Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

জাতীয়তাবাদী বাঙালির নব উন্মেষ (শেষ পর্ব)

বাঙালি পৃথিবীর অপরাপর প্রান্তের সংগ্রামী মননকে সমগ্র উনবিংশ শতক ধরে যে সংশ্লেষণ করেছিল, তার পুরোধা রামমোহনই ছিলেন। সে কারণে রাজা রামমোহন রায়কে উনিশ শতকের বাংলার নব জাগরণের 'ভোরের পাখি' বললে অত‍্যুক্তি করা হবে না। বস্তুত তাঁর দেখানো পথেই বাঙালির নব উন্মেষ ঘটেছিল। 

রাজা রামমোহন রায়। ছবি সৌজন্য: গুগল।

Share Links:

ড. গৌতম মুখোপাধ‍্যায়
প্রফেসর,  ইতিহাস বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

ভারতবর্ষে আসার আগে এ দেশ সম্পর্কে ব্রিটিশরা যথেষ্ট ‘হোম ওয়ার্ক’ করে এসেছিল, যা পর্তুগিজ, দিনেমার ও ফরাসিদের অপেক্ষা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ছিল। ভারতীয় সমাজের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে তাদের অভীষ্টের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। সাহিত‍্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সমকালীন ভারতবর্ষ সম্পর্কে যে আলোকপাত করেছিলেন, তা প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য— “এই ভারতবর্ষে নানা জাতি। বাসস্থানের প্রভেদে, ভাষার প্রভেদে, বংশের প্রভেদে, ধর্ম্মের প্রভেদে নানা জাতি। বাঙ্গালি, পাঞ্জাবী, তৈলঙ্গী, মহারাষ্ট্রী, রাজপুত, জাঠ, হিন্দু, মুসলমান, ইহার মধ্যে কে কাহার সঙ্গে একতাযুক্ত হইবে? ধর্ম্মগত ঐক‍্য থাকিলে বংশগত ঐক্য নাই, বংশগত ঐক‍্য থাকিলে ভাষাগত ঐক্য নাই, ভাষাগত ঐক্য থাকিলে নিবাসগত ঐক্য নাই। রাজপুত, জাঠ, এক ধর্ম্মাবলম্বী হইলেও ভিন্নবংশীয় বলিয়া ভিন্ন জাতি; বাঙ্গালি, বিহারী একবংশীয় হইলেও ভাষাভেদে ভিন্ন জাতি; মৈথিলি, কনৌজী একভাষী হইলেও নিবাসভেদে ভিন্ন জাতি। কেবল ইহাই নহে, ভারতবর্ষের এমনই অদৃষ্ট, যেখানে কোনও প্রদেশীয় লোক সর্ব্বাংশে এক; যাহাদের এক ধর্ম্ম, এক ভাষা, এক জাতি, এক দেশ, তাহাদের মধ্যেও জাতির একতাজ্ঞান নাই। বাঙ্গালির মধ্যে বাঙ্গালিজাতির একতাবোধ নাই, শিখের মধ‍্যে শিখজাতির একতাবোধ নাই। ইহারও বিশেষ কারণ আছে। বহুকাল পর্য‍্যন্ত বহুসংখ‍্যক ভিন্ন জাতি এক বৃহৎ সাম্রাজ্যভুক্ত হইলে ক্রমে জাতিজ্ঞান লোপ হইতে থাকে। ভিন্ন ভিন্ন নদীর মুখনির্গত জলরাশি যেমন সমুদ্রে আসিয়া পড়িলে আর তন্মধ্যে ভেদজ্ঞান করা যায় না, বৃহৎ সাম্রাজ্যভুক্ত ভিন্ন জাতিগণের সেইরূপ ঘটে। তাহাদিগের পার্থক্য যায়, অথচ ঐক‍্য জন্মে না। রোমক সাম্রাজ্যমধ‍্যগত জাতিদিগের এইরূপ দশা ঘটিয়াছিল। হিন্দুদিগেরও তাহাই ঘটিয়াছে। জাতিপ্রতিষ্ঠা নানা কারণে ভারতবর্ষে অনেক দিন হইতে লোপ হইয়াছে। লোপ হইয়াছে বলিয়া কখনো হিন্দুসমাজ কর্ত্তৃক কোন জাতীয় কার্য‍্য সমাধা হয় নাই। লোপ হইয়াছে বলিয়া সকল জাতীয় রাজাই হিন্দুরাজ‍্যে বিনা বিবাদে সমাজ কর্ত্তৃক অভিষিক্ত হইয়াছেন। এই জন্যই স্বাতন্ত্র‍্যরক্ষার কারণ হিন্দুসমাজ কখনো তর্জ্জনীর বিক্ষেপও করে নাই।”

ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের উক্ত পর্যবেক্ষণ সর্বাংশে সত‍্য। আধুনিক ভারতের ইতিহাসে  তিনি ইংরেজদের শোষণ-নিপীড়ন-বঞ্চনা ব‍্যতিরেকে মূলত দু’টি অবদানের কথা খোলাখুলিভাবে স্বীকার করেছেন, সেই দুটি হল, ‘স্বাতন্ত্র‍্যপ্রিয়তা’ ও ‘জাতিপ্রতিষ্ঠা’। এই দু’টি বিষয়ে ভারতবাসী অবগত হয়েছিল পাশ্চাত্য শিক্ষার দৌলতে। ইংরেজরা এদেশে পশ্চিমি সভ‍্যতার অবিসংবাদী মহিমা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এভাবেই ভারতীয়দের বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিতে অনুঘটকের কাজ করেছিল।

এভাবে ভারতীয় সমাজ যখন যুগসন্ধিক্ষণের দোরগোড়ায়, তখন কিছু মুষ্টিমেয় মানুষ সামাজিক অধঃপতন থেকে দেশকে রক্ষা করার জন‍্য এগিয়ে এসেছিলেন। রাজা রামমোহন রায় তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ‍্য ছিলেন। তিনি অনুধাবন করেন যে, দেশের মানুষকে যুগোপযোগী আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত না করলে ভারতবর্ষকে অন্ধকারের অতলান্ত থেকে টেনে তোলা যাবে না। বিভিন্ন ভাষা আয়ত্ত করে প্রাচীন ও নবীনের উৎকৃষ্টতম জ্ঞানগুলির সমাহারের ভিত্তিতে স্বদেশীয় সভ‍্যতার অগ্রসরমানতার রূপরেখা তৈরি করেন। সংখ‍্যাগরিষ্ঠ মানুষের কথা চিন্তা করে তিনি বাংলা ভাষায়  ‘সম্বাদ কৌমুদী’ (১৮১৮) ও ‘ব্রাহ্মণ সেবধি’ন(১৮২১), ফারসি ভাষায় ‘মিরাৎ-উল-আখবার’ (১৮২২), ইংরেজিতে ‘The Brahmanical Magazine’ (১৮২১) প্রকাশ করেন। উদ্দেশ্য ছিল সকল সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে তাদের মধ্যে যুক্তিবাদের বিকাশ ঘটানো। কিন্তু নতুনের আবাহনের পথে কাঁটা বিছিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরই স্বদেশবাসী। প্রাচ‍্য ও পাশ্চাত্যের শিক্ষা সমন্বয়ের প্রচেষ্টা গোঁড়া হিন্দুদের না-পসন্দ ছিল। সেই কালেও তাঁকে সামাজিক ট্রোলিংয়ের শিকার হতে হয়েছিল। রামমোহনের বিরুদ্ধে তাঁরা গান বাঁধেন— “ব‍্যাটা সরাই মেলের কুল,/ ব‍্যাটার বাড়ি খানাকুল,/ ব‍্যাটা সর্বনাশের মূল,/ ঔঁ তৎসৎ বলে ব‍্যাটা বানিয়েছে ইস্কুল;/ ও সে জেতের দফা করলে রফা/ মজালে তিন কুল।”

অথচ রামমোহনের সুপারিশের ভিত্তিতে যখন হিন্দু কলেজ স্থাপনের সূচনা হয়, তখন রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের বিরোধিতার কারণে তাঁকে কলেজ পরিচালন কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়নি। তিনি হাসিমুখে তা মেনে নিয়েছিলেন। কেননা হিন্দু কলেজ স্থাপনের সঙ্গে দেশের বৃহত্তম শিক্ষার স্বার্থ জড়িয়ে ছিল। রামমোহনের অভীষ্ট পূরণ হওয়ায় বাইরে থেকেই কলেজকে উৎসাহ দান করেন।

রামমোহনের জীবনীকার সমকালীন ইংল্যান্ডের বিশিষ্ট নারীবাদী লেখিকা সোফিয়া ডবসন কোলেট (১৮২২-১৮৯৪) তাঁর ‘The Life and Letters of Raja Rammohun Roy’ গ্রন্থে রামমোহনের সমন্বয়বাদী চিন্তাধারার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং তিনি দেখিয়েছেন যে, পদের মোহ তাঁকে কখনওই আচ্ছন্ন করেনি। আবার তাঁর প্রথম বাঙালি জীবনীকার নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় (১৮৪৩-১৯১৩) তাঁর ‘মহাত্মা রাজা রামমোহন রায়ের জীবনচরিত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, একটি মহৎ পরিকল্পনা বাধা পাবে অনুধাবন করেই রামমোহন দূর থেকে হিন্দু কলেজকে শুভেচ্ছা জানান। রামমোহনের সমন্বয়ী চিন্তাই  নবীন ভারতের উদয়ে সহায়ক হয়েছিল। বাঙালির জাতীয়তাবাদী ধ‍্যানধারণার যথার্থ হোতা তিনিই ছিলেন। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেই বাঙালি মনীষা পাশ্চাত্যের সঙ্গে এক তুল‍্যমূল‍্য বিচারে উপনীত হয়েছিল।

বলা বাহুল‍্য, বাঙালি পৃথিবীর অপরাপর প্রান্তের সংগ্রামী মননকে সমগ্র উনবিংশ শতক ধরে যে সংশ্লেষণ করেছিল, তার পুরোধা রামমোহনই ছিলেন। সে কারণে রাজা রামমোহন রায়কে উনিশ শতকের বাংলার নব জাগরণের ‘ভোরের পাখি’ বললে অত‍্যুক্তি করা হবে না। বস্তুত তাঁর দেখানো পথেই বাঙালির নব উন্মেষ ঘটেছিল।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Anamika Ganguly
Anamika Ganguly
1 year ago

Wonderful

Subhajyoti Acharjee
Subhajyoti Acharjee
1 year ago

Ato choto choto othocho govir sob information pete valo lagche. Continue please

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए