Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

বিশ্ব জল দিবস ভারতে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ

Share Links:

কাজল মুখার্জি

একটি দিন, যা আমাদের জলের অপরিসীম গুরুত্ব এবং এর সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯৯৩ সাল থেকে জাতিপুঞ্জের উদ্যোগে পালিত এই দিনটি ভারতের মতো একটি বিশাল ও বৈচিত্রময় দেশের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

২০২৫ সালের ২২ মার্চে যখন জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যার চাপ এবং দূষণের কারণে বিশুদ্ধ জলের সংকট ক্রমশ প্রকট হচ্ছে, তখন ভারতের প্রেক্ষাপটে দিনটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ভারতের জন্য জল কেন গুরুত্বপূর্ণ? ভারতের অর্থনীতি, কৃষি এবং সংস্কৃতি, সবকিছুই জলের ওপর নির্ভরশীল। গঙ্গা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, নর্মদা, গোদাবরীর মতো নদীগুলি শুধু জলের উৎস নয়, এগুলি ভারতের জনজীবনের প্রাণ। কিন্তু আজ ভারতের মোট জলের মাত্র ৪% বিশুদ্ধ পানযোগ্য, যেখানে বিশ্বের ১৭% জনসংখ্যা এখানে বাস করে। এই অসামঞ্জস্যের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে জলসংকটের ভয়াবহতা।

উত্তর ভারতের শুষ্ক মরুভূমি থেকে দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চল, পূর্বের বর্ষাপ্রবণ এলাকা থেকে পশ্চিমের শিল্পকেন্দ্র, প্রতিটি জায়গায় জলের চাহিদা ও সমস্যা ভিন্ন। ভারতে জলের সমস্যা বহুমুখী। উত্তর ভারতের পঞ্জাব, হরিয়ানার মতো রাজ্যে ভূগর্ভস্থ জলস্তর অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে দ্রুত নীচে নেমে যাচ্ছে। দিল্লি, মুম্বইয়ের মতো মহানগরে দূষণ আর জনসংখ্যার চাপে পানীয় জলের সংকট তীব্র। গঙ্গা ও যমুনার মতো নদীগুলি শিল্প বর্জ্য, প্লাস্টিক আর নর্দমার জলে দূষিত। দক্ষিণে তামিলনাড়ু, কর্ণাটকের মতো রাজ্যে নদীর জল ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ চলছে। আবার উত্তর-পূর্বে বন্যা আর পশ্চিমে খরা। জলের অসম বণ্টন ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে দিনটি শুধু সচেতনতা নয়, কার্যকর পদক্ষেপের জন্যও। সরকারের ‘জলশক্তি অভিযান’, ‘নমামি গঙ্গে’র মতো প্রকল্পগুলি জল সংরক্ষণ ও নদী পরিচ্ছন্নতার দিকে এগিয়ে গেলেও জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া এগুলি পুরোপুরি সফল হবে না।

২০২৫ সালে এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জলের প্রতিটি ফোঁটা অমূল্য এবং এটি রক্ষা করা আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব।

জল সংরক্ষণের উপায়: বাড়িতে প্রয়োজন ছাড়া কল বন্ধ রাখা, বৃষ্টির জল সংগ্রহের ব্যবস্থা করা, নদী বা জলাশয়ে আবর্জনা না ফেলা, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো। গ্রাম-শহরে জলাশয় পরিষ্কার বা গাছ লাগানোর মতো কাজে অংশ নেওয়া। জলের অপচয় করে তৈরি হওয়া পণ্য কম কেনা। উদাহরণ, একটি জিন্স তৈরিতে ৮০০০ লিটার জল লাগে।

একটি চমকপ্রদ তথ্য, ভারতের শহরগুলিতে প্রতিদিন প্রায় ৪০% জল পাইপ ফুটো বা অপচয়ে নষ্ট হয়। এই পরিমাণ জল বাঁচালে কয়েক কোটি মানুষের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

ভারতের ঐতিহ্যে জলের পবিত্রতার যে সম্মান ছিল, সে মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার জন্য আসুন, বিশ্ব জল দিবসে প্রতিজ্ঞা করি, জল বাঁচাব, জীবন বাঁচাব। কারণ জলই জীবন।

ভারতের কিছু উল্লেখযোগ্য জল প্রকল্প:

জল জীবন মিশন

২০২৪ সালের মধ্যে গ্রামীণ ভারতের প্রতিটি ঘরে নলের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত ১৩ কোটিরও বেশি গ্রামীণ পরিবারে জলের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন ৫৫ লিটার প্রতি ব্যক্তি হিসাবে জল সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ উদ্যোগ। গ্রামীণ মহিলাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে জল ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ বাড়ানো হচ্ছে। প্রায় ২৫ লক্ষ মহিলা এ কাজে প্রশিক্ষিত হয়েছেন। ভূগর্ভস্থ জলের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং দূষণ এখনও বড় সমস্যা।

নমামি গঙ্গে

এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল, গঙ্গা নদীকে দূষণমুক্ত করা এবং এর পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা, গঙ্গার তীরে নিকাশি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, শিল্প বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং জৈববৈচিত্র রক্ষা। ৩০০টির বেশি প্রকল্প চলছে, যার মধ্যে সিওয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট উল্লেখযোগ্য।

গঙ্গার জলের গুণমান অনেকাংশে উন্নত হয়েছে, বিশেষ করে উত্তরাখণ্ড ও বিহারের কিছু অংশে। তবে শহরাঞ্চলে দূষণ এখনও একটি চ্যালেঞ্জ। গঙ্গা ভারতের ৪০% জনসংখ্যার জলের উৎস, তাই এ প্রকল্প জলসংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ।

জলশক্তি অভিযান (ক্যাচ দ্য রেইন)

এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল, বৃষ্টির জল সংগ্রহ ও ভূগর্ভস্থ জলস্তর পুনরায় পূর্ণ করা। এজন্য দরকার ছাদে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং, পুরোনো জলাশয় পুনরুদ্ধার এবং খাল-নর্দমা পরিষ্কার করা। ২০২১ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্প এখন জন-আন্দোলনের রূপ নিয়েছে।

শুষ্ক অঞ্চল, যেমন, রাজস্থান, গুজরাটে জলের উপলব্ধতা বেড়েছে। জেলা পর্যায়ে সেরা মডেলগুলি চিহ্নিত করা হচ্ছে। জল ধরো, জল ভরো এ প্রকল্পের মূলমন্ত্র।

অটল ভূজল যোজনা

এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল, ভূগর্ভস্থ জলের সঠিক ব্যবহার এবং সংরক্ষণ, বিশেষ করে জলসংকটপূর্ণ রাজ্যগুলিতে (যেমন, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ), সকলের অংশগ্রহণে জল ব্যবহারের পরিকল্পনা করা। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় এটি চলছে।

জলস্তর কমে যাওয়ার মোকাবিলায় সাফল্য দেখা গিয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল এখনও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

অমৃত সরোবর

২০২২ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল, দেশের প্রতিটি জেলায় ৭৫টি করে জলাশয় তৈরি বা সংস্কার করা, জল সংরক্ষণ, মৎস্য চাষ ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নতি। হাজার হাজার জলাশয় তৈরি হয়েছে, যা সেচ ও পানীয় জলের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্প

এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল, প্রাকৃতিক শক্তির উৎস হিসাবে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো। হিমালয় ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বড় প্রকল্প চলছে। সিকিমের তিস্তা-V প্রকল্প (৫১০ মেগাওয়াট) আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বীকৃত। পরিবেশগত প্রভাব ও ভূমিধসের ঝুঁকি এর অন্যতম অসুবিধা।

ভারতের জল প্রকল্পের তাৎপর্য

ভারতে বিশ্বের ১৭% জনসংখ্যা থাকলেও পানীয় জলের মাত্র ৪% ভারতে। তাই এ প্রকল্পগুলি অসামঞ্জস্য কমানোর জন্য। দেশের ৬০% কৃষি জলের ওপর নির্ভরশীল, তাই সেচের জন্য জলাশয় ও নদী গুরুত্বপূর্ণ।

অনিয়মিত বৃষ্টি ও খরার মোকাবিলায় এ প্রকল্পগুলি যথেষ্ট কার্যকরী। শহরে ৭০% নিকাশি জল শোধন না করা অবস্থাতেই নদীতে মেশে। উত্তরে বন্যা, দক্ষিণে খরা। জল ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় প্রয়োজন। এ সমস্ত প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করে জনগণের অংশগ্রহণের ওপর। ভারতের এ প্রকল্পগুলি জলকে কেবল সম্পদ নয়, জীবনের ভিত্তি হিসাবে দেখার জন্য।

বিশ্ব জল দিবসে আমদের প্রতিজ্ঞা হোক, জলের প্রতিটি ফোঁটা বাঁচিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করব।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए