Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

আন্তর্জাতিক নারী দিবস: ইতিহাস, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা

নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ ছাড়া সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই নারীদের সম্মান ও ক্ষমতায়ন করতে হবে। সমাজে তাঁদের সমান সুযোগ দিতে হবে। তাহলেই আমরা একটি সুন্দর, সমতাভিত্তিক, প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে পারব।

নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করাই তাঁদের মুক্তির প্রধান চাবিকাঠি।

Share Links:

কাজল মুখার্জি

নারী শব্দটি শুধু একটি লিঙ্গকে নির্দেশ করে না, বরং তা বহুকাল ধরে চলে আসা সংগ্রাম, বঞ্চনা, অধিকার আদায়ের অনন্য প্রতীক। সভ্যতার সূচনা থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত নারীরা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু কখনওই থেমে থাকেননি। সমাজের বিভিন্ন বাধাবিপত্তিকে অতিক্রম করে তাঁরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

নারী দিবসের উৎপত্তি ও ইতিহাস

আন্তর্জাতিক নারী দিবস  মূলত মহিলাদের অধিকার ও সমানাধিকারের দাবিতে হওয়া শ্রমিক আন্দোলন থেকে উদ্ভূত। এর সূচনা হয় ১৮৫৭ সালে, যখন নিউইয়র্কের একটি সুতো কারখানার নারী শ্রমিকরা কাজের অমানবিক পরিবেশ, কম মজুরি এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছিলেন। তারপর ১৯০৮ সালে নিউইয়র্ক শহরে প্রায় ১৫,০০০ নারী ভোটাধিকার, কর্মসংস্থানে সমান অধিকার এবং শ্রমঘণ্টা নির্ধারণের দাবিতে রাস্তায় নামেন।

নারীদের আন্দোলন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পায় ১৯১০ সালে, যখন ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন প্রস্তাব রাখেন, নারীদের জন্য একটি বিশেষ দিন পালন করা উচিত, যেদিন তাঁদের অধিকারের প্রশ্নটি জোরালোভাবে বিশ্বব্যাপী তুলে ধরা হবে।

এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১৯১১ সালে প্রথমবার আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয় অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডে। তবে এটি ৮ মার্চে নির্ধারিত হয়নি তখনও। পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে রাশিয়ার নারীরা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বিপ্লবের অংশ হিসাবে বিশাল আন্দোলন গড়ে তুললে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস বলে চিহ্নিত করা হয়।

১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ এই দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দেয় এবং ১৯৭৭ সালে সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে এই দিনটি উদযাপনের জন্য আহ্বান জানায়।

নারীর সামাজিক অবস্থান ও সংগ্রামের ইতিহাস

নারীর প্রতি বৈষম্য কেবল একক কোনও দেশের সমস্যা নয়, এটি বিশ্বব্যাপী বহু শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী সামাজিক গঠনের অংশ। অতীতে নারীদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। তাঁরা ভোট দিতে পারতেন না, সম্পত্তির মালিক হতে পারতেন না, এমনকী স্বাধীনভাবে নিজের জীবন পরিচালনার অধিকারও তাঁদের ছিল না।

কিন্তু সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নারীরা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য সোচ্চার হয়েছেন। নারী আন্দোলনের ফলে ভোটাধিকার, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, আইনি অধিকার, সম্পত্তির অধিকার-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ভারতের প্রেক্ষাপটে নারীদের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ

১. শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন:

একসময় নারীশিক্ষাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হত। কিন্তু আজ নারীশিক্ষার হার বাড়ছে। তবুও গ্রামীণ ও নিম্নবিত্ত নারীদের শিক্ষালাভের ক্ষেত্রে এখনও অনেক বাধা রয়ে গিয়েছে।

২. কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ:

একসময় নারীদের শুধু গৃহস্থালি কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হত, কিন্তু এখন তাঁরা চিকিৎসা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রশাসন, রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্য, খেলাধুলা, সর্বত্র নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন।

৩. আইন ও অধিকার:

নারীদের বিরুদ্ধে অত্যাচার প্রতিরোধে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। যেমন, ভারতে দ্য প্রোটেকশন অব উইমেন ফ্রম ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স অ্যাক্ট (২০০৫), ভের্নিকা আইন (যৌন হয়রানি প্রতিরোধ), বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, যৌতুক নিরোধ আইন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন ইত্যাদি।

সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি নারী নির্যাতনের ভয়ংকর এবং নৃশংস ঘটনা সমাজ জীবনে আলোড়ন  তৈরি করেছে। এগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য,

কলকাতায় চিকিৎসক ধর্ষণ ও হত্যা (আগস্ট ২০২৪): ৩১ বছর বয়সি এক শিক্ষানবিশ চিকিৎসক কলকাতার আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে ৩৬ ঘণ্টার শিফট শেষে সেমিনার কক্ষে ঘুমোতে গেলে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন। পরদিন সকালে তাঁকে অর্ধনগ্ন ও আহত অবস্থায় পাওয়া যায়। এই ঘটনার পর সারাদেশে Reclaim the Night নামে প্রতিবাদ শুরু হয়, যেখানে নারীর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের দাবি তোলা হয়।

উন্নাও ধর্ষণ মামলা (২০১৭): উত্তরপ্রদেশের উন্নাও জেলায় এক কিশোরীকে স্থানীয় বিধায়ক কুলদীপ সিং সেনগার ও তাঁর সহযোগীরা ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। সে ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভের সঞ্চার হয় এবং পরে সেনগারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

হাথরাস গণধর্ষণ ও হত্যা (২০২০): উত্তরপ্রদেশের হাথরাস জেলায় ১৯ বছর বয়সি দলিত তরুণীকে গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে অভিযোগ অস্বীকার করে এবং ভুক্তভোগীর পরিবারের অনুমতি ছাড়া রাতের বেলায় তাঁর দেহ দাহ করে, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

ভারত সরকার বিভিন্ন সময় নারীদের প্রতি সহিংসতা এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করেছে। এছাড়াও নতুন ভারতীয় ন্যায়সংহিতায় এ সম্পর্কিত আইনগুলি আরও কঠোর করা হয়েছে।

ফৌজদারি আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০১৩: দিল্লির নির্ভয়া গণধর্ষণ মামলার পর সরকার ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা সম্পর্কিত আইনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে। নতুন আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞা বিস্তৃত এবং শাস্তি কঠোর করা হয়। যেমন, ধর্ষণের ফলে মৃত্যু বা ভুক্তভোগীকে স্থায়ী কোমায় পাঠানোর ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়।

পকসো আইন, ২০১২: শিশুদের যৌন অপরাধ থেকে সুরক্ষা দিতে ‘প্রোটেকশন অব চিলড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্সেস অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করা হয়। তা শিশুদের ওপর যৌন হেনস্থার ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান করে।

ক্রিমিনাল ল’ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট, ২০১৮: এই আইনে ১২ বছরের কম বয়সি শিশুদের ধর্ষণের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ আদালত স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়।

এই আইনগুলির উদ্দেশ্য নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের জন্য কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করা। তবে আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন, নারীর প্রতি সম্মান ও সমানাধিকারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা অপরিহার্য।

নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ধর্ষণ, গার্হস্থ্য নির্যাতন, যৌন হয়রানি, পণের জন্য হত্যা, এগুলি আজও নারীদের কাছে প্রধান বাধা হয়ে রয়েছে। কর্মক্ষেত্রেও নারীরা বিভিন্নভাবে বৈষম্যের শিকার হন।

নারী দিবসের তাৎপর্য শুধু উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি নারীর ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের প্রতীক। এই দিনটি নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করা, তাঁদের প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ এবং কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরে।

আইনের কঠোর প্রয়োগ:

নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষার প্রসার:

নারীশিক্ষার সুযোগ আরও বিস্তৃত করতে হবে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য।

কর্মসংস্থান ও সমান অধিকার:

নারীদের জন্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে। একই কাজের জন্য নারী-পুরুষের সমান বেতন নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন:

নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করাই তাঁদের মুক্তির প্রধান চাবিকাঠি। তাঁদের স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে সম্মান জানাতে হবে। সমাজকে সচেতন করতে প্রচার চালাতে হবে।

নারী নেতৃত্বের প্রসার:

নারীদের রাজনীতি, প্রশাসন ও উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও বেশি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নারী দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়, এটি মহিলাদের অধিকার, সমান সুযোগ এবং সামাজিক ন্যায়ের জন্য চলমান সংগ্রামের প্রতীক।

নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ ছাড়া সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই নারীদের সম্মান ও ক্ষমতায়ন করতে হবে। সমাজে তাঁদের সমান সুযোগ দিতে হবে। তাহলেই আমরা একটি সুন্দর, সমতাভিত্তিক, প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে পারব।

আমাদের সকলের সমবেত কণ্ঠে ধ্বনি উঠুক, নারী নিগ্রহ বন্ধ হোক, নারীর প্রতি সম্মান জানানো হোক, আর নারী-পুরুষ মিলে সমতার পৃথিবী গড়ে উঠুক।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए