Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

রাষ্ট্রব্যবস্থায় বেদের শিক্ষা

শাসক যেন নিজেকে কখনও প্রভু মনে না করেন, কারণ বেদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, শাসককে প্রজারা এনেছেন। তাই শাসক নয়, নিজেকে সেবক হিসাবে দেশ ও জাতির কল্যাণে উৎসর্গ করা তাঁর কর্তব্য।

Share Links:

সুদীপনারায়ণ ঘোষ

হিন্দুদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ বেদ। এর মন্ত্র সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের প্রধান কর্তব্য। ‘মনুর্ভব জনয়া দৈবং জনম্’, প্রকৃত মানুষ হও এবং অন্যকে মানুষ হিসাবে গড়ে তোলো।

আদর্শ রাষ্ট্র গঠনে বৈদিক শাস্ত্রের নির্দেশনা:
সমগ্র বিশ্বে রাষ্ট্র গঠনের যাত্রা শুরু হয়েছে কয়েক শতক আগে। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো, এরিস্টটল থেকে আধুনিক সময়ের নিকোলা ম্যাকিয়াভেলি, রুশো, প্রাচ্যের চাণক্য-সহ সকলের প্রচেষ্টা ছিল একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার। সে আধুনিক রাষ্ট্রকে কল্যাণ রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলার আবাহন ছিল সকলের অভিমত।

একটি রাষ্ট্র গঠনের মূল স্তম্ভ তার জনগণ। তারাই রাষ্ট্রের কাঠামো, প্রগতি এবং নীতি নির্ধারণ করে থাকে। কিন্তু আদর্শ রাষ্ট্র গঠনে শুধু জনগণের নিজস্ব অভিমতই যথেষ্ট নয়, বরং সর্বজনীন মানদণ্ড নির্ধারণ এবং সে অনুসারে দেশকে পরিচালনা করার মাধ্যমে কল্যাণ বা জনবান্ধব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

বেদ সকল জ্ঞানের আধারস্বরূপ। সেজন্য বেদে যেমন পরমাত্মার স্বরূপ সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে, তেমনই মনুষ্য সভ্যতার কল্যাণে রয়েছে বিবিধ উপদেশ। বেদের মধ্যে রাষ্ট্র সম্পর্কিত বহুবিধ উপদেশ রয়েছে। রাষ্ট্রের কাঠামো, আদর্শ শাসক, প্রজার কর্তব্য, রাষ্ট্র ধ্বংসের কারণ-সহ বিভিন্ন বিষয়ে রয়েছে দিকনির্দেশ। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে আমাদের জানা আবশ্যক আদর্শ রাষ্ট্র গঠনে বৈদিক শাস্ত্র সমূহের দিকনির্দেশ।

আদর্শ রাষ্ট্রনির্মাণে শাসকের ভূমিকা: 
রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালনায় শাসকের অনবদ্য ভূমিকা রয়েছে। একজন নেতৃত্বদানকারী শাসকই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারেন। কিন্তু সে শাসক কখনও স্বৈরাচারী হতে পারেন না, কারণ শাসক প্রজা কর্তৃক নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তাই শাসককে হতে হবে জনগণের সেবক বা নেতা।

আদর্শ রাষ্ট্রনির্মাণে শাসকের গুণাবলি:
একজন শাসকের গুণাবলি রাষ্ট্রের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে। শাসকের গুণাবলির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে গ্রিক দার্শনিক প্লেটো চেয়েছিলেন একজন দার্শনিক রাজা, অন্যদিকে নিকোলাস ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, শাসককে হতে হবে শৃগালের মতো ধূর্ত এবং সিংহের মতো বলবান। কিন্তু বৈদিক শাস্ত্রে শাসকের গুণাবলি সম্পর্কে রয়েছে ভিন্ন ও অতি উচ্চতর ধারণা: ‘শাসককে মহাতেজস্বী, অত্যন্ত জ্ঞানী, সুরক্ষক, সত্যের সঙ্গে বর্ধনশীল এবং প্রত্যেক সংঘে সত্যের প্রতিপালক হতে হবে। ব্রতনিষ্ঠ, যজ্ঞকর্তা, অত্যন্ত তেজস্বী, অহিংসকর্মা, অগ্নিহোত্রী, সত্যনিষ্ঠ, শঠতাহীন ক্ষত্রিয়রাই সম্মুখসংগ্রামে কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করতে পারে।’

আদর্শ রাষ্ট্রনির্মাণে শাসকের পরামর্শদাতা:
স্বদেশকে যাঁরা পরিচালনা করবেন, তাঁরা অবশ্যই জ্ঞাত থাকবেন তাঁদের কর্তব্য পালনের বিষয়ে। রাজস্ব, সৈন্যবল, দেশকে প্রগতিশীল, দুস্থদের সহায়তা দান করা রাষ্ট্রের তথা রাষ্ট্র পরিচালনাকারীর কর্তব্য। রাষ্ট্র গঠনে দেশের অমাত্য শ্রেণির ভূমিকা পালন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নীতি নির্ধারণে তাঁরাই রাষ্ট্রশাসককে সহায়তা প্রদান করেন। সেজন্য শাসককে দেশ পরিচালনায় সুযোগ্যদের স্থান দিতে হবে।

শাসকের ভূল সিদ্ধান্তের ফল:
রাষ্ট্র পরিচালনায় শাসককে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ তাঁর একটি ভূল সিদ্ধান্ত সমগ্র দেশবাসীর জন্য নিয়ে আসতে পারে ঘোর অমানিশার অন্ধকার। শাসক যদি স্বৈরাচারী হয়ে ওঠেন, তখন তিনি রাষ্ট্রের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত না রেখে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতেই চেষ্টা করেন। ফলে বিদ্বানের পরিবর্তে সভায় স্থান হয় অযোগ্য চাটুকারের, দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তির। ফলে রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যায়।

শাসকের স্বৈরাচারে রাষ্ট্রের পরিণতি:

উত্তম শাসকের কর্ম যেমন স্বদেশ বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে, তেমনই শাসকের দম্ভোক্তি এবং স্বৈরাচারী আচরণ রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসতে পারে। রাজার (শাসক) অত্যাচার রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে, যেমন জল জীর্ণ নৌকোকে নষ্ট করে। যেখানে জ্ঞানীদের ওপর অত্যাচার হয়, সে রাষ্ট্র  দুর্গতিপ্রাপ্ত হয়ে বিনষ্ট হয়।

আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণে নাগরিক কর্তব্য:
আদর্শ রাষ্ট্র গঠনে প্রজা তথা জনগণের ভূমিকাও যথেষ্ট। কারণ জনসাধারণ যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্র গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন না করে, তবে আদর্শ রাষ্ট্রনির্মাণ অসম্ভব। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় প্রজার ভূমিকাকে নাগরিক কর্তব্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়। বেদে সেই নাগরিক বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে, ‘হে মাতৃভুমি, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে বাণীর মধুরতা দান করো। আমরা এর সাহায্যে সকল প্রজা মিলিতভাবে পূৰ্ণতা প্রাপ্ত হব।’

আদর্শ রাষ্ট্রনির্মাণে ঐক্যবদ্ধতা:
আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের পথে অন্যতম বাধা হিসাবে গণ্য করা হয় জনসাধারণের মধ্যে বিভেদ বা ঐক্যের অভাব। ঐক্যহীন সমাজ কখনও শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ করতে পারে না। সেজন্য আমাদের নাগরিকদের মধ্যে সর্বদা ধারণ করতে হবে বেদের সেই অমোঘ সংগঠন সুক্তের আদর্শ, ‘হে মনুষ্য, তোমাদের জলের পান একসঙ্গে এক হোক, খাদ্যগ্রহণ একসঙ্গে এক হোক। তোমাদের সকলকে একই মন্ত্রে (বেদবাণীতে) যুক্ত করেছি। তোমাদের অগ্নিহোত্র একসঙ্গে হোক, ঠিক যেভাবে রথচক্রের কেন্দ্রের চারপাশে অর সজ্জিত থাকে। তোমাদের চিন্তা-চেতনা এক হোক, তোমাদের মন এক হোক, তোমাদের সম্মেলন, আধ্যাত্মিকতা এক হোক, পান, ভোজন একসঙ্গে হোক, সকলের লক্ষ্য এক হোক।’

দ্বিধাবিভক্ত সমাজে আমাদের প্রয়োজন ঐক্যের। সে ঐক্যবদ্ধ সমাজের জন্য প্রয়োজন একজন উৎকৃষ্ট শাসকের। সে শাসকের প্রয়োজন সর্বোত্তম অমাত্য বা সহায়কদের। সে সমগ্র ব্যবস্থার প্রয়োজন দায়িত্বশীল প্রজা তথা নাগরিক। শাসক যেন নিজেকে কখনও প্রভু মনে না করেন, কারণ বেদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, শাসককে প্রজারা এনেছেন। তাই শাসক নয়, নিজেকে সেবক হিসাবে দেশ ও জাতির কল্যাণে উৎসর্গ করা তাঁর কর্তব্য।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए