ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
সিনিয়র প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

মানব সমাজের অগ্রগতির ঐতিহাসিক পর্যায়ে নারী ও পুরুষ যৌথভাবে পরিবর্তনের পথে শরিক হয়েছিল। সেজন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘নারী’ কবিতায় লেখেন, ‘নিখিলের সাথে তব নিত্য বিনিময়।/ মনের অনন্ত তৃষ্ণা মরে বিশ্ব ঘুরি,/ মিশায় তোমার সাথে নিখিল মাধুরী।’
আবার কাজী নজরুল ইসলাম লেখেন, ‘পুরুষ এসেছে মরুতৃষা লয়ে,/ নারী যোগায়েছে মধু।/ শষ্যক্ষেত্র উর্বর হল,/ পুরুষ চালাল হাল,/ নারী সেই মাঠে/ শষ্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল।’
আর জীবনানন্দ দাশের মতো প্রকৃতিপ্রেমিক কবি ‘নাটোরের বনলতা সেন’-এর আঁচলের মধ্যে দু’দণ্ড শান্তির খোঁজে পরম সুখের সন্ধান করতেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে নারীদের অবদান স্বীকৃত হয় খাতায় কলমে। কবিদের কবিতায় নান্দনিক সৌকর্যসাধন ব্যতীত নারীদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় সমাজ অদ্যাবধি বড়ই কৃপণ। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, অর্ধেক আকাশে নিসর্গ চিত্রের পূর্ণ রূপ অধরাই থাকে।
‘নারী অর্ধেক আকাশ’, এ বাক্যটি একটি প্রতীক, যা বিশ্বব্যাপী নারী অধিকারের স্বীকৃতি ও দাবির সূত্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ভারতীয় প্রেক্ষিতে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের সমাজে নারীর অবস্থান, আইনগত স্বীকৃতি, সামাজিক বাস্তবতা এবং সাংস্কৃতিক বয়ান এক স্বতন্ত্র অধ্যায়ের সূচনা করেছে। একদা মাও সে তুং বলেছিলেন, ‘Women hold up half the sky’। এটি একটি বিপ্লবাত্মক কাব্যিক উচ্চারণ হলেও এর অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক তাৎপর্য প্রবল। এটি কেবল একটি অধিকারসংক্রান্ত প্রত্যয় নয়, বরং সমাজ কাঠামোয় নারীর অবস্থানকে গড়পড়তা প্রশ্নের সম্মুখীন করে। এ প্রেক্ষাপটেই গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক প্রশ্ন করেন, ‘Can the subaltern speak?’ উপনিবেশিত, নিপীড়িত নারী, যেমন, দলিত, মুসলিম, আদিবাসী নারীদের কণ্ঠ আজও সমাজ ও রাষ্ট্রে কতখানি শ্রবণযোগ্য? ভারতীয় সংবিধান ১৪, ১৫(৩), ১৬ ও ৩৯ ধারায় নারী-পুরুষ সমতা এবং বিশেষ সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। ৭৩তম ও ৭৪তম সংশোধনীতে স্থানীয় স্তরে নারীর জন্য ৩৩%-৫০% সংরক্ষণ নিশ্চিত হয়েছে। ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে সংসদে নারীদের জন্য ৩৩% সংরক্ষণ বিল গৃহীত হয়েছে, যদিও তার বাস্তব প্রয়োগ এখনও সময়সাপেক্ষ। আইন থাকা সত্ত্বেও নারী নিপীড়ন, যৌন সহিংসতা, বৈবাহিক ধর্ষণ, কন্যাভ্রূণ হত্যা, যৌতুক প্রথা ইত্যাদি চলছেই। আইনের বাস্তব প্রয়োগে অসমতা ও দুর্বলতা স্পষ্ট।
ভারতে নারী শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ (LFPR) ২০২৩-এর PLFS অনুসারে মাত্র ২৭%, যা উন্নয়নশীল দেশগুলির তুলনায় কম। বহু নারী অনানুষ্ঠানিক খাতে, অদৃশ্য ও অবৈতনিক শ্রমে নিয়োজিত। NFHS-5 অনুসারে, শহর-গ্রাম, উচ্চবর্ণ-দলিত, হিন্দু-মুসলিম নারীদের মধ্যে শিক্ষা ও পুষ্টির পার্থক্য প্রবল। কিশোরী ও যুবতীদের মানসিক স্বাস্থ্য, মাসিক স্বাস্থ্য ও অপুষ্টির সমস্যা গভীর। ‘ভার্জিনিটি’ বা ‘যৌন শুচিতা’ এবং ‘পরিবার রক্ষা’র ধারণা এখনও নারীর ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। প্রেম, যৌনতা, পোশাক, মতপ্রকাশ, সব ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীনতা আংশিক ও বিপজ্জনকভাবে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ।
লোকসভায় নারীদের উপস্থিতি ১৫%। রাজ্য বিধানসভায় এ হার আরও কম। পঞ্চায়েতে নারীদের উপস্থিতি লক্ষণীয় হলেও বহু ক্ষেত্রে ‘প্রক্সি’ প্রতিনিধিত্ব চলছে। দলীয় কাঠামো এখনও পুরুষতান্ত্রিক। ক্ষমতার কেন্দ্রে নারীদের প্রবেশ সীমিত। মহিলা সংগঠনগুলির কার্যক্ষমতা ও রাজনৈতিক ভাবনা প্রায় ‘সাংগঠনিক আলংকারিকতা’য় সীমাবদ্ধ।
বেগম রোকেয়া থেকে মহাশ্বেতা দেবী, তসলিমা নাসরিন, তনুশ্রী ভাণ্ডারী বা অনিতা অগ্নিহোত্রীর লেখায় নারী আত্মচেতনা ও অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ উঠে এসেছে। মিডিয়া ও চলচ্চিত্রে নারী প্রায়শই বস্তুতান্ত্রিক, পুরুষকেন্দ্রিক চাহিদার প্রতিফলনে চিত্রায়িত হয়। নারীর কণ্ঠ, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি এখনও প্রান্তিক। সে অনিবার্য কারণেই ‘অর্ধেক আকাশ’, এ উপমাটি এখনও একটি প্রতিশ্রুতি, যা সম্পূর্ণ হয়নি। নারীর উপস্থিতি রয়েছে আইন, প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও আন্দোলনে। কিন্তু প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতায়নের মধ্যে এক সুস্পষ্ট ফাঁক রয়ে গিয়েছে। সমাজ কাঠামোর পিতৃতান্ত্রিকতা, শ্রেণি-বর্ণভিত্তিক বৈষম্য ও সংস্কৃতিগত নিয়ন্ত্রণ নারীকে তার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশে বাধা দেয়। তবে আশার দিকও প্রবল। নারীরা নতুন রাজনৈতিক ভাষা, সাংস্কৃতিক প্রকাশ এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে এক নতুন আকাশ নির্মাণ করছেন। সে আকাশ হয়তো অর্ধেক নয়, সম্পূর্ণ। তবে তার সংজ্ঞা নারীর নিজের শর্তে রচিত।

যাঁরা পাঠ করেন, মতামত প্রকাশ করেন না কেন? পাঠকের মতামত লেখককে সজাগ করে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কালে যেভাবে মহীয়সী রোকেয়াকে গালিগালাজ খেতে হচ্ছে তাতে আপনার বক্তব্যকে সমর্থন জানাতেই হয়। এখনো সমাজে পুরুষ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য জোর জুলুম চলছে। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলে গিয়েছিলেন ‘নারীর দুঃখের একমাত্র কারণ নারী’। চর্চার অভাবে উক্তির সূত্রটি দিতে পারলামনা, কিন্তু সমাজের নীচুতলার (মধ্যবিত্ত ও তার মধ্য) পুরুষরা যখন নারীদের দমন করেন তখন কোন না কোন নারীরা দ্বারা প্রভাবিত হয়েই করেন। আসলে নারী বলতে নারী-বধু নয়, নারী কন্যা, নারী মাতা, নারী বৃদ্ধা, নারী স্ত্রী এই সামাজিক অবস্থান গুলি নিয়ে নারীদের মধ্যেই পুরুষের ওপর অধিকার নিয়ে যে কলহ তার ভারতীয় নারী অগ্রসরতার পথে প্রধান বাধা বলেই আমার মনে হয়। পারিবারিক কোন্দল, বা গ্রামাঞ্চলে এখনো দুটি সম বয়সী বধুর কোন্দল লক্ষ্য করলে দেখা যাবে শেষে দুজনের মধ্যে এখনো পুরুষ সন্তান প্রসবের প্রসঙ্গ আসে, পুরুষ সন্তানের মা কন্যা সন্তানের মা কে এই বলে নিরস্ত করে যে – তুই আট কুড়ি, ‘কুড়ি’। এখানে কন্যা, উত্তর ভারতীয় রাজ্যে বা সাঁওতালি ভাষাতেও কুড়ি মানে কন্যা। এই গালি টা কোন পুরুষ কখনো উচ্চারণ করেনি।
আমার বিষয় ছিল, নারীগণ কি প্রকৃতই অর্ধেক আকাশ হতে পেরেছে?