কাজল মুখার্জি

সাধারণ একটি দিন। কিন্তু অদৃশ্য মৃত্যুর বিরুদ্ধে সচেতনতার মাইলফলক এ তারিখ। বিশ্ব তামাকবিরোধী দিবস।
তামাক, যেটাকে অনেকেই অভ্যাস বা চাপ কমানোর উপায় বলে হালকা করে দেখেন, বাস্তবে তা কিন্তু এক নীরব ঘাতক। প্রতিদিন আমাদের দেশে এবং বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ তামাকের কারণে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, নিঃশব্দে, অজান্তে।
প্রতিবছর প্রায় ৮০ লক্ষ মানুষ তামাকজাত দ্রব্যের কারণে প্রাণ হারায়, যার মধ্যে প্রায় ১২ লক্ষ মানুষ ‘প্যাসিভ স্মোকিং’ বা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। ভারতে প্রতিবছর ১০ লক্ষের বেশি মৃত্যু হয় শুধু তামাকজনিত রোগে। ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের রোগ, সবকিছুরই একটি বড় কারণ তামাক। তামাক ব্যবহার শুধু ব্যবহারকারীকেই নয়, তার পরিবারের সদস্যদেরও ঝুঁকিতে ফেলে।
ছোট্ট পাড়ার এক নিরিবিলি ঘর। দুপুরের পর বিছানায় শুয়ে রয়েছেন ষাটোর্ধ্ব এক মানুষ। দেহ শুকনো। গলায় ক্যানুলা। মুখে কিছু বলতে পারেন না। চোখে কেবল প্রশ্ন। পাশে বসে স্ত্রী তাঁর হাত ধরে আছেন। কিছু বলছেন না। শুধু মাঝেমধ্যে কপালে হাত রাখছেন।
ছেলে এসে বলল, ‘বাবা, তুমি যদি তখন একটু গুরুত্ব দিতে, তাহলে আজ তোমাকে আমাদের এ অবস্থায় দেখতে হত না।’ সে মানুষটি একসময় অফিসের জনপ্রিয় কর্মী ছিলেন। ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে সহকর্মীদের গল্প শোনাতেন। হাসি-মজা চলত চায়ের কাপে সিগারেট সহযোগে। কিন্তু এখন? ধোঁয়ার ওপাশে অন্ধকার।
সিগারেট-বিড়ির ক্রমাগত ধোঁয়ায় মানুষ হারায় স্বাস্থ্যের নিয়ন্ত্রণ, নষ্ট হয় ফুসফুস, কণ্ঠনালি, দাঁত, ত্বক, এমনকী গলার স্বর। কমে যায় আয়ু। কিন্তু বাড়ে যন্ত্রণার দৈর্ঘ। শিশুরা পায় বিষাক্ত বাতাসে বেড়ে ওঠার অভিশাপ। পরিবার পায় অজস্র বিনিদ্র রাত, প্রবল মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ। শেষে অপ্রস্তুত বিদায়।
তামাক ছাড়ার সিদ্ধান্ত জীবনের এক নতুন অধ্যায়। বয়স যাই হোক, যখনই তামাক ছাড়া হয়, তখনই লাভ হয়। শরীর নিজেকে ফের গড়ে তুলতে শুরু করে।
একটি সিগারেট ছাড়া মানে শুধু নিজেকে নয়, নিজের পরিবারের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষা দেওয়া। আমরা সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে পারি বন্ধুবান্ধব, ছাত্রছাত্রী, সহকর্মীদের মধ্যে, যাঁরা তামাক ছাড়তে চাইছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়াতে, স্কুল, কলেজ, কর্মক্ষেত্রে তামাকবিরোধী কর্মসূচি চালাতে।
৩১ মে শুধু ‘বিশ্ব তামাকবিরোধী দিবস’ নয়, একটি সিদ্ধান্তের দিন, একটি প্রতিজ্ঞার দিন। একটি জীবনের দিকে ফিরে তাকানোর দিন। তাই জীবন তামাকে নয়, স্বচ্ছ আলোয় পূর্ণ হোক।
