শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

বাঁকুড়া জেলার লোকসংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক লৌকিক উৎসব তুষুপুজো বা টুসুপুজো।এটি একটি লৌকিক ব্রত। গ্রামীণ বালিকা, কুমারী ও মহিলাদের কাছে আজও তুষুপুজো খুবই প্রিয়। তুষ থেকে তুষু বা টুসু নামটি এসেছে বলে পণ্ডিতরা মনে করেন। পুজোটি বছরে একবারই হয়, তাই এটি বার্ষিক উৎসব। পৌষের প্রথমদিন থেকেই ঐতিহ্য ও পরম্পরা মেনে জেলাজুড়ে শুরু হয় টুসু আরাধন। শেষ হয় মকরসংক্রান্তির দিন। পৌষ মাসের সংক্রান্তিকে মকরসংক্রান্তি বলা হয়।
টুসু উৎসব বাঁকুড়া ছাড়াও পুরুলিয়া, দুই মেদিনীপুর, দুই বর্ধমান, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশাতেও অনুষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ বাঁকুড়ায় টুসুর মূর্তি দেখা যায়। জেলার বাকি অংশে টুসুর কোনও মূর্তিপুজো হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই টুসু বলতে প্রদীপ বেষ্টিত মাটির ছোট খোলা দেখা যায়। টুসুর মাটির খোলাকে টুসু খোলা বলা হয়। শহর-গ্রামের কুমোরপাড়া বা দোকানে টুসু খোলা কিনতে পাওয়া যায়। তুষ দিয়ে তাতে গাঁদা ও অন্যান্য ফুলে সাজিয়ে সন্ধ্যা হলেই মহিলা ও বালিকারা তুষুদেবীকে ঘিরে বসে সুর করে গান করেন। সে গানকে তুষু গান বলা হয়। তুষু গানে মহিলা, বউদের জ্বালা-যন্ত্রণা, ঝগড়া উঠে আসে। মহিলারা পরস্পর ঢেসনা’ দিয়ে একে অপরকে নিয়ে সুর তুলে গান করেন। শুনতে বেশ ভালো লাগে।
বর্তমানে টুসু গানে মাইকের ব্যবহার হয়। ফলে দূরে বসেও তুষু গান শোনা যায়। তুষুর ভোগ জোগানো হয় মুলো, শুকনো মুড়ি, মণ্ডা, বাতাসা, চিঁড়ে প্রভৃতি দিয়ে। বাঁকুড়া জেলায় মকরসংক্রান্তি পরব দোরগোড়ায়। প্রস্তুতি তুঙ্গে। সঙ্গে চলছে সেদ্ধ চাল কুটোনোর ব্যস্ততা। বাঁকুড়ায় তুষুর সঙ্গে পিঠার একটা সম্পর্ক আছে।
জেলার তুষু বা টুসু ভাসানের সবচেয়ে বড় মেলাটি হয় খাতড়া মহকুমার কংসাবতী নদের ধারে পোরকুল গ্রামে। পোরকুল ছাড়াও জেলার ছোট-বড় সমস্ত শিবমন্দিরে মেলা বসে। পোরকুলে কংসাবতী নদের জলে চৌদল সাজিয়ে তুষুব্রতী মহিলারা গান গাইতে গাইতে তুষু ভাসান দেন। জেলার দক্ষিণ অংশজুড়ে চৌদলে তুষু বিসর্জন চলে। মল্লভূম বিষ্ণুপুরের পোকাবাঁধ, যমুনাবাঁধ, লালবাঁধেও চৌদলে তূষু বিসর্জন হয়। দক্ষিণ বাঁকুড়ার রানিবাঁধ থানার বারিকুলে তুষু বিসর্জন হয় সরস্বতী পুজোর সকালে। বারিকূলে ওইদিন মস্ত মেলাও বসে।
উল্লেখযোগ্য, বারিকুলের অদূরেই রয়েছে শহিদ ক্ষুদিরাম বসুর আত্মগোপনস্থল, যে জায়গার নাম ছেঁদাপাথর। ১৯০৮ সাল নাগাদ এখানেই আত্মগোপন করে বিপ্লব চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন ক্ষুদিরাম। ‘একবার বিদায় দে মা’গানের রচয়িতা পীতাম্বর দাসের বাড়ি এই ছেঁদাপাথর গ্রামেই।
জেলাজুড়ে পুকুর ও নদনদীর তীরে তৈরি হয় শুকনো ডালপালার কুমো। স্থানীয়রা ওই কুমোগুলিকে ‘মকর’বলেন। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে মকর বা কুমো জ্বালিয়ে স্নান সেরে গা গরম করে অনেকেই সাধ্যমতো নতুন জামাকাপড় পরেন।
মকরসংক্রান্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ আউড়ি, বাউড়ি ও এখ্যান পুজো। জেলায় ঘরে ঘরে সংক্রান্তির আগের দিন লক্ষ্মীপুজো হয়। গৃহস্থের লক্ষ্মীপুজোর ভোগে থাকে ভাত বা খিচুড়ি, ভাজা এবং অবশ্যই পায়েস। পায়েসের মধ্যে থাকে পুরের পিঠা। বিকেলে ঘরে ঘরে তৈরি হয় চালগুঁড়ি, নারকেল, চাঁছি, তিল প্রভৃতির পুর দিয়ে একধরনের পিঠা। জেলায় তাকে বলা হয় গ্যাড়গেড়িয়া পিঠে বা গড়গড়ে পিঠে। রাজ্যে এই পিঠা পুলি পিঠা নামেই প্রসিদ্ধ। গ্যাড়গেড়িয়া ছাড়াও বাঁকা পিঠা, পুর পিঠা, ঝুলি পিঠা নামে এটি পরিচিত। বাঁকুড়ায় অনেকেই মকর পরবকে পিঠা পরবও বলে থাকেন।
এ সময় খেজুর গুড়ের চাহিদা থাকে চরমে। সংক্রান্তির পরদিন পয়লা মাঘ ‘এখ্যান’ বা ‘আখ্যান’পরব দিয়েই শেষ হয় এই শীতকালীন লৌকিক পরব। এখ্যান দিনে বিকেলে উঠোনে গোবরের মাড়ুলি দিয়ে লক্ষ্মীপুজো করা হয়। প্যাঁচা বা শেয়ালের ডাক না শোনা অবধি লক্ষ্মীকে উঠোন থেকে ঘরে ঢোকানো যায় না। এমন রীতি জেলাজুড়ে রয়েছে। টুসু বা তুষু পরব নিয়ে বাংলায় বহু লোকসংগীতও রয়েছে।

তথ্যসমৃদ্ধ লেখা