কাজল মুখার্জি
রেলপথ সম্প্রসারণের সময় সরকারি প্রশাসন এক জনবহুল গ্রামের মধ্য দিয়ে রেলের লাইন পাতার জন্য অনেক মানুষের বাসস্থান এবং চাষবাসের স্থান অধিগ্রহণ করে রেলপথ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ওই গ্রামের প্রায় সমস্ত অধিবাসীই রেল কর্তৃপক্ষের এই সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত শুনে আনন্দিত হলেও জনবহুল গ্রামের উপর দিয়ে রেললাইন পাতার ফলে তাঁদের বাস্তুহারা এবং জমিহারা হওয়ার আশঙ্কায় বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন, যদিও সরকারি এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে প্রথমদিকে কোনও মানুষ সাহস করে এগিয়েও আসছিলেন না, কিন্তু ওই গ্রামেরই একজন শিক্ষিকা নীলিমা দিদি, যিনি ওই গ্রামেরই প্রাথমিক স্কুলে পড়াতেন, তিনি সরকারি এই প্রস্তাবের সক্রিয বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
নীলিমা দিদি ওই গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ওই গ্রামের প্রায় প্রতিটি মানুষকেই চিনতেন। আবার গ্রামটাকেও নিজের হাতের তালুর মতো জানতেন। সে কারণে তিনি ওই গ্রামের প্রায় সব মানুষকে নিয়েই আন্দোলনে নামতে পেরেছিলেন। তিনি প্রায় সব গ্রামবাসীকেই বোঝাতে পেরেছিলেন যে, তাঁদের ওই আন্দোলন রেললাইন সম্প্রসারণ করার প্রতিবাদে নয, বরং যদি ওই প্রস্তাবিত রেললাইন গ্রামের পাশ দিয়ে পাতার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে ওই জনবহুল গ্রামের বাড়ি এবং চাষের জমির ক্ষতি হবে না। আর গ্রামের মানুষও বাস্তুহারা এবং জমিহারা হবেন না। রেললাইন সম্প্রসারণের কাজও হবে।
নীলিমা দিদি গ্রামের মানুষদের একত্রিত করে রেল দফতরের অফিসের সামনে সমাবেশ করেছিলেন এবং রেলের বড়কর্তাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, কিন্তু রেলের কর্তাব্যক্তিরা তাঁদের দাবি প্রথমে একেবারেই মেনে নেননি। এরপর নীলিমা দিদি সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের গ্রামের ছবি দিয়ে এবং গ্রামবাসীকে নিয়ে গ্রুপ করেছিলেন। একটি হ্যাশট্যাগ দিয়ে শুরু করেছিলেন তাঁদের জনবহুল গ্রামের মধ্য দিয়ে রেললাইন পাতার ফলে অনেক গ্রামবাসীকে গৃহহারা এবং জমিহারা হওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে, # ‘সেভ আওয়ার ভিলেজ’, যা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।
অন্য পোস্ট: জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাঁচির বাগানবাড়ি
নীলিমা দিদির সোশ্যাল মিডিয়ায় এই আন্দোলন এবং নানা মিছিল, সমাবেশ ক্রমে গ্রামবাসীর গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে যাতে তাঁরা এই আন্দোলন থেকে নিরস্ত হন, তার জন্য অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল। নীলিমা দিদিকে আন্দোলনের সময় গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু কোনও কিছুতেই তাঁকে এবং অন্যান্য গ্রামবাসীকে এই আন্দোলন থেকে নিরস্ত করা যায়নি।
অবশেষে কয়েকমাস ধরে নীলিমা দিদির নেতৃত্বে গ্রামবাসীর আন্দোলন দেখে রেল কর্তৃপক্ষ তাঁদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করতে রাজি হয়েছিল। নীলিমা দিদি এবং গ্রামবাসীর আরও কয়েকজন প্রতিনিধি রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন এবং তাঁদের যুক্তি এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাব দেখে শেষ পর্যন্ত রেল কর্তৃপক্ষ দাবির যৌক্তিকতা মেনে নিয়েছিল। ওই গ্রামের মধ্য দিয়ে রেললাইন সম্প্রসারণের কাজ না করে পাশ দিয়ে এক পরিত্যক্ত ও খালি জমির উপর দিয়ে প্রস্তাবিত রেললাইন পাতার পরিকল্পনা নিয়েছিল।
এরপর রেল কর্তৃপক্ষ জনসমক্ষে এবং খবরের কাগজে নোটিশ দিয়ে বহু প্রতীক্ষিত ঘোষণা করেছিল যে, তারা ওই গ্রামের মধ্য দিয়ে রেললাইন না পেতে পাশের জমির উপর দিয়ে রেললাইন সম্প্রসারণের কাজ করবে। নিজেদের বাস্তুভূমি এবং কৃষিভূমি রক্ষা করতে পেরে গ্রামবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁদের ন্যায্য দাবি আদায়ের সাফল্যের আনন্দে মেতে উঠেছিলেন।
অন্য পোস্ট: ছবি এঁকে পেয়েছি ক্লিনটনের প্রশংসা, নাচে মুগ্ধ বালসারা
নীলিমা দিদি দেখিয়েছিলেন, ন্যায্য এবং সঠিক দাবি আদায়ের আন্দোলনে সংঘবদ্ধভাবে লড়াই করলে যতই বাধা আসুক না কেন, অবশেষে সাফল্য নিশ্চয়ই পাওয়া যায়। নীলিমা দিদির নেতৃত্বে সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে গ্রামবাসীর এই সফল আন্দোলন এক প্রতীকস্বরূপ হয়ে উঠেছিল এবং ন্যায্য আন্দোলনের পথে অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছিল।
বস্তুত নীলিমা দেবী এবং গ্রামবাসীর এই সফল আন্দোলনের সাক্ষী হওয়ার পর থেকে আশপাশের গ্রামের এবং সামাজিক মাধ্যমের অনেক মানুষই তাঁদের ‘দ্য ভিলেজ ওয়ারিয়ারস’ নামে অভিহিত করেছিলেন।

