ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া
![]()
ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম অন্যান্য প্রদেশে অনেকের কাছেই একটু আনকোরা ঠেকলেও সব ভারতবাসী বিদ্যাসাগর বললে শ্রদ্ধাবনত হয়। তাঁকে প্রকৃতই ‘ঈশ্বর’রূপে বরণ ও স্মরণ করার বাসনা আপামর ভারতবাসী লালন করে। এজন্যই মহাসমারোহে তাঁর জন্মদিন (২৬ সেপ্টেম্বর) পালিত হয়।
ঈশ্বরচন্দ্র ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২২ এপ্রিল হিন্দু ল’ কমিটির পরীক্ষা দেন। পরীক্ষায় যথারীতি কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন এবং ১৬ মে সংস্কৃত কলেজের ল’ কমিটির কাছ থেকে যে প্রশংসাপত্রটি পান, তাতেই প্রথম তাঁর নামের সঙ্গে 'বিদ্যাসাগর' উপাধিটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, 'বিদ্যাসাগর' ছিল একটি সাম্মানিক উপাধি এবং তা অনেকেই লাভ করেছিলেন। 'বিদ্যাসাগর' উপাধিপ্রাপ্ত গুণীজনের তালিকাটি তুলে ধরলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জীবানন্দ বিদ্যাসাগর নীলকমল বিদ্যাসাগর রাজীবলোচন বিদ্যাসাগর প্রাণকৃষ্ণ বিদ্যাসাগর হরানন্দ বিদ্যাসাগর হরিহর বিদ্যাসাগর শশিশেখর বিদ্যাসাগর রায়বাহাদুর কালীপ্রসন্ন ঘোষ বিদ্যাসাগর। এই গুণীজনরা 'বিদ্যাসাগর' উপাধি লাভ করে বাংলার ইতিহাসকে গৌরবান্বিত করেছেন। এঁদের অনেকেই বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঋদ্ধতার সাক্ষ্য রেখেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ঊনবিংশ শতকের একজন বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক, গদ্যকার ও চিন্তাবিদ ছিলেন। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য সংস্কৃত কলেজ থেকে তিনি 'বিদ্যাসাগর' উপাধিটি লাভ করলেও একে প্রায়োগিক দিক থেকে সফল করে তুলতে তিনি নিরলস পরিশ্রম করে গিয়েছেন। সংস্কৃত ছাড়াও বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল তাঁর। তিনি বাংলা লিপির সংস্কারসাধন করে তাকে যুক্তিগ্রাহ্য ও সহজপাঠ্য করে তোলেন। সে কারণে তাঁকে বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপকার অভিধায় ভূষিত করা হয়। তাঁকে 'বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী' বলে অভিহিত করেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি রচনা করেছেন যুগান্তকারী শিশুপাঠ্য বর্ণপরিচয়-সহ একাধিক পাঠ্যপুস্তক ও সংস্কৃত ব্যাকরণ গ্রন্থ।
নারীমুক্তির আন্দোলনেও ঈশ্বরচন্দ্রের অবদান উল্লেখযোগ্য। বিদ্যাসাগর ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারকও। বিধবা বিবাহ ও স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন, বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক অভিশাপ দূরীকরণে তাঁর অক্লান্ত সংগ্রাম আজও ভারতবাসী যথোচিত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। বাংলার নবজাগরণের এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘দয়ার সাগর’ নামে। দরিদ্র, আর্ত ও পীড়িত কখনওই তাঁর দরজা থেকে শূন্য হাতে ফিরে যেত না। এমনকী নিজের চরম অর্থসংকটের সময়ও তিনি ঋণ দিয়ে পরোপকার করেছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তকে তিনি প্রভূত পরিমাণ অর্থ সাহায্য করেছিলেন। মাইকেল তা স্বীকারও করেছেন। মধুকবি তাঁর মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন প্রাচীন ঋষির প্রজ্ঞা, ইংরেজের কর্মোদ্যম ও বাঙালি মায়ের হৃদয়বৃত্তি।
বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিকে যেভাবে ঈশ্বরচন্দ্র নবজাগরণের যুগে প্রভাবিত করেছিলেন, তেমনটা অন্য ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিধারীরা করে উঠতে পারেননি। এখানেই ঈশ্বরচন্দ্রের অনন্যতা। তিনি কেতাবি জগৎ থেকে বের হয়ে এসে সমাজের অভিমুখ নির্ধারণে সফল তপস্বীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা, যে যুগে নারীদের ‘অবলা’ ঘোষণা করে পরদানশিন করে রাখার চল ছিল, সে সমাজ রূপান্তরের কালে তিনি পথ প্রদর্শকের অভিনব কাজটিকে সার্থক করে তুলেছিলেন। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বিদ্যালয় স্থাপন এই কর্মসূচিরই অঙ্গ ছিল। বাংলায় নারীশিক্ষার প্রসারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি ছিলেন নারীশিক্ষা বিস্তারের পথিকৃৎ। তিনি উপলব্ধি করেন যে, নারীজাতির উন্নতি না ঘটলে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ড্রিংকওয়াটার বেথুন উদ্যোগী হয়ে কলকাতায় হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই ভারতের প্রথম বালিকা বিদ্যালয়। বিদ্যাসাগর ছিলেন এই বিদ্যালয়ের সম্পাদক। এটি বর্তমানে বেথুন স্কুল নামে পরিচিত। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমান জেলায় মেয়েদের জন্য তিনি একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রামাঞ্চলে নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে তিনি বাংলার বিভিন্ন জেলায় স্ত্রীশিক্ষা সম্মেলনী প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসের মধ্যে নদিয়া, বর্ধমান, হুগলি ও মেদিনীপুর জেলায় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ১৩০০ ছাত্রী ওই স্কুলগুলিতে পড়াশোনা করত। পরবর্তীকালে তিনি সরকারের কাছে ধারাবাহিক তদবির করে স্কুলগুলির কিছু আর্থিক ব্যয়ভার বহন করতে রাজি করান। ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় বালিকা বিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮৮। তারপর কলকাতায় ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন (যা বর্তমানে বিদ্যাসাগর কলেজ নামে পরিচিত) এবং নিজের মায়ের স্মৃতির উদ্দেশে নিজ গ্রাম বীরসিংহে ভগবতী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর আদর্শ রূপায়ণের ক্ষেত্রে নির্মম, কঠোর ও আপসহীন যোদ্ধা ছিলেন। নরেন্দ্রনাথ দত্ত (পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দ) ১৮৮৬ সালে বিদ্যাসাগর পরিচালিত মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনের বৌবাজার শাখার প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান। কিন্তু কর্তব্যকর্মে অবহেলার কারণে একমাসের মধ্যেই সেখান থেকে বরখাস্ত হন। সে সময়ের বিখ্যাত বাগ্মী তথা পরবর্তী সময়ে ‘রাষ্ট্রগুরু’ অভিধাপ্রাপ্ত স্যার সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর অসুবিধার সময় চাকরি দিয়েছিলেন, কিন্তু নিষ্ঠার অভাব দেখে তাঁকে কর্মচ্যুতও করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র। এমনকী নিজের জামাই সূর্যকুমারকে স্কুলের দায়িত্ব থেকে অপসারিত করেন বিদ্যালয় তহবিলে সামান্য গরমিল দেখে। পুত্র নারায়ণ বিধবাকে বিয়ে করতে সম্মত হওয়ায় বিদ্যাসাগর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করেও সে কাজ সম্পন্ন করেন। আবার যখন জানলেন, পুত্র নারায়ণ ‘যথেচ্ছাচারী ও কুপথগামী’ হয়েছেন, তখন তাঁর সঙ্গে সমস্ত ‘সংশ্রব ও সম্পর্ক’ পরিত্যাগ করেন। এ ধরনের মানুষ ছিলেন বিদ্যাসাগর। ছোটবেলা থেকেই তাঁর একগুঁয়ে মনোভাব তাঁকে কর্ম সম্পাদনের নিষ্ঠা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
পরাধীন বাংলায় গণশিক্ষার প্রসারে ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদান অন্য ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিধারীদের থেকে শত যোজন দূরত্ব রচনা করেছিল। সে কারণে একজন ‘বিদ্যাসাগর’ই প্রচারের সব আলো শুষে নিয়েছিলেন, অন্যরা শুধুই পুঁথিচর্চায় কৃতিত্ত্বের সাক্ষ্য রেখেছিলেন।
তবে অবশিষ্ট ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিধারীরাও সামাজিক রূপান্তরসাধনে তাঁদের লেখনীর সাহায্যে বাংলার মূঢ়তামুক্তির যাজ্ঞিক ছিলেন। তাঁদেরও নমস্য আখ্যা দেওয়া যেতেই পারে, তবে প্লাবনের স্রষ্টা একজনই ছিলেন। তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ২৯ জুলাই, ১৮৯১ তিনি চিরবিদায় নেওয়ায় বাঙালি প্রকৃতপক্ষেই অভিভাবকহারা হয়ে যায়।
