজেদের হাতে নিজেরাই নিয়েছিলেন। আমরা তাঁদের আত্মত্যাগকে সম্মান করি ও স্মরণ করি।

