প্রফেসর (ড.) রাজকুমার মোদক

‘আজ বাংলা যা ভাবে, গোটা ভারতই কাল সেটা ভাবে’— একথার ভিত্তিমূলে যে কয়েকজন প্রাতঃস্মরণীয় মহান ব্যক্তি ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অন্যতম। ২৬ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে তাঁরই স্মরণ, মনন ও নিদিধ্যাসনের মাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো কতকটা গঙ্গা জলে গঙ্গা পুজোর মতো শোনালেও বর্ণপরিচয়ের স্রষ্টার ক্ষেত্রে একথা পরতে পরতে সত্য।
সাংখ্যে পুরুষকে নিত্য, মুক্ত, বুদ্ধ, শুদ্ধ, সদা আনন্দময়, বিশুদ্ধ চেতনসত্তা আর প্রকৃতিকে ত্রিগুণাত্মিকা, জড় ও প্রসবধর্মী বলা হলেও এই পুরুষ যেমন ওই পুরুষ নয়, তেমনই প্রকৃতিও কোনও নারীশক্তি নয়। কিন্তু তন্ত্রে যে শক্তির কথা বলা হয়েছে, সেই শক্তি মাতৃস্বরূপা, যা পুরাণের দেওয়া শিক্ষা, দেবতাদের নিজস্ব কোনও শক্তিই নেই— এই ভাবনাকেই পুষ্ট করে। উল্লেখ্য যে, তন্ত্রানুযায়ী সমস্ত শক্তির উৎস হলেন মহামায়া। এই কারণে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মুখ দিয়ে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-তে উচ্চারিত হয়েছে, সর্বস্য বুদ্ধিরূপেণ জনস্য হৃদি সংস্থিতে। স্বর্গাপবর্গদে দেবী নারায়ণী নমহস্তু তে।। মাতৃশক্তিই যে মূল শক্তির উৎস, একথা আবহমানকাল থেকে শাস্ত্রে যতটা লালিত ও পালিত হয়েছে, ভারতের ইতিহাস কিন্তু মাতৃশক্তি তথা নারীর অধিকার নিয়ে সে কথা বলে না। আসলে তত্ত্ব ও প্রয়োগে আকাশ-পাতাল ফারাক সর্বকালেই থেকে গিয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক পরিকাঠামো মানুষের ভাবনাচিন্তায় এমনভাবে গেড়ে বসে গিয়েছে যে, শাসক মাত্রই পুরুষতান্ত্রিক, শাসনভার নারী বা পুরুষ, যার হাতেই থাকুক না কেন। শাসিতের অবস্থান মাত্রই পুরুষতান্ত্রিকতার অপরদিকে। সে আদপে নারী বা পুরুষ যেই হোক না কেন। তাই তো আজও দেখা যাচ্ছে যে, কলকাতার রাজপথে হাজার হাজার মানুষ তিলোত্তমার বিচার চেয়ে রাত দখলের কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে।
রাত দখলের কর্মসূচি আসলে আবহমানকাল ধরে চলা আসা অগণতান্ত্রিক, ক্ষমতা প্রদর্শনকারী পুরুষতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাধারণ-অতি সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। তার মাধ্যমে মানুষ আশা রাখে, সুরক্ষিত হবে নারী স্বাধীনতা, হবে সকল বৈষম্যের অবসান, আসবে ‘রূপলোক ও রসলোকে নবমাধুরীর সঞ্জীবন।’
অন্য পোস্ট: প্যারালিম্পিক্স: দিব্যাঙ্গরা আমাদের গর্ব
২০২৪ সালে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার এরকম সর্বস্তরীয় ঝাঁঝাল প্রয়াস বাস্তবিক পক্ষে পরিলক্ষিত হলেও মাত্র ২০০ বছর পিছিয়ে গেলে এ জাতীয় চিন্তাভাবনা এক্কেবারেই অসম্ভব ছিল। সে সময় মহিলারা যে মানুষ, সেটাই ভাবা হত না। পুরুষের সমান অধিকার তো অনেক পরে। খোদ ব্রিটিশ সরকারই রিপ্রেজেনটেশন অব দ্য পিপল অ্যাক্ট ১৯১৮-র মাধ্যমে মহিলাদের ভোটাধিকার দেয়। তবে ১৯১১ সাল পর্যন্ত কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী থাকায় নারী স্বাধীনতার চিন্তা ভারতে পাকাপাকিভাবে যে এই বাংলা থেকেই শুরু হয়েছিল, তার বেশ কিছু নিদর্শন পাওয়া যায়। অনন্য স্বাধীনচেতা রানি রাসমণি কতকটা তালুক রক্ষার তাগিদেই লেখাপড়া শিখলেও তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি কতটা প্রজাবৎসল, ধর্মপ্রাণা ও ন্যায়পরায়ণ। ১৮৬৩ সালে কৈলাসবাসিনী দেবী তাঁর মহিলাদের হীনাবস্থা নামক একটি পুস্তকে প্রশ্ন তোলেন, ‘কতদিনে এই বঙ্গদেশে জ্ঞানসূর্য উদয় হইয়া অজ্ঞান অন্ধকার নষ্ট করিবে? হে বঙ্গবাসিনী ভগিনীগণ, কতদিনে তোমরা সর্বগুণ কৃত হইয়া এই বঙ্গ মাতাকে শোভিত করিবে?’
রাসসুন্দরী দেবীই সর্বপ্রথম ১৮৭৬ সালে বাংলা ভাষায় আমার জীবন নামক আত্মজীবনী নামক গ্রন্থে বৈধব্য যন্ত্রণার নানা দিক তুলে ধরেন। ১৮৭৮ সালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা স্বর্ণকুমারী দেবী ভারতী নামে একটি পত্রিকার সম্পাদনা শুরু করেন। এ প্রসঙ্গে যে বিষয়টি না উল্লেখ করলেই নয়, সেটা হল, তৎকালীন বঙ্গ-ইঙ্গ শ্রেণিও নারী অধিকার বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখে। যেমন, কৃষ্ণভামিনী দেবী ইংল্যান্ড থেকে বেড়িয়ে আসার পর ‘জিজ্ঞাসা’য় লেখেন, ‘একটা চলতি কথা, বিলেতের মাটিতে পা দিলে দাসও স্বাধীন হয়ে যায়, আমি এটা ভালো করে বুঝতে পারলাম। এখানে পৌঁছে আমার চিন্তা, মূল্যবোধ পালটে গেল এখানকার মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিয়ে। আমি নানা দেশের কথা শুনতাম, বুঝতাম না কিছুই। এখানে এসে বুঝলাম। যখন দেশে ছিলাম, আমি রাতদিনের তফাতটা বুঝতাম না। আজ আমার কাছে যেন নতুন জগৎ উদ্ভাসিত হয়েছে।’

Mon chhuye gelo.
অসাধারণ, খুব তথ্যপূর্ণ লেখা।